এর চেয়ে বড় উপহার, মনে পড়ল–লাইটার জ্বালাবার সময় তার হাতের প্রথম পরশ। মনে পড়ার ইন্দ্রজালে বারবার। যত্ন করে ভাবলাম তার দেওয়া প্রত্যেকটি চুমুআলাদা আলাদাভাবে এবং তারপর রিভলবারটার কথা কেন জানি মনে পড়ে গেল। বালিশের তলায় হাত দিয়ে সেটা আছে কিনা দেখে নিলাম। তারপর সুখী মন নিয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম।
এরপর যা আমার মনে পড়েছে তা হল এই যে আমি সম্পূর্ণ জেগে ছিলাম। এক মুহূর্ত শুয়ে শুয়ে চিন্তা করলাম, আমি কোথায় আছি। প্রবল বায়ুপ্রবাহে তখন প্রকৃতি বিরাম লাভ করছিল, চারদিক শান্ত। দেখলাম আমি চিৎ হয়ে শুয়ে আছি। হয়ত সে জন্যই জেগে উঠেছিলাম। ক্ষণেকের জন্য, উল্টোদিকের দেয়ালে উঁচুতে যে চৌকা কাঁচের লাল চৌখুপী ছিল তার দিকে তাকালাম। চাঁদ আবার উঁকি মারছিল। কয়েক ঘণ্টার ঝড়ের পর নেমে আসা এই নিস্তব্ধতা সব কিছুর ওপর তার উষ্ণ অধিকার বিস্তার করেছিল। আমার একটু তন্দ্রাভাব এল, আমি পাশ ফিরে দেয়ালের দিকে পেছন ফিরে শুলাম। চোখ বুজলাম, কিন্তু ঘুমের স্পর্শ নেমে আসার আগে ঘরের মধ্যে কিছু একটা অস্বাভাবিক দৃশ্য আমার চোখে পড়েছিল। অনিচ্ছা সহকারে আবার খুললাম চোখ।
কিন্তু সেটা যে কি ঠাহর করতে কয়েক মিনিট সময় লাগল। উল্টোদিকের দেওয়ালে পোশাকের কাবার্ড আর দরজার ফ্রেমের মাঝ বরাবর একটা ক্ষীণ আলোর রেশ চোখে পড়ল। কি আহাম্মক! দরজাটা ঠিক করে বন্ধ করিনি। কাবার্ডের মধ্যে বসান স্বয়ক্রিয় সৌজন্য বর্তিকার সুইচটাও তাই অন হয়েই ছিল। বিছানা ছেড়ে উঠলাম। উঃ কি জ্বালাতন! কিন্তু উঠে পড়ে দু পা যেতেই হঠাৎ ভাবলাম, এটা কি রকম হল! কাবার্ডের মধ্যে আলো জ্বলবে কি করে! বিজলীর মেন সুইচ তো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
মুখে হাত দিয়ে এক লহমায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর যেই না পিস্তলটা আনতে ঘুরে দাঁড়িয়েছি, অমনি কাবার্ডের ভেতর থেকে এক হাতে টর্চ আর অন্য কি যেন একটা দোলাতে দোলাতে স্লাগসি গুঁড়ি মেরে বেরিয়ে এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
যতদূর মনে পড়ে একবার চিৎকার করে উঠেছিলাম। তবে খুব সম্ভব সেটা সোচ্চার হয়নি। পরক্ষণে আমার মাথার। পাশে কিছু বিস্ফোরিত হল। মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়লাম। সবদিক তখন অন্ধকার।
জ্ঞান আসতে প্রথম অনুভূতি হল প্রচণ্ড উত্তাপের। মনে হল মাটি দিয়ে আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তারপর পোড়া পোড়া গন্ধ পেতেই তাকিয়ে দেখতে পেলাম লেলিহান অগ্নিশিখা। চিৎকার করার চেষ্টা করলাম। জানোয়ারের চাপা গোঙানির মত একটা আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই বের হল না। পা দিয়ে লাথি ছুঁড়তে লাগলাম। কার হাতের মধ্যে আমার পায়ের পাতা শক্তভাবে বাঁধা পড়েছিল। আরেকটা হাত ছিল মুখের ওপর। কানের কাছে কার কণ্ঠস্বর শুনলাম। জেমস বন্ডের গলা ফিসফিস করে দ্রুত বলল, আওয়াজ কর না! চুপচাপ পড়ে থাক! আমি বলছি।
