শুনে তিনি হাসলেন।
-বাস্তবিক পক্ষে আমি আপনার সঙ্গে একমত; তবে আপনার মতটা খুব বেশি জায়গায় প্রচার করা চলবে না। তাহলে আমি বেকার হয়ে পড়ব। যাই হোক, ওইরকম কোন শরণার্থী বার্লিনের ছাঁকনি দিয়ে ছাঁকা হয়ে বেরিয়ে আসতে পারলে তাকে বিমানে করে নিয়ে যাওয়া হয় ইংল্যান্ডে দরাদরির জন্য আপনি রাশিয়ানদের রকেট-ঘাঁটি সম্বন্ধে যা জানেন বলুন, তার বদলে আপনাকে দেওয়া হবে নতুন নাম, ব্রিটিশ পাসপোর্ট এবং আত্মগোপনের একটা জায়গা যাতে রাশিয়ানরা আপনাকে খুঁজে না বের করতে পারে। রাশিয়ানরা ওদের খুঁজছে, খুঁজে বের করে মেরে ফেলবে–এই ভয়টা ওদের খুব থাকে। আর যদি তারা রাজি হয়ে যান তবে তাদের কানাডা, অস্ট্রেলিয়া নিউজিল্যান্ড অথবা আফ্রিকার মত কয়েকটা মহাদেশ বা দেশের মধ্যে বেছে নিতে বলা হয়। যাতে তাদের যা কিছু জানা আছে সেগুলি জেনে নেবার পর তাদের নিজেদের পছন্দ করা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্লেনে করে। সেই সব দেশে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃক পরিচালিত একটা অভ্যর্থনা সমিতি, অবশ্যই খুব অপ্রকাশ্যভাবে, তাদের দেখাশোনা করে। ক্রমশ তাদের কোন-না কোন কাজের জোগাড় করে দিয়ে সহজ হয়ে উঠতে সাহায্য করা হয়। ধীরে ধীরে তারা সমাজের মধ্যেও মিশে যান যেমন করে স্বাভাবিক ভাবে আগত বিদেশীরা যান। এই ব্যবস্থা সাধারণ সর্বদাই ভালভাবে কাজ করে চলে। প্রথম প্রথম এঁরা স্বদেশ কাতর হয়ে ওঠেন এবং নতুন বাসভূমিতে পুনর্বাসনের দরুন অসুবিধা বোধ করেন। তবে অভ্যর্থনা সমিতি কোন-না কোন সদস্য প্রয়োজনীয় সহায়তা করার জন্য এদের নাগালের মধ্যেই থাকেন।
জেমস বন্ড আরো একটা সিগারেট ধরালেন, আমি আপনাকে এমন কিছুই বলছি না যা রাশিয়ানদের অজানা। এর একমাত্র গোপনীয় দিক হল ওই সব শরণার্থীদের ঠিকানা। ধরুন একজন আছেন, বোরিস নামেই উল্লেখ করব তাকে, যাকে ক্যানাডার টোরোন্টোতে পুনবার্সন দেওয়া হয়েছে। তিনি একেবারে নিখাদ সোনা যাকে বলে চব্বিশ ক্যারেট। উনি ক্রোনস্টাটে একজন উচ্চপদস্থ নো-যন্ত্র শিল্পী। পরমাণু চালিতে ডুবোজাহাজ পরিচালন দপ্তরের একজন কর্তাব্যক্তি। উনি ফিনল্যান্ডের সীমান্ত পেরিয়ে স্টকহোম এসেছিলেন। সেখানে তার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাকে প্লেনে করে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসা হয়। রাশিয়ানরা সাধারণত এই ধরনের স্বদেশত্যাগীদের কিছু বলে না–শুধু সাপ-শাপান্ত করে চলে আসতে দেয়। যদি তারা গুরুত্বপূর্ণ কোন পদে অধিষ্ঠিত থাকেন তবে তাদের পরিবারবর্গকে জাহাজে চাপিয়ে সুদূর সাইবেরিয়ার পাঠিয়ে দেওয়া হয় যাতে অন্যান্য অনুরূপ ভাবী দেশত্যাগীদের চাঞ্চল্য কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে ওঠে। কিন্তু বোরিসের বেলায় ব্যাপারটা অন্যরকম হয়ে গেল। লোকটাকে খতম করে দেবার জন্য তারা তাদের গুপ্ত বাহিনীকে ডেকে হুকুম দিলেন। ঘটনাচক্রে স্পেক্টর নামে একটি সংস্থার ওপর কাজটার দায়িত্ব এসে পড়ল।
জেমস বন্ড ঘরের অন্যদিকে বসা লোক দুটির দিকে কঠিন চোখে দেখে নিলেন। তারা নট নড়নচড়ন, নট কিছু ভাবে বসেছিল। বসেছিল, নজর রাখছিল, অপেক্ষা করছিল। কেন, কিসের জন্য! জেমস্ বন্ড আমার দিকে ফিরে বললেন, বাজে একঘেয়ে লাগছে না তো?
