–উঁহু, না। বলুন দয়া করে।
– বেশ, আপনি শুনেছেন যে টোরোন্টোতে ইতিমধ্যে ওরা খুব ঝঞ্ঝাটে পড়েছিল। শহরটায় এমনিতেই ঝুটঝামেলা লেগে ছিল। তার ওপর এমন বহু গুণ্ডার দল বড় বড় সংঘর্ষে লিপ্ত হতে লাগল। খবরের কাগজে পড়ে থাকবেন যে মাউন্টি সম্প্রদায় এজন্য সাহায্যের জন্য এমন কি স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে দু জন ঝানু গোয়েন্দা শিকাগো এবং ডেট্রয়েন্ট সীমান্তে সক্রিয় মেকানিক্স নামে টোরোন্টোর দুর্ধর্ষতম গুণ্ডদলটির মধ্যে একটি চালাক চতুর ক্যানাডীয় ছোকরাকে অনুপ্রবেশ করিয়ে দিতে সমর্থ হলেন। এই ছোকরাই উলম্যানের গতিবিধি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কিত খবর সগ্রহ করে আনে, সে যাই হোক, আমি ও আমার মাউন্টি সম্প্রদায়ের বন্ধুরা কাজে লেগে গেলাম। সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমরা শেষ পর্যন্ত দেখতে পেলাম যে বোরিস-ই-এই আততায়ীদের লক্ষ্য এবং মেকানিক্স গোষ্ঠী গত বৃহস্পতিবার–আজ থেকে ঠিক এক সপ্তাহ পরে কাজটা করবে। উম্যান আত্মগোপন করল এবং আমরা তার আর কোন হদিসই পেলাম না। মেকানিক্স গোষ্ঠীতে লাগানো ওই ছোকরার কাছ থেকে শুধু এটুকু জানতে পেলাম যে তিনজনে পুঁদে লক্ষ্যভেদী বন্দুক ওয়ালা গুণ্ডা নিয়ে উলম্যান নিজে ওই খুনে বাহিনী পরিচালনা করবে। বোরিস যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকে সেখানে গিয়ে তার মুখোমুখি হয়ে তাকে হত্যা করা হবে। কোন আকাশ কুসুম কল্পনা নয়। তারা সাবমেশিনগান চালিয়ে সামনের দরজাটা ভেঙে ফেলবে। তাকে গুলি চালিয়ে ঝাঁঝরা করে বেরিয়ে আসবে। রাত্রিবেলা, মধ্যরাত্রির ঠিক কিছু আগে ঘটনাটা ঘটবে। মেকানিক্স গোষ্ঠী যে বাড়িতে অ্যাপার্টমেন্টটা আছে সেখানে একটা স্থায়ী নজর রাখার বন্দোবস্তু করবে যাতে বোরিস বাড়ি ফিরেছে, এক বেরিয়ে যায়নি এ ব্যাপারে নিঃসন্দেহ হওয়া যায়।
বোরিসের প্রাণরক্ষা করা ছাড়া আমার প্রধান কাজ ছিল এই ওসট উলম্যানকে ধরা, কারণ, এতদিনে আমরা সুনিশ্চিত হয়েছিলাম যে, সে স্পেকটর সংস্থার সঙ্গে যুক্ত এবং আমার একটা কাজই হল এই সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব কোথায় কোনও ভাবে টের পাওয়া মাত্র তক্ষুনি এদের পেছনে ধাওয়া করা। অবশ্য বোরিসকে আমরা বিপদের মুখোমুখি ছেড়ে দিতে পারতাম না। আর যদি তাকে আমরা নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে দিতাম তবে নিশ্চয়ই তাকে হত্যা করার পরিকল্পনাটা রূপায়িত হবে না এবং উম্যানকেও পাওয়া যাবে না। তাই আমাকে আরেকটা অপ্রীতিকর পরামর্শ দিতে হল। জেমস বন্ড অদ্ভুতভাবে হাসলেন, মানে আমার পক্ষে অপ্রীতিকর। ফটোগ্রাফ থেকে দেখেছিলাম যে আমার ও বোরিসের চেহারার মধ্যে, আমার বয়েস, উচ্চতা, গায়ের রং এবং নিখুঁত দাড়ি কামানোর ব্যাপারে, একটা ওপর ওপর কোন এক রকমের সাদৃশ্য রয়ে গেছে। কাজেই একদিন গোপন টহলদারি গাড়ি থেকে দেখে নিলাম–সে কি পোশাক পরে, কিভাবে হাঁটে। তারপর প্রস্তাব করলাম যে খুনের নির্ধারিত দিনের আগের দিন বোরিসকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় আমি তার অ্যাপার্টমেন্টে তারই ছদ্মবেশ নিয়ে ফিরব।
