জেমস বন্ড একটু থামলেন, হাত দিয়ে মুখটা ঘসে নিলেন। এই ভঙ্গিটা হয় মনের দৃষ্টিতে পরিষ্কার করে নেবার জন্য, নয়ত মন থেকে কোন স্মৃতিকে ঝেড়ে ফেলার জন্য। তারপর তিনি আরেকটা সিগারেট ধরিয়ে আবার বলতে শুরু করলেন, আমি শুনতে পাচ্ছিলাম, মাউন্টি গোষ্ঠীর ভারপ্রাপ্ত লেফটেনান্ট চিৎকার করে বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে বলছি। পাকড় উল্লােগকো। তিনি হেসে বললেন, শব্দটা সাবমেশিন গানের। কেউ আতাঁরবে চিৎকার করে উঠল। তখন লেফটেনান্ট চেঁচিয়ে বললেন, ওই দরজার লক উপড়ে খুলে একজন লোক ভেতরে ঢুকল দুম্ করে। তার হাতে ধুম উদ্গীরণকারী একটা মেশিনগান শক্ত করে চেপে ধরা।
শোবার ঘরে ডাইনে বাঁয়ে সে বোরিসকে তল্লাশি করল। বুঝলাম এই হচ্ছে উম্যান নাৎসী বাহিনীর প্রাক্তন গোয়েন্দা। আমাদের লাইনের কাজে গন্ধ শুঁকে বলে দিতে হয় যে কে জার্মান আর কে রাশিয়ান। আমি তাকে আমার বন্দুকের নলের মধ্যে রাখলাম। তার হাতের মেশিনগান লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে সেটা তার হস্তচ্যুত করলাম। কিন্তু সে খুব ক্ষিপ্রতার সঙ্গে লাফাল। পেছন দিকে খোলা দরজা দিয়ে সে লাফিয়ে বেরিয়ে গেল। দরজাটা পাতলা কাঠ দিয়ে তৈরি।
আমি বন্দুক তুলে তার দিকে দ্রুত গুলি ছুঁড়ে উঠতে আর পারলাম না। তাই হাঁটু মুড়ে ইংরেজি জেড অক্ষরের আকৃতিতে বেশ ছড়িয়ে গুলি বৃষ্টি করলাম কাঠের দরজা ভেদ করে। হাঁটু মুড়ে গুলি করার কারণ ওর আগের বারের গুলি ছোঁড়ার হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে আমি হাঁটু মুড়ে বসে পড়েছিলাম এবং গুলিটাও প্রায় আমার চুল ছুঁয়ে বেরিয়ে গিয়েছিল। আমার ছোঁড়া দুটো বুলেট ওর গায়ে লাল–পরে দেখা গিয়েছিল বাঁ কাঁধে এবং ডানদিকের পাছায় এবং সে হুমড়ি খেয়ে দরজার ওপাশে পড়েই নিস্তেজ হয়ে গেল।
বাইরে লড়াইয়ের বাকি অংশটা ওই পলায়নপর বন্দুকধারীদের সঙ্গে সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু একজন আহত মাউন্টি হঠাৎ আমার ঘরের দরজা দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকল। বলল, সাহায্য লাগবে? তার কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে উলম্যান দরজার দিকে গুলি চালাল এবং এবং লোকটিকে সে মেরে ফেলল। এতে আমি উলম্যানের পিস্তলের উপচ্চতার একটা আন্দাজ পেলাম এবং প্রায় তার মতেই নিশানো করে গুলি চালালাম। তারপর দৌড়ে ঘরের মাঝামাঝি জায়গায় চলে এলাম যাতে প্রয়োজন হলেও ওর দিকে আরো গুলি ছুঁড়তে পারি। কিন্তু তার প্রয়োজন ছিল না। সে তখনও জীবিত। মাউন্টি গোষ্ঠীর বাকিরা এলে ওকে আমরা ধরাধরি করে নামিয়ে এলে অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু সে কোন কথা বলেনি–নাৎসী গোয়েন্দা এবং স্পেক্টরের মিশ্রন বেশ উষ্ণ পদার্থ–সে পরদিন সকালবেলা মারা গেল।
