হঠাৎ নিজের মূল্যবান জিনিসগুলোর কথা মনে পড়ল। নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলাম, ভেসপাটাকে কি বাঁচানো যাবে?
-ওটা অটুট আছে। বাথরুমে যদি ফেলে এসে থাক তবে তোমার ছেঁড়া প্যান্টটা গেছে। তোমাকে নিয়ে আসবার সময় পিস্তলটা পেলাম, থলিটাও সেই সঙ্গে নিয়ে এসেছি। ভেসপাটাকে তখনি নিরাপদ জায়গায় এনে রেখেছি। ওই গাছপালার মধ্যেই সব কিছু নিয়ে জমা করেছি। এই গাড়ি রাখার জায়গাটায় আগুন আসবে সবচেয়ে শেষে। এর। দু দিকে ইমারত রয়েছে। ওরা প্রত্যেকটা কেবিনে থার্মাইট বোমা ফাটিয়েছে। পেট্রলের চেয়ে ভাল কাজ হয় তাতে। ওজনে কম এবং বীমা কোম্পানির গোয়েন্দারাও এর কোন পাত্তা করতে পারবে না।
–তুমি নিশ্চয়ই গা-হাত-পা পুড়িয়েছ।
তাঁর মুখে শুভ্র হাসির ঝলক দেখা দিল, সেজন্যই কোটটা খুলে নিয়েছিলাম। বিশিষ্ট ভদ্রলোকের মত পোষাক দুরস্ত হয়ে ওয়াশিংটনে যেতে হবে তো।
–কথাটা আমার মোটেই মজার মনে হল না। প্রশ্ন করলাম, তোমার শার্টটা গেল কোথায়?
একটা বিকট শব্দ হল, ঘরের সারিগুলি থেকে অসংখ্য স্ফুলিঙ্গ উড়ে গেল। জেমস বন্ড বললেন, ওই যে আমার শার্ট যাচ্ছে। ছাদ ধ্বসে পড়েছে ওর ওপরে। তিনি থামলেন, হাত দিয়ে তাঁর ঘর্মাক্ত ময়লা লাগা মুখটা মুছে নিলেন। এতে অবশ্য ময়লাটা আরও মাখামাখি হয়ে গেল সারা মুখে। বললেন, এরকম যে ঘটতে পারে তা আমার মনে হয়েছিল। হয়ত যতটা প্রস্তুত ছিলাম, তার চেয়ে বেশি প্রস্তুত থাকা উচিত ছিল। যেমন বেরিয়ে গাড়ির চাকাটা বদলে নিতে পারতাম। ঘরের সারির শেষ দিকের পথ দিয়ে বের হতাম। লেক জর্জ বা গ্লেন ফলস-এ পৌঁছে পুলিশ বাহিনী পাঠিয়ে দিতাম। তবে দেখলাম যে গাড়িটা ঠিক করে নিলে আমাদের বন্ধুরা আমাকে চলে যেতে বলার একটা অজুহাত পেয়ে যাবে।
অবশ্য বলতে পারতাম যে, তোমাকে না নিয়ে যাব না। আবার দেখলাম শেষ পর্যন্ত–তা নিয়ে গুলি ছোঁড়াছুঁড়ি হবে।
যদি আমি প্রথম গুলি না ছুঁড়ি তবে ওদের হারানো ভাগের ব্যাপার হত। আর এই পটভূমি থেকে সরে গেলে তুমি আবার যেখান থেকে আমরা শুরু করেছিলাম, সেখানেই গিয়ে দাঁড়াবে। ওদের ফন্দী-ফিকিরের মধ্যে তোমার একটা প্রধান ভূমিকা ছিল।
-আমার মনে হচ্ছিল বরাবরই সেটা ছিল। কিন্তু কারণটা বুঝতে পারছিলাম না। এরা যেভাবে আমার সঙ্গে ব্যবহার করছিল তাতে মনে হচ্ছিল আমাকে নিয়ে কিছু যায় আসে না। আমি যেন খরচের খাতায়। ওরা আমাকে কিভাবে কাজে লাগাতে চেয়েছিল?
