হ্যাল্লো, ওরা এদিকে আসছে। তিনি আমাকে আশ্বাসপূর্ণ একটি হাসি উপহার দিলেন। এখন মোটে ঘাবড়াবেন না। একটু ঘুমিয়ে নিন। যাতে কোন গণ্ডগোল না ঘটে, আমি তা দেখব। রেডিওর বাজনাটা ফিকে হয়ে আসছিল। টুং টুং জলতরঙ্গের ধ্বনিতে মধ্যরাত্রি সূচিত হল।
.
নিদ্রা–হয়ত চিরনিদ্রা
স্লাগ্সি পেছনের দরজা দিয়ে রাত্রির অন্ধকারে বেরিয়ে গেল। রোগা লোকটা ধীরে ধীরে আমাদের কাছে এল। সে কাউন্টারের ওপর ভর দিয়ে দাঁড়াল।–আচ্ছা মশাইরা। এবার গা তুলুন। এখন মাঝরাত। আমরা মেন সুইচ বন্ধ করে দিচ্ছি। আমার বন্ধু রাত-বিরেতে চট করে জ্বালাবার জন্য গুদাম থেকে তেলের বাতি আনতে গেলেন। দামী বিজলী খরচটা করে তো কোন ফায়দা নেই। মিস্টার সানুগুইনেত্তির হুকুম।
কথাগুলি বন্ধুভাবে বলা এবং যুক্তিপূর্ণ। তারা কি তবে এই বন্ডের উপস্থিতির জন্য তাদের পরিকল্পনা, তা সে যাই। হোক না কেন–রূপায়িত করছে না? আমার সন্দেহ দূর হল না। জেমস বন্ডের কাহিনী শুনে যে চিন্তাগুলি চলে গিয়েছিল, আবার সেগুলি বন্যার মত ফিরে এলে। আমি আমার দু-পাশের ঘরে এই দুজনকে রেখে ঘুমোতে যাব। আমাকে অবশ্যই আমার ঘরটাকে দুর্ভেদ্য করে রাখতে হবে। ওদের কাছে আলাদা চাবি আছে। আমি এই বন্ড মানুষটিকে বলব আমাকে সাহায্য করার জন্য।
জেমস্ বন্ড খুব বড় করে হাই তুললেন।–তা বেশ, কিছুটা ঘুমোতে গেলে আমি নিশ্চয়ই খুশি হব। আজ অনেকটা পথ পাড়ি দিয়েছি। আগামীকালও আরো খানিকটা পথ যেতে হবে। আর আপনিও নিশ্চয় বিছানায় ঢলে পড়তে প্রস্তুত, আপনার ওসব দুর্ভাবনা নিয়েই।
–তার মানে? মোগা লোকটার চোখ ধারাল হয়ে উঠল।
-আপনাদের কাজটা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
–কাজটা কি ধরনের জানেন?
-বীমা কোম্পানির জন্য মূল্য যাচাইয়ের কাজ। এত বড় দামী সম্পত্তি। পঞ্চাশ লক্ষ ডলার দামের তো হবেই। বলব। কথা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করছি, আপনাদের কারো কি সিকিউরিটি বন্ড দেওয়া আছে?
-না, তা আমাদের নেই কেন। কর্মচারিদের কাছ থেকে সান্গুইনেত্তির সাহেব কোনও বন্ড-ফন্ড সই করিয়ে নেন না।
কর্মচারিদের প্রতি অটুট বিশ্বাসের চিহ্ন এটা। নিশ্চয় ভাল বিশ্বাসী লোক পেয়ে গেছেন? যাদের ওপর নির্ভর করাটা যুক্তিসঙ্গত? আচ্ছা বীমা কোম্পানির নামটা কি?
-মেট্রো অ্যাকসিডেন্ট অ্যান্ড হোম। রোগা লোকটা তখনও কাউন্টারের গায়ে আলস্যভাবে হেলান দিয়ে ছিল, তবে তার মুখটা ছিল বেশ থমথমে। কেন? তাতে আপনার কি মশাই? আপনি হেঁয়ালি ছেড়ে বলুন তো কি ভাবছেন মনে মনে? সে বলল।
যেন কোন খেয়াল নেই, এমনভাবে বন্ড বললেন, মিস মিশেল আমাকে বলছিলেন যে এই হোটেলটা ভাল চলছে না। আরও জানলাম যে এই সংস্থা কোয়ালিটি কোর্টস অথবা বলিত্তে ইন্স বা কংগ্রেসের সদস্য পদে কৃত হয়নি। ওদের সমিতিভুক্ত না হয়ে ভালভাবে ব্যবসা চালানো মুস্কিল। আর আপনাদের এই কাঁটা চামচ গুণতে আর বিজলী বাতি নেভাতে পাঠাবার ঝামেলা ইত্যাদি সব ব্যাপার। জেমস বন্ডকে খুব সহানুভূতিপূর্ণ বলে মনে হল। আমার হঠাৎ মনে হল যে এই ব্যবসাটায় কিছু গড়বড় আছে। যদি তা সত্যি হয় তবে সেটা খুবই খারাপ। এই জায়গাটা চমৎকার আর ঘরদোরও দারুণ সাজানো গোছানো।
রোগা লোকটার চোখে যে লালচে আভা দেখেছিলাম তা আবার আত্মপ্রকাশ করল- সে নিচু স্বরে বলল, মশাই এবার মুখটা বন্ধ করুন। আমি আর আপনার ওসব ব্রিটিশ কায়দায় বাতচিত বরদাস্ত করতে যাচ্ছি না, বুঝলেন? আপনি বলতে কি এমনও ভাবতে পারেন যে আমরাই এটার পত্তন করেছি, হু?
