আমি বললাম ছোটবেলায় ২২ বোরের লম্বা-নল বন্দুক চালিয়েছি খরগোশ শিকার করতে।
–বেশ-তো। এটা স্মিথ অ্যান্ড ওয়েলসনের তৈরি পুলিশ পজিটিভ। মোক্ষম জিনিস। নিচু করে তাক করবেন। এইভাবে হাত লম্বা করে ধরুন। তিনি আমাকে দেখিয়ে দিলেন। ঘোড়াটা চেপে দেবেন, টানবেন না। ও কিছু নয়। আমি গুলির শব্দ শুনলেই ছুটে আসব। এখন মনে রাখবেন যে আপনার সম্পূর্ণ নিরাপত্তার ব্যবস্তা করা হয়েছে। জানালাগুলি ভাল এবং খুব মজবুত। কাঁচ না ভেঙে ওর পাশ দিয়ে আশার কোন পথ নেই। তিনি হাসলেন।–এইসব হোটেল তৈরি করেছেন যেসব স্থপতি তাঁদের ওপর আস্থা রাখুন। জানালা-দরজা ভেঙে ঘরে ঢোকার সম্বন্ধে যা যা জানা দরকার তা তারা জানেন। অন্ধকারের মধ্যে জানালা দরজা দিয়ে তারা আপনাকে গুলি করবে না। তবে যদি র। কথা কে বলতে পারে। তাই খাটে না শুয়ে, খাটটা যেখানে আছে সেখানেই থাকুক, ঘরের ওই প্রান্তে এক কোণায় মেঝের ওপর গদি তোষক পেতে একটা সাময়িক বিছানা পাতুন। বালিশের তলায় রিভলবারটা রাখবেন। টেবিলটা দরজার সামনে টেনে আনুন, ওর ওপর এক কোণায় টেলিভিশন সেটটা আলতো করে বসিয়ে রাখুন, যাতে কেউ। দরজায় জোরে ধাক্কা দিলেই ওটা আছড়ে পড়ে নিচে; সেই শব্দ আপনাকে জাগিয়ে দেবে। তারপর দরজা লক্ষ্য করে একটা গুলি ছুঁড়বেন ঠিক হাতলের কাছটায়–ওখানেই লোকটাকে দাঁড়াতে হবে। তারপর, একটা আর্তনাদ শুনতে পাবেন। বুঝেছেন?
যতটা খুশিভাবে বলা সম্ভব সেভাবে বললাম, হ্যাঁ। ভাবছিলাম হায়, যদি তিনিও আমার সঙ্গে এই ঘরে থাকতে পারতেন। সে কথা জিজ্ঞেস করবার সাহস আমার ছিল না; তাছাড়া তাঁর নিজের অন্য কোন পরিকল্পনাও থাকতে পারে।
তিনি আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেলেন। এত অবাক হয়ে গিয়েছিলাম যেন যযৌ। ন তস্থে অবস্থায় দাঁড়িয়েই রইলাম সেখানে। তিনি হালকাভাবে বললেন, দুঃখিত ভিড়, কিন্তু তুমি একটি সুন্দরী মেয়ে। তোমার ওই সাদা, ওভারনে তোমাকে আমার চোখের আজীবন অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে সুন্দর লাগছিল। যাও একটু। ঘুমিয়ে নাও। আমি তোমার দিকে নজর রাখছি।
আমি দু হাত দিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরে নিবিড়ভাবে তাকে চুম্বন করলাম–তার ঠোঁটে। বললাম, আমার জীবনে তুমি আশ্চৰ্যতম পুরুষ। এখানে আসার জন্য ধন্যবাদ। আর জেমস, কথা দাও, সাবধানে থাকবে? আমার মতন তো। ওদের তুমি দেখনি। ওরা ভারি সাংঘাতিক। দেখ, যেন না লাগে তোমার।
তিনি আবার আমাকে চুমু খেলেন, খুব হালকাভাবে। আমি আমার বাহুপাশ থেকে তাঁকে মুক্তি দিলাম। তিনি বললেন, ভেব না। এরকম জীব আমি আগেও দেখেছি। এখন, যা যা বলেছি মনে করে ঘুমিয়ে পড়। শুভরাত্রি, ভিড়।