-তুমি এই আগুন লাগাবার কারণ স্বরূপ হতে। সানুগুইনেত্তি সাহেবের পক্ষে সাক্ষী হত এই যে ম্যানেজাররা, অর্থাৎ ফ্যান্সী দম্পতি, অবশ্যই তারা এর ব্যাপারের সঙ্গে খোলআনা জড়িত ছিল…
আবার মনে পড়ল শেষ দিনে আমার প্রতি ওদের মনোভাব কিরকম পরিবর্তিত হয়েছিল। যেভাবে ওরা আমাকে আবর্জনার মত ঘৃণাভরে দেখেছিল, যেন আমি একটা জঞ্জাল বিশেষ, যা দূর করে ফেলে দেওয়া হবে।
ওরা বলত যে ওরা তোমাকে বিদ্যুৎ নিভিয়ে দিতে বলে গিয়েছিল। খুব যুক্তিসঙ্গত কথা, কেননা হোটেলের ঝাঁপ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ওরা তোমাকে তেলের বাতি জ্বালাতে বলেছিল শেষ রাত্রিটায়। তেল বাতিটার দগ্ধাবশেষ পাওয়াও যেত। বাতিটা জ্বালিয়ে রেখে তুমি ঘুমিয়ে পড়েছিলে; কোনভাবে সেটা পড়ে যায়। তাতেই গোটা বাড়িটায় আগুন ধরে যায়। প্রবল বাতাস বাকিটুকু করেছে। অকুস্থলে আমার আগমনটা একটা বিচ্ছিরি ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল–তার বেশি নয়। আমার দগ্ধ দেহটাকেও পাওয়া যেত না হলে, আমার গাড়ি, রিস্টওয়াচ এবং ব্যাগের ভেতর পিস্তলের অবশেষ।
আমি জানি না আমার পিস্তল এবং তোমার বালিশের তলায় পিস্তলটা নিয়ে ওরা কি করত। ওই দুটো ওদের। ঝামেলায় ফেলতে পারত। পুলিশ ক্যানাডার রেজিস্ট্রেশন অফিসে গাড়িটার নম্বর মিলিয়ে দেখত। আর পিস্তলের নম্বর মিলিয়ে দেখত ইংল্যান্ডের সঙ্গে। এর ফলে আমাকে সনাক্ত করতে পারত। তবে কেন অন্য পিস্তলটা তোমার বালিশের তলায় গেল? সেটা পুলিশকে ভাবাত। ধর, আমরা প্রেমিক-প্রেমিকা ধরনের সম্পর্কিত হতাম, তবে কেন তোমাকে ছেড়ে দূরে গিয়ে শুয়েছিলাম? সম্ভবত, আমরা দুজনেই অত্যন্ত শোভনশালীনতাসম্পন্ন এবং তাই যতটা সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে শোবার বন্দোবস্ত করেছিলাম এবং রাত্রিবেলা একা একটি নিঃসঙ্গ তরুণীর আত্মরক্ষার জন্য আমি তোমাকে আমার থেকে একটা পিস্তল দিয়েছিলাম। তারা কিভাবে এই হেঁয়ালিটির উত্তর বের করত, তা আমার অনুমান যে আমাদের এই বন্ধুদের একবার বলেছিলাম যে আমি পুলিশের লোক। তাই তারা পিস্তলের কথাটা ভেবে দেখত। অন্যান ধাতু নির্মিত জিনিসের কতা, যেগুলি আগুনে ধ্বংস হবে না, তাদের কথা বিবেচনা করে কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করত, ছাই-এর স্তূপ ঘেঁটে ওই জাতীয় সমস্যায় যাতে পড়তে না হয়, তার উপায় বের করতে। ওরা সতর্কতা অবলম্বন করতে যাতে ছাই ও অঙ্গারের উপর পায়ের ছাপ থাকে। আর এই লোক দুটি তো ঝানু। তাঁর মুখ অন্য দিকে ফিরিয়ে বললেন, ওদের এরকমই হত?
-ওরা তোমাকে খুন করল না কেন?
-তাই করত, অথবা ওরা ভেবেছিল যে ওরা আমাকে খুন করেছে। তোমাকে ছেড়ে যখন নিজের ঘরের দিকে যাচ্ছিলাম, তখন মনে হল যদি ওরা তোমাকে কিছু করে তবে পয়লা ধাক্কায় আমাকে সরাতে চাইবে। তাই বিছানায় একটা ড্যামি তৈরি করে শুইয়ে রাখলাম। বেশ ভাল হয়েছিল ড্যামিটা। আগেও এরকম করেছি। এটা তৈরি করার কায়দাটা আমার জানা। শুধু একটা শায়িত শরীরের মত জিনিস রাখলেই চলবে না। বালিশ আর তোয়ালে এবং বিছানা দিয়ে সেটা তৈরি করা যায়। এমন কিছুও দিতে হবে যা চুলের মত দেখতে হয়। কয়েক মুঠো পাইন পাতা বালিশের উপর রেখে চাদর টেনে নিয়ে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে মাথার কেশগুচ্ছের মত দেখায়–খুব শিল্পসম্মতভাবে।
