তিনি আবার সেই আশ্বাসব্যঞ্জক হাসি হাসলেন।–ওহ হো, হ্যাঁ। তা নিয়ে ভাববেন না। রাজধানী ওয়াশিংটনের কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিরা আমাকে চেনেন। যদি আমরা ঠিকঠাক ভাবে এই ঝামেলা কাটিয়ে বেরোতে পারি, তবে আমি এই দুটোর পেছনে লাগব। তার চোখ আবার শীতল হয়ে গেল, আপনাকে যা করেছে তার জন্য এরা যাতে উপযুক্ত সাজা পায় সেটা আমি দেখব।
-আপনি আমার কথা বিশ্বাস করেছেন?
-নিশ্চয়ই। প্রত্যেকটি শব্দ। তবে একটা জিনিস বুঝতে পারছি না যে, এদের এখানে আসার উদ্দেশ্যটা কি? ওদের হাবভাব দেখে মনে হয় যেন নিশ্চিন্তে আপনার সঙ্গে যেমন খুশি আচরণ ওরা করতে পারে ভেবে নিয়েছে। আর এখন আমি এসে পড়ায় ওরা আমার সম্পর্কে খুব শান্তভাব দেখাচ্ছে। এটা ভাল ঠেকছে না। ওরা কি মদ-টদ খেয়েছে। সিগারেট খায়?
-না, কেউই না।
–সেটাও ভাল ঠেকছে না।
আমার রান্না হয়ে গিয়েছিল। কাউন্টারের ওপর সান্ধ্য আহার সাজিয়ে দিলাম। খাওয়া দেখে মনে হল তার খুব ক্ষিদে পেয়েছিল। তাঁকে রান্না ঠিক হয়েছে কিনা জিজ্ঞাসা করলাম। তিনি বললেন, দারুণ হয়েছে। শুনে আমার মন স্বাদু উষ্ণতায় ভরে গেল। কি অত্যাশ্চর্য নিয়তি, এই মানুষটি, ঠিক এই মানুষটি যেন ভোজবাজীর মত আকাশ ছুঁড়ে এসে হাজির। এজন্য নিজেকে ভাগ্যবতী বলে মনে হল। এ যেন একটা অলৌকিক অতিপ্রাকৃত সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করব বলে মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম। একান্ত অনুগতের মত তার কাছাকাছি ঘোরাফেলা করছিলাম। তাকে আরো কফি ঢেলে দিলাম। টোস্ট খাবার জন্য কিছু জ্যাম দিলাম। শেষে তিনি হেসে বললেন, আপনি আমার ইহকাল ঝরঝরে করে দিচ্ছেন। আমি দুঃখিত। ব্যাপারটা একদম ভুলে গিয়েছিলাম। এখন আপনার সিগারেট খাবার সময়। কেসৃভর্তি সবগুলি সিগারেটই অবশ্য আমার পাওনা হয়েছে। এর মধ্যে তিনি রোন্সন লাইটার জ্বেলে সিগারেটটা ধরিয়ে দিলেন। সিগারেট কেসের মত লাইটারটাও তামার তৈরি। আমার হাতের সঙ্গে তাঁর হাত ছুঁয়ে গেল। সারা শরীরে যেন একটা বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। হঠাৎ দেখলাম আমি থরথর করে কাঁপছি। তাড়াতাড়ি রেকাবিগুলো নিয়ে ধুতে লাগলাম। বললাম, পাওনা হবার মত কিছুই করিনি। আপনার এখানে আসাটা এত চমৎকার হয়েছে। এটা পুরোপুরি একটা অলৌকিক ঘটনা। আমার গলা ধরে এল এবং অর্থহীন অশ্রু ঝরে পড়ল চোখ থেকে। হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখ মুছে নিলাম।
নিশ্চয়ই এটা তার চোখে পড়েছিল, তবে তিনি এমন ভাব দেখালেন যে, তিনি লক্ষ্যই করেনি। বরং বেশ উফুল্লভাবে তিনি বললেন, হ্যাঁ। এটা ভাগ্যের একটা খেলা। অন্তত, আশা করি তাই। শেষ ভাল যার, সব ভাল তার। কি বলছি শুনুন। আজ এই দুটো গুণ্ডার জন্য রাতটা বসে কাটাতে হবে। ওরা কোন চাল না চালা পর্যন্ত চুপচাপ অপেক্ষা করতে হবে। আমি কিভাবে আজ রাত্রে এখানে এলাম সেই কাহিনী শুনবেন? দু-এক দিনের মধ্যে কাগজে ঘটনাটা বেরুবে। শুধু কাহিনীটা। আমার কথা থাকবে না। কাজেই আপনাকে প্রতিজ্ঞা করতে হবে সে কাহিনীতে আমার ভূমিকা আপনি ভুলে যাবেন। ওটা বাজে। সত্যি এই নিয়মকানুন। তবে ওসব মেনেই আমাকে কাজ করতে হয়। ঠিক আছে তো? এতে বিপদের দিক থেকে আপনার মনটা ফিরবে। দারুণ জোরাল গল্প।
কৃতজ্ঞতার সঙ্গে বললাম, হ্যাঁ, বলুন না দয়া করে। আর আমিও কথা দিচ্ছি কেউ জানবে না।
.