এরপর তিনি চলে গেলেন। বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর দাঁত মেজে শুতে গেলাম। আয়নায় নিজের দিকে তাকালাম। পেত্নীর মত দেখাচ্ছিল আমাকে বোয়ামোছা, প্রসাধনহীন, চোখের কোণে কালি পড়েছে। উঃ কি একটা দিন যে গেল? আর এখন রাতটা পড়ে রয়েছে। ওকে আমি হারাবো না, ওকে ছেড়ে দেব না। তবু মনে মনে বুঝেছিলাম যে মায়ার বাঁধনে ওকে ধরা যাবে না। সে একাই যাবে, আমাকেও একা একাই যেতে হবে। কোন মেয়ের সাধ্য নেই ওকে ধরে রাখে। কেউ পারেনি। সে এক নির্জন সত্তা, যে নিজের সত্তাকে বিলিয়ে দেয় না। কোন রকমে জড়িয়ে পড়তে তার তীব্র আপত্তি। দীর্ঘনিশ্বাস ফেললাম! ঠিক আছে। সে ভাবেই তৈরি করে নেব আমার মনকে। ওকে ছেড়ে দেব। চলে গেলে কাঁদব না। পরেও কাঁদব না। আমিই কি সেই মেয়ে নই যে ঠিক করেছিল মন দেওয়া-নেওয়ার খেলা সে আর খেলবে না! তখনও প্রবল বেগে বাতাস বইছিল। আমার ঘরের জানালার পেছনে পাইন গাছে গাছে তীব্র ঘর্ষণ হচ্ছিল। অনেক উঁচুতে মেঘের ফাঁক দিয়ে স্বচ্ছন্দ ক্ষিপ্র গতিতে ছুটে চলেছিল চাঁদ। মেঘ-চোয়ানো জ্যোৎস্নায় ঘরের কোণের জানালার শার্সির মাথায় দুটো কাঁচের চৌখুশী আলো-আলো লাগছিল। লাল নক্সা করা পাতলা পর্দার মধ্য দিয়ে ওই দুটো চৌকো কাঁচ কেমন ভৌতিক লাগছিল। মেঘের আড়ালে চাঁদটা চলে গেলে ফটোগ্রাফারের বাতির মত ওই দুটো চৌকা আলোকিত কাঁচ নিভে গেল। আলোর সলতে থেকে তখন শুধু সামান্য হলদে আলো সারা ঘরে ছড়িয়ে পড়েছিল। বিজলী বাতির উজ্জ্বলতা না থাকায় আয়তাকার ঘরটাকে অপরিচ্ছন্ন সিনেমা সেটের ক্ষুদ্র সংস্করণ বলে মনে হচ্ছিল। কোণগুলি অন্ধকারাচ্ছন্ন, ঘরটা যেন একজন পরিচালকের জন্য প্রতীক্ষারত, যিনি এসে ছায়ার মধ্যে মিশে থাকা কুশীলবদের ডেকে তাদের ভূমিকা অভিনয় করার নির্দেশ দেবেন।
আমি চেষ্টা করছিলাম যাতে ঘাবড়ে না যাই। ডানদিক ও বাঁদিকের দেওয়ালে কান পেতে ছিলাম। কিন্তু গাড়ি দাঁড়াবার ফাঁকা জায়গাটা থাকায় কিছু শুনতে পাচ্ছিলাম না। টেবিল টেনে ব্যারিকেড করার আগে দরজা খুলে বেরিয়ে এসে চারদিক দেখে নিলাম। আট-দশ এবং দূরে বাঁদিকে জেমস্ বন্ডের চল্লিশ নম্বর ঘর থেকে আলোর রেশ দেখা যাচ্ছিল। সবকিছু শান্তিপূর্ণ, সব কিছু শান্ত। এরপর ঘরের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে সবদিক শেষবারের মত ভাল করে দেখে নিলাম। তিনি আমাকে যা যা করতে বলেছিলেন, সব করে ফেলেছি। নৈশ-প্রার্থনা বাক্য উচ্চারণ করার কথা মনে পড়ল; আমি ওখানেই হাঁটু গেড়ে বসলাম, তারপর কার্পেটের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা করলাম। ধন্যবাদ দিলাম পরম মঙ্গলময়কে, সেই সঙ্গে নিবেদন করলাম আমার অভিলাষ। এরপর দুটো অ্যাসপিরিন খেয়ে নিয়ে, চিমনির মধ্যে ফুঁ দিয়ে বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে এক কোণে আমার স্বরচিত ভূমি-শয্যায় শুয়ে পড়লাম। আমার ওভারলের সামনের দিকের জিপটা খুলে নিলাম, তবে জুতার ফিতে খুললেও পায়ে পরাই থাকল সেটা। কম্বলের মধ্যে ঢুকে পড়লাম। আমি খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মরফিয়ার মতই বড়ি দুটো আমাকে যেন সুস্বাদু তার বলয়ে পাঠিয়ে দিল, যেখানে কোন বিপদ নেই, আছে কেবল তন্দ্রাভ একটি উত্তেজক মুখ এবং সেরকম মুখের লোকেরা যে আছে সে বিষয়ে আমার নব-জন্ম অভিজ্ঞতা।