অতটা চটে উঠবেন না মিস্টার হেরোউইজ। ওসব শাসানির দরকার নেই। জেমস বন্ড হেসে উঠলেন। দেখুন, আপনাদের এই বিশেষ ভাষা আমার জানা। হঠাৎ তার হাসি থেমে গেল, আর আমি এটাও জানি যে তার আমদানি কোথা থেকে। এবার আপনি আমার কথা বুঝেছেন তো?
আমার মনে হয় তিনি ওদের গুণ্ডা বলছেন–পাকা কয়েদীদের পরিভাষায়। রোগা লোকটা নিশ্চয় সেই অর্থে কথাটা নিয়েছিল। তাকে হতচকিত দেখাচ্ছিল তবে এর মধ্যে সে রাগটা সামলে নিয়েছিল। সে শুধু বলল, ঠিক হ্যায়, পণ্ডিত। ব্যাপারটা আমি বুঝে গেছি। আপনারা টিকটিকিরা সবাই সমান–যেখানে কোন নোংরা নেই সেখানেও নোংরা খুঁজে বেড়ান। আমার বন্ধুটি আবার কোন্ চুলোয়। আসুন, এবার সুখের জোগাড় করা যাক।
আমরা সবাই মিলে পেছনের দরজা দিয়ে একে একে বেরুতেই আলো নিভে গেল। আমি এবং জেমস্ বন্ড দাঁড়িয়ে পড়লাম। কিন্তু রোগা লোকটা বাঁকা পথ ধরে অক্লেশে এগিয়ে যাচ্ছিল যেন সে অন্ধকারেও দেখতে পায়। স্লাগসিকে। বাড়ির এক কোণ থেকে আসতে দেখা গেল। ওর হাতে দুটো চিমনি ঢাকা প্রদীপ। আমাদের দু জনের হাতে আলো দুটো দিয়ে বলল, সুখ স্বপ্ন করি আপনাদেরকে? তার নীরোস মুখ পীতাভ আলোয় দন্তবিকাশ করে হাসল। জেমস্ বন্ড আমার সঙ্গে আমার ঘর পর্যন্ত এলেন এবং ভেতরে ঢুকলেন। তিনি দরজা বন্ধ করে দিলেন। ওদের মতলব আন্দাজ করতে পারা আমার কর্ম নয়। তবে আজ রাতটুকুর জন্য যে আপনি নিরাপদে এই ঘর বন্ধ করে সুরক্ষিত থাকতে পারেন, সেটা দেখাটাই পয়লা নম্বরের কাজ। তাহলে এখন আসুন দেখি। তিনি সন্ধানী চোখে সারা ঘর ঘুরে ঘুরে দেখলেন; জানালা বন্ধ করে, দরজার কবজা পরীক্ষা করে, ঘুলঘুলির কাঁধের মাপ অনুমান করে দেখে তাঁকে সন্তুষ্ট হতে দেখলাম। তিনি বললেন, এটাই একমাত্র দরজা। আপনি বলছেন ওদের কাছে মাস্টার কি আছে। আপনি দরজার। ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করে টেবিলটা টেনে একটা অতিরিক্ত ব্যারিকেড হিসেবে তার গায়ে লাগিয়ে দেবেন। তিনি বাথরুমে ঢুকে টয়লেট পেপার ছিঁড়ে নিয়ে পানিতে ভিজিয়ে ক্লীপের আকারে বানিয়ে দরজার আগায় দিয়ে দিলেন। হাতল টানলেন ঘোরালেন। এগুলি আটকে ছিল কিন্তু আটকাবার ধাক্কায় আলগা হয়ে যেতে পারে। তিনি ক্লীপগুলি নিয়ে আমার হাতে দিলেন? তারপর নিজের প্যান্টের বেল্টে হাত ঢুকিয়ে ছোট মত একটা রিভলবার বের করে জিজ্ঞেস করলেন, এসব জিনিস চালানো অভ্যেস আছে?