আমি আমার উদ্বেগ গোপন রাখতে পারলাম না, উঃ! কিন্তু অমন ঝুঁকি নেওয়া আপনার উচিত হয়নি। ধরুন, ওরা আক্রমণ করে বসল একটা টাইম বোমা বা ওই জাতীয় কিছু দিয়ে।
তিনি কাঁধটা একটু ঝাঁকালেন সব রকম সম্ভাবনার কথাই ভেবেছি। এটা হিসেব করে নেওয়া একটা ঝুঁকি। আর এজন্যই তো আমাকে পয়সা দেয়। তিনি হাসলেন। সে যাই হক, আমি তো এখন বহাল তবিয়তে এখানে হাজির, তবে ওভাবে হেঁটে যাওয়াটা খুব চমৎকার ব্যাপার ছিল না। এবং শেষ পর্যন্ত ভেতরে যেতে পেরে খুশিই হলাম। মাউন্টি গোষ্ঠী বোরিসের অ্যাপার্টমেন্টের উল্টোদিকের ফ্ল্যাটটা নিয়েছিল। আমি জানতাম যে আমি ঠিকই থাকব। আমাকে শুধু টোপের ভূমিকাটা অভিনয় করতে হবে; অনায়াসেই আমি ফ্ল্যাটে না গিয়ে বাড়িটার অন্য কোথাও লুকিয়ে থাকতে পারতাম–সব চুকেবুকে না যাওয়া পর্যন্ত। তবে আমি অনুমান করেছিলাম যে প্রতিপক্ষ যাচাই করে দেখবে যে ছাগলটা আদতে তাদের ভক্ষ্য ছাগল কিনা। আমার অনুমান যথার্থ ছিল; কারণ রাত এগারটার সময় টেলিফোন বেজে উঠল এবং একজন জানতে চাইল, মিস্টার বোরিস বলছেন কি? আমি বললাম, হ্যাঁ, আপনি কে বলছেন? বেশ বিদেশী বিদেশী ভাবে উচ্চারণ করলাম। লোকটি বলল, আমার টেলিফোন ডিরেক্টরী সংশোধন করার জন্য আপনার অঞ্চলের টেলিফোন গ্রাহকদের তালিকা মিলিয়ে দেখছি। শুভ রাত্রি। আমিও তাকে শুভরাত্রি জানালাম এবং ভাগ্যকে এই বলে ধন্যবাদ দিলাম যে বোরিসের উপস্থিতির প্রমাণ হিসেবে, সেই রাতে ওই ভুয়া টেলিফোন ধরবার জন্য আমি সশরীরে বর্তমান ছিলাম।
শেষের ঘণ্টার কাজকর্ম স্নায়ুর ওপর পীড়াদায়ক হল খুবই। প্রচুর গুলি বিনিময় হবে, বেশ কিছু লোক মারা যাবে; গায়ে যদি আঁচড়টিও না লাগে তবুও কেউই এরকম পরিস্থিতির সম্ভাবনা পছন্দ করবে না। আমার সঙ্গে একজোড়া বন্দুক ছিল। ভারি গুলি দিয়ে সত্যি সত্যি মানুষকে রুখে দেওয়া যায়। বারোটা বাজতে দশ মিনিট থাকতে দরজার ডানদিকে নিরেট দেয়ালের পাশে কোণা করে আমি নিজের ঠাই গাড়লাম। উম্যান বা তার কোন সহচর মাউন্টিদের ডিঙিয়ে দরজা ভেঙ্গে যদি ঢুকেই পড়ে, সে জন্য এই ব্যবস্থা করলাম। সত্যি কথা বলতে কি, যতই মিনিটের কাঁটা ঘুরতে লাগল, আমি কল্পনা করতে লাগলাম খুনেদের গাড়ি নিচের রাস্তায় এসেছে। তারা গাড়ি থেকে নামছে। আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে উঠছে। ভাবছিলাম আহা মাউন্টি রা যে তাদের একজনকে আমার সঙ্গে থাকতে দিতে চেয়েছিল সেই প্রস্তাবে যদি সম্মত হতাম। কিন্তু সেটা হত পুরো পাঁচটি ঘণ্টা একসঙ্গে প্রেমালাপ। তাছাড়া কোন বিষয় নিয়ে কতখানি কথা বলব তারও ঠিক নেই; তাছাড়া একা একা এসব অভিযান চালানোই আমি পছন্দ করতাম বেশি। আমার ধরন এটা। যাই হোক এক মিনিট বাকি আছে এমন সময়ে সিঁড়িতে রবারসোলের জুতার শব্দ পেলাম, আর ঠিক যেন গোটা নরকের গর্জন আছড়ে পড়ল।