জেমস বন্ড আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, তিনি যেন আমাকে দেছিলেন না। তিনি বললেন, আমাদের পক্ষের দু জনকে আমরা হারিয়েছি, একজন আহত হয়েছিল। ওরা হারিয়েছিল জার্মান উলম্যানকে এবং আর একজনকেও, অন্য দু জনের অবস্থাও সঙ্গিন, আয়ু ফুরিয়ে এসেছে। যুদ্ধক্ষেত্রের দৃশ্যটা ছিল বীভৎস, তবে কি –তাঁর মুখ হঠাৎ ক্লান্তি ও শ্রান্ত দেখাল–এ জাতীয় দৃশ্য আমাকে ঢের দেখতে হয়েছে। ময়না তদন্ত হয়ে যাবার পর আমি চলে আসতে চাইলাম। আমার সদর দপ্তর, মাউন্টিস্-রা যাদের সাহায্য করছিল, বলে দিয়েছিলেন যেন ঘটনার সম্পূর্ণ প্রতিবেদন আমি ওয়াশিংটনে পেশ করি, যাতে আমাদের স্থানীয় উত্তরসূরীরা আমেরিকায় মেকানিক্স সম্প্রদায়কে নির্মূল করতে পারে।
মেকানিক্স রা বেশ জোরে ধাক্কা খেয়েছিল এবং মাউন্টিসরা চাইছিল এর রেশ থাকতে থাকতে পরবর্তী কার্যক্রম অনুসৃত হয়। আমি বললাম, ঠিক আছে। তবে ট্রেন বা প্লেনে হুড়মুড় করে না গিয়ে আমি বরং গাড়িতেই রওনা হয়ে যাব। সড়ক পথে তিনদিনের বেশি লাগবে না, এই মর্মে প্রস্তাবটি মঞ্জুর হল। কাজেই এই গাড়িটা ভাড়া করলাম। এবং আজ ভোরে রওনা হলাম। বেশ তাড়াতাড়িই আসছিলাম, তবে পথে একটা ভয়ঙ্কর ঝড়ের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলাম, যার পুচ্ছটা এখান দিয়ে বয়ে গেছে। লেক জর্জের কাছে এটার কবলে পড়ায় ভাবলাম রাতটা সেখানেই কাটাব। কিন্তু জায়গাটা এমন বিদঘুঁটে লাগল যে, যখন রাস্তার ধারে এই মোটেলটার নিওন সাইনের বিজ্ঞাপন দেখতে পেলাম, আমি একবার চেষ্টা করলাম।
তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। হয়ত তাকে আবার আগের মত খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছিল। হয়ত কোন কিছু আমাকে বলে দিয়ে থাকবে যে আপনি এখানে রয়েছেন এবং আপনি বিপদগ্রস্ত। যাই হোক এখান থেকে মাইল খানেক আগে আমার গাড়ির টায়ারটা ফেটে যায়, তাই আমি এখানে হাজির হলাম। তিনি আবার হাসলেন এবং কাউন্টারের ওপর রাখা আমার হাতের ওপর তার নিজের হাতে রাখলেন, যে ভাবে ঘটনা ঘটে তা ভারি অদ্ভুত!
-কিন্তু এতটা পথ গাড়ি চালিয়ে এসে আপনি নিশ্চয় খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
-তার বদলে আমি কিছু পেয়েছি। এখন লক্ষ্মী মেয়ের মত আমাকে আর এক কাপ কফি তৈরি করে দিন তো। কফি পার্কোলেটার নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম; তখন তিনি এক শিশি সাদা বড়ি বের করলেন অ্যাটাচি কেস থেকে। দুটো বড়ি বের করে কফির সঙ্গে গিলে ফেললেন, বেজিড্রিন –এটা আমাকে আজকের রাতটা বিদ্রি রাখবে। আগামীকাল কিছু ঘুমিয়ে নেব। তার চোখ আয়নার দিকে গেল।