আমি বললাম, না, না। একদম না। কি রোমাঞ্চকর! এই স্পেক্টর ঘাতক দল সম্বন্ধে যেন কোথায় পড়েছিলাম? খবরের কাগজে কি?
আশা করি, তাই পড়েছেন। পারমাণবিক বোমার হারান প্রাপ্তি নিয়ে একটা ঘটনা ঘটেছিল গত এক বছরের মধ্যে। ওটাকে বলা হত অপারেশন থান্ডারবল। মনে পড়ছে। তার চোখ যেন কোন সুদূরে পাড়ি দিল, অকুস্থল ছিল বাহামা দ্বীপপুঞ্জ।
-হ্যাঁ তাই তো, আমি এবার স্পষ্ট মনে করতে পারছি। কাগজে বেরিয়েছিল ঘটনাটা। আমি তো ঘটনাটা বিশ্বাস করতেই পারিনি। ঠিক যেন রোমাঞ্চ সিরিজের বই থেকে ছেপে দেওয়া হয়েছে ওটা। কেন, বলুন তো? আপনি কি ওটাতে জড়িত ছিলেন।
জেমস বন্ড হাসলেন, কিনারে ছিলাম বোধহয়। কিন্তু ঘটনাটা হচ্ছে এই যে আমরা তখন এই
স্পের সম্প্রদায়কে নির্মূল করতে পারিনি। সম্প্রদায়ের যিনি অধিকারী মশাই, তিনি গা ঢাকা দিলেন। এটা ছিল এক ধরনের স্বাধীন পেশাদার, বহুদূর ব্যপ্ত গুপ্তচর সংস্থা– দ্য স্পেশাল এগজিকিউটিভ ফর কাউন্টারয়েসপিওনেজ, টেরারজম, রিভেনজ অ্যান্ড এক্সটেনশন নিজেদের সংস্থাকে তারা এই নামেই ডাকত। সে যাই হোক, তারা আবার সক্রিয় হয়ে উঠল, আগেই বলেছি তারা শুনেছিল যে রাশিয়ানরা বোরিসকে খুন করাতে চায় এবং কোনভাবে তারা বোরিসের আস্তানার খবর জোগাড় করে ফেলেছিল। কি করে, সেটা আর আমাকে জিজ্ঞেস করবেন না। এসব ব্যাপারে ওরা দারুণ খবরাখবর রাখে।
এখন এরা রাশিয়ার গুপ্ত বাহিনীর স্থানীয় দপ্তরে অর্থাৎ কে. জি. বি-র উচ্চপদস্থ কোন কর্তাব্যক্তির মাধ্যমে জানিয়ে দিল যে তারা এক লক্ষ পাউন্ড দক্ষিণা পেলে কাজটা করতে পারে। মস্কো রাজি হল। এরপর যা ঘটল তার ঘটনাস্থল অটোয়ায়। খ্যাতনামা মাউন্টিস সম্প্রদায় আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করল। এদেরও একটা বিশেষ শাখা আছে যাদের সঙ্গে এই জাতীয় ব্যাপারে আমরা খুব ঘনিষ্ট সহযোগী হিসেবে কাজ করে থাকি। এমন এরা খবর দিলেন যে ওস্ট উতৃম্যান নামে নাৎসী বাহিনীর জনৈক প্রাক্তন গোয়েন্দা, টোরোন্টোর গুণ্ডা দলগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন– এদের সম্পর্কে আমাদের কিছু জানা আছে কিনা? বোঝা যাচ্ছে যে তিনি কোন অচেনা বিদেশীকে হত্যা করাতে চান এবং এজন্য পঞ্চাশ হাজার ডলার অবধি দিতে প্রস্তুত। এই দুটো ব্যাপারকে জোড়া দেওয়া হল এবং আমাদের কোন বুদ্ধিমান সহযোগী আঁচ করলেন যে, এটা রাশিয়ানদের দ্বারা বোরিসের জীবন নাশের ষড়যন্ত্রের অংশ। জেমস্ বন্ড মুখ নিচু করলেন; আমাকে ব্যাপারটা তদন্ত করবার জন্য পাঠানো হল। তিনি আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন, আপনি কি এখন টেলিভিশন চালাবেন?