রাতের বেলার গল্প
যাতে তিনি আস্তে বললেও শুনতে পাই এবং তার কাছে থাকতে পারি, এজন্য বেসিনের পাশের উঁচু জায়গাটায় ঠিক তাঁর পাশে উঠে বসলাম। আরেকটা সিগারেট আমাকে দিতে গেলে আমি আর খাব না বললাম। তখন তিনি একটা সিগারেট ধরিয়ে আয়নায় অনেকক্ষণ ধরে গুণ্ডা দুটোকে দেখলেন। আমিও তাকালাম আয়নার দিকে। ওরা দুজন তাকিয়ে ছিল; ওদের চোখের নিষ্ক্রয় ও নিরুদ্বেগ বৈরীতার চাহনি যেন বিষাক্ত গ্যাসের মত ঘরটাকে গ্রাস করে নিচ্ছিল। ওদের সতর্কতা কিংবা ওই নিরুদ্বেগ ভাব কোনটাই আমার ভাল লাগছিল না। তা এমন শক্তিশালী, এমন দুর্দমনীয়, যেন সব প্রতিকূলতা নিয়ে ওরা বসে আছে এবং পৃথিবীর সবটুকু সময় ওদের আয়ত্তে।
কিন্তু এতে জেমস্ বন্ডকে উদ্বিগ্ন দেখাল না। দাবা খেলুড়ের মত তিনি যেন সব কিছু ওজন করে দেখছিলেন। তাঁর চোখে যে আত্মগরিমা ও শক্তির সুনিশ্চিন্ত ভাব দেখছিলাম, সেটাই আমার উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। তিনি তো এদের কার্যকলাপ চাক্ষুষ দেখেননি। তাঁর জানার কথা নয় যে এরা কতদূর কি করতে পারে, যেমন এক মুহূর্তে এদের পিস্তল অগ্ন্যুগার করে উঠে সার্কাসে যেমন গুলি করে নারিকেলের খোলা ফাটিয়ে দেয় ঠিক সেই ভাবে আমাদের মাথা গুঁড়িয়ে দিতে পারে। তারপর লাশ দুটোতে পাথর বেঁধে হ্রদের পানিতে ডুবিয়ে দিতে পারে।
জেমস বন্ড তার কাহিনী শুরু করলেন, আর আমিও এইসব দুঃস্বপ্ননের কথা ভুলে তার মুখের দিকে তাকিয়ে শুনতে লাগলাম। ইংল্যান্ডে, তিনি বলছিলেন, যখনই ওধারের সীমান্ত পেরিয়ে মানে রাশিয়ার সীমান্ত পেরিয়ে, কোন পুরুষ বা মাঝে মধ্যে নারী, গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ নিয়ে এধারে চলে আসেন তখন একটা নির্দিষ্ট ছক অনুসারে চলতে হয়। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক বার্লিন–এই পথটাই সাধারণত এরকম দেশত্যাগের ব্যাপারে ব্যবহৃত হয় বেশি। প্রথমে। এদের সদর গোয়েন্দা দপ্তরে নিয়ে গিয়ে, প্রচণ্ড সন্দেহের চোখে দেখা হয়। দু মুখো চর বা ডবল এজেন্ট, অর্থাৎ যারা। দেশত্যাগী বলে ভান করে আসা এবং নিরাপত্তা বিভাগের ছাড়পত্র মেলার পর ভেতর থেকে আমাদের ওপরই গুপ্তচর গিরি করে রাশিয়ায় খবর পাচার করে এদের সম্পর্কে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসাবেই যাচাই করে নেবার জন্য ওরকম করা হয়। অবশ্য ট্রিপল এজেন্ট–যাকে তিনমুখো গুপ্তচর বলে তাও আছে। এরা দু মুখো চরদের মতই কাজকর্ম করে কিন্তু পরে মনে পাল্টায় এবং আমাদেরই তত্ত্বাবধানে ভুয়া সব খবর রাশিয়ায় পাঠিয়ে দেয়। বুঝতে পারছেন? এটা সত্যি একটা জটিল খেলা ছাড়া আর কিছুই না। আর তাছাড়া আন্তর্জাতিক রাজনীতি, কূটনীতি–জাতীয়তাবাদের ফাঁদ, কয়েকটি দেশের শক্তিগোষ্ঠীর ছত্রাবরণ নির্মাণ–এসবই তো, তাছাড়া আর কিছু নয়। এই খেলা থেকে কেউ নিবৃত্ত হবে না। এটা মানুষের সহজাত মৃগয়া করার প্রবৃত্তিরই মত।-হ্যাঁ, তাই তো। আমাদের যুগের ছেলেমেয়েদের চোখে ওগুলো বোকামী। ঠিক সেই পুরানো দাঙ্গা দাঙ্গা খেলার মত। আরও কিছু জ্যাক কেনেডীর মত মানুষ দরকার। এ সমস্তই বানপ্রস্থে না-যাওয়া বুড়োদের কীর্তি। জগতের ভার তাদের ছেড়ে দিয়ে যাওয়া উচিত তরুণদের হাতে, যাদের অবচেতন মনে যুদ্ধবাজ মানসিকতা শেকড় গেড়ে বসেনি। যুদ্ধই যেন একমাত্র সমাধান। বাচ্চাদের মারধোর করার মত। এটা অনেকটা একই ধরনের। এসব আজ অতীতের বস্তু হয়ে গেছে প্রস্তর যুগের আচরণবিধির মত।
