-দেখলেন তো? তাই আমরা ওনাকে কেবল ঠেকাচ্ছিলাম। আপনি এসে পড়ার আগ পর্যন্ত। তাই না হরর?
হররের দিকে তাকিয়ে সে বলল। হরর উত্তর দিল, সম্পূর্ণ সত্যি।
-আমি পেছনের দরজার দিকে হেঁটে গেলাম, এবং দরজার ফ্রেমের বুলেটের আঘাতে যে গর্ত হয়েছিল তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করলাম।
-এই বুলেটের গর্তটা এখানে কি করে এল? স্লাগসি প্রাণ খুলে হেসে উঠল, আমি তা কি করে জানব? কৈ, না তো!
হররের গলায় বিরক্তি। সে খাবার জায়গার কাউন্টারের কাছে মেঝের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, তবে এই মহিলাকে, আমার বন্ধুর দিকে, প্রচুর লোহার জিনিসপত্র ছুঁড়তে দেখেছি। তার চোখের মনি আমার দিকে আস্তে আস্তে ঘুরিয়ে আনল, কেমন মিস, ঠিক না? আর নিচে কোথাও সেই বাঁকানো ফলাওয়ানা ছুরিটা পড়ে আছে। ভোর হলেই আমরা নালিশ রুজু করব এরকম আক্রমণাত্মক ব্যবহারের জন্য। আমি জোর দিয়ে বললাম, দেখব কতদূর বানাতে পারব। তোমরা খুব ভাল জান যে আমি আত্মরক্ষা করার চেষ্টাই করে গেছি। আর তোমাদের ওই টাকা চুরি যাবার কাহিনীটা আমি এই প্রথম শুনলাম। সেটাও তোমরা জান।
খুব শান্তভাবে ইংরেজ ভদ্রলোক বললেন, বাঃ দেখা যাচ্ছে আমি ঠিক সময়েই এসে পড়েছি, ক্ষতি রক্ষার জন্য। তা রেজিস্ট্রি খাতাটা কোথায়, দেখি সই করি? -রেজিস্টার চলে গেছে মালিকের কাছে। কিছু সই সাবুদ করার দরকার। নেই। আপনাকে তো খদ্দের হিসেবে আর পয়সা দিতে হবে না। হোটেলটা এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। শুধু রাত্তিরে শোয়ার জন্য একটা বিছানা, এই মাত্তর। স্লাগসি কটকটু করে বলল।
— বেশ ধন্যবাদ। আপনাদের অতীব সহৃদয়তার পরিচয় এটা।
জেমস বন্ড আমার দিকে তাকালেন, কিছু ডিম মাংস ও কফি জুটে যাবার মত বরাতজোর কি হবে আমার? এত সব কথাবার্তার পরে ভারি ক্ষিধে পেয়ে গেছে। জিনিসগুলো যদি পাওয়া যায়, তবে আমি নিজেই বেঁধে নিতে পারি। না, না। খাবার তৈরি করে দিতে আমার ভালই লাগবে।
এক ছুটে কাউন্টারের ওপাশে গিয়ে বসলাম। অনেক ধন্যবাদ।
বলে একটা টুলে অ্যাটাচি কেসটা রেখে, আরেক টুলে নিজে উঠে স্লাগসির দিকে পেছন ফিরে কাউন্টারের ওপর ঝুঁকে বসলেন। চোখের এক কোণ দিয়ে দেখলাম যে, স্লাগ্সি ঘুরে রোগা লোকটার কাছে চটপট চলে গিয়ে বসল এবং জরুরী কথা বার্তায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
জেমস বন্ড ঘাড় ঘুরিয়ে একবার ওদের দেখলেন। তারপর টুল থেকে নেমে গায়ের বর্ষাতি ও মাথার টুপি খুলে অ্যাটাচি কেসটার ওপর রাখলেন এবং আবার টুলে উঠে বসলেন। তিনি কাউন্টারের পেছনের দেওয়ালে লাগানো লম্বা আয়নাটায় নিঃশব্দে ওদের লক্ষ্য করতে লাগলেন। আমি রান্নার জিনিসপত্র ঠিকঠাক করতে করতে কয়েক নজর তাকিয়ে দেখলাম তার দিকে।