হাত বাড়িয়ে তার কাঁধটা স্পর্শ করলাম। নগ্ন কাঁধ। তাকে ভরসা দেবার জন্য কাঁধে চাপ দিলাম। আমার মুখের ওপর থেকে তার হাত সরে গেল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, এখানে অপেক্ষা কর। নড় না যেন। এক মুহূর্তের মধ্যেই ফিরে আসছি। তিনি নিঃশব্দ পদে চলে গেলেন।
নিঃশব্দ পদে তাঁর যেতে কতটা শব্দ হল তাতে কিছু এসে যাচ্ছিল না। বিপুল গর্জনে বৈশ্বানর তাঁর করাল গ্রাসে সব কিছু মুখে পুরেছিলেন; আমার পাশেই অগ্নিশিখার লেলিহান জিহ্বা লক করছিল, কমলা রং-এর আলোয় গাছপালা উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছিল। কেন দাঁড়ালাম এবং ব্যথা ভেঙে ঘাড় ঘোরালাম। হোটেলের কেবিনের সারি থেকে এক জ্বলন্ত অনল প্রাচীর এগিয়ে এসেছিল আমার ডানদিক অবধি। ওঃ ঠাকুর। কি থেকে যে আমাকে রক্ষা করেছে! আমি আপাদমস্তক আমার শরীরে হাত বুলিয়ে দেখলাম। আমার পায়ে আগুনের আঁচটুকু লাগেনি। আমার মাথার পেছন দিকে কেবল ঘটানিতে কিছু আঁচড় লেপেছে। দেখলাম দিব্যি দাঁড়াতে পারছি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবতে চেষ্টা করলাম কি ঘটেছিল। কিন্তু আঘাত পাওয়ার পরের কোন কিছুই মনে পড়ল না। তবে তারা হোটেলটায় আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল এবং জেমস্ তা টের পেয়ে ঠিক সময়ে পেছন দিকের এই তরুশ্রেণীর মধ্যে আমাকে টেনে নিয়ে আসেন।
গাছপালার মধ্যে একটা শব্দ উঠল। সে আমার পাশে এসে গেছে। তার গায়ে শার্ট বা কোন কিছুই ছিল না। তার রোদে পোড়া ঘর্মাক্ত বুকে বাঁ-বগলের তলায় একটা স্বয়ংক্রিয় পিস্তল মুখ নিচু করে ঝুলছিল। উত্তেজনা এবং ব্যস্ততায় তাঁর চোখ ঝকঝক করছিল। ধূম্ররাজির আঘো কুয়াশার মধ্যে তাঁর মুখ ও অবিন্যস্ত চুলে তাঁকে ঠিক জলদস্যুর মত দেখাচ্ছিল, দেখলে ভয় করে।
তিনি অবিচলিতভাবে হাসলেন। তিনি প্রজ্বলিত অগ্নিশিখার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ওই হচ্ছে খেলাটা। বীমা কোম্পানির কাছ থেকে দাবী আদায়ের জন্য হোটেলটা পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। ওরা কারসাজি করে বার-বাড়িটার দিকে আগুন ছড়িয়ে দিচ্ছে। সারাটা ঢাকা পথে থার্মাইটের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয়। যদিও এর দায়িত্ব নেই তবে সানগুইনেত্তি সাহেবের হয়ে তার সম্পত্তিটিকে শুধু বাঁচাতে পারব। আমার সাক্ষী দিলে উনি বীমা কোম্পানিকে খামচে মারতে পারবেন না। বরঞ্চ তার শ্রীঘরবাস অনিবার্য হয়ে পড়বে। কাজেই আমরা আরেকটু সময় অপেক্ষা করব এবং এই অগ্নিশীলার শেষ অঙ্কটা হয়ে যেতে দেব।