লম্বায় প্রায় ছ ফুট দোহারা চেহারার মজবুত গঠনের মানুষ। অল্প রোদে পোড়া ঝুঁকে পড়া মুখে, তার চোখ দুটি খুব পরিচ্ছন্ন ধূসর নীল রংয়ের এবং ওদের দুজনকে পর্যবেক্ষণরত অবস্থায় তাঁর সেই দুই চোখ সংযত ও সতর্ক বলে মনে হচ্ছিল। নিবিষ্ট সতর্কতার সঙ্গে ওদের ওপর নজর রাখার দরুন তার চোখ দুটি সরু হয়ে এসেছিল। এতে তার অমন সুন্দর মুখটাকেও দেখাচ্ছিল প্রায় হৃদয়হীন ও বিপজ্জনক চরিত্রের লোকেদের মত। প্রথম দর্শনে মুখের এই ভাবটা দেখেই আমি ভয় পেয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু এখন তো দেখছি কি চমৎকার তার হাসি। তার মুখ আমার কাছে এখন দারুণ উত্তেজক এভাবে আগে আর কোন পুরুষের মুখ আমাকে এমন উত্তেজিত করেনি। তার গায়ে ছিল সাদা নরম রেশমী জামা। সরু একটা লেসের টাই হালকা বাঁধনে গলা থেকে ঝুলছে। সবল ও সুগঠিত দুটি হাত কাউন্টারে আড়াআড়ি ভাবে রাখা ছিল। তিনি হিপপকেট থেকে তামার একটা সিগারেট কেস বের করে সেটা খুললেন।
-একটা নিন না? সিনিয়র সার্ভিস ব্র্যান্ড। এরপর থেকেই চলবে চেস্টার ফিল্ডস্। বলে মুখ নিচু করে হাসলেন তিনি।না ধন্যবাদ। এখন না। রান্নাটা সেরে নিই আগে।
-একটা কথা জিজ্ঞাসা করছি; আপনার নামটা তো জানা হল না? আপনি কানাডার মেয়ে, তাই না?
-হ্যাঁ কুইবেক থেকে আসছি। তবে গত পাঁচ বছরের মত সময় আমি ইংল্যান্ডে কাটিয়েছি। আমার নাম ভিভিয়েন মিশেল। আমার বন্ধুরা আমাকে ভি বলে ডাকে। _এবার বলুন দেখি কি করে আপনি এর মধ্যে এসে পড়লেন? অনেক বছরের মধ্যে এদের মত দুর্ধর্ষ ঘাগু গুণ্ডা আমি দেখিনি। ট্রয় শহরটাও কুখ্যাত–আলবেনীর উপকণ্ঠে গুণ্ডা বদমাশদের শহরতলী। রোগা লোকটা নির্ঘাৎ অনেকদিন কয়েদ খাটার পর জেল থেকে বেরিয়েছে। দ্বিতীয়টা তো খুব খারাপ ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। এটা ঘটল কি করে?
রান্নার ফাঁকে ফাঁকে অতি প্রয়োজনীয় জায়গাগুলি ছাড়া অন্য অংশগুলি হেঁটেকেটে তাঁকে সংক্ষেপে বললাম। কোন মন্তব্য না করে শান্তভাবে তিনি সব কথা শুনলেন। রেডিওতে তখনও গীতলহরী চলছিল এবং দুই সাঙাৎ চুপচাপ বসে বসে আমাদের লক্ষ্য করছিল। আমি তাই গলার স্বর নিচে নামালাম। শেষ করার পর জিজ্ঞেস করলাম। আচ্ছা, আপনি পুলিশের লোক–একথা কি সত্যি?
–অবিকল সত্যি না। তবে আমার পেশা ওদের সঙ্গেই জড়িত।
–তার মানে বলছেন আপনি একজন গোয়েন্দা?
–তা ওই জাতীয় বলতে পারেন।
–আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
–কি করে? তিনি হাসলেন।
—সেটা আমি বলতে পারব না। কিন্তু আপনাকে দেখলে এক ধরনের, সাংঘাতিক ভাব আছে মনে হয়। আর ব্যাগ থেকে যা বের করলেন সেটা তো পিস্তল। সেই সঙ্গে কার্তুজ। আপনি কি আমার অস্বস্তি লাগছিল, তবু জানাটা দরকার–একজন অফিসার? মানে আমি বলছি সরকারি কর্মকর্তা?
