বন্ড আবার জিজ্ঞেস করল, আমরা কোন্ দিকে যাব?
আমরা যাচ্ছি এখন আল্পস্-এর চূড়ার দিকে।
জানলার কাছে হাত নেড়ে ইরমা। ভারি সুন্দর। আপনি তো পাহাড়ই ভালবাসেন, তাই নয় কি?
হ্যাঁ, ভালবাসি বৈ কি? বন্ড তেমনি ভাবে চিৎকার করে বলল, ঠিক স্কটল্যান্ডের মতই।
সে একটু ঠেস দিয়ে বসল, একটা সিগারেট ধরিয়ে নিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকল। প্রায় ২,০০০ ফুট উঁচু। দিয়ে তারা যাচ্ছে। বন্ড তার ব্রিফকেস থেকে ডেইলী এক্সপ্রেস বের করে খেলার পাতাতে চোখ বোলাতে লাগল। একবার বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখে তারা ড্যাভোস উপত্যকার উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছু সময় পরেই ট্রেসীর ক্লিনিকের ওপর দিয়ে যেতে হবে। চারদিক বরফে ঢাকা, পার্সেনের গভীর ঢালুর কথা তার মনে পড়ে গেল। এ-সব জায়গায় কত সে বেড়িয়েছে। দু পাশে বিরাট পাহাড়ের চূড়া। আবার কাগজে মুখ দিয়ে রাখল। বরফ ঢাকা পাহাড়ের চূড়ার উপর সূর্যের আলো পড়ে জ্বলছে আর নিচে গাঢ় অন্ধকার দেখা যাচ্ছে। এখন হেলিকপ্টার নিচের দিকে একটি উপত্যকা লক্ষ্য করে নামছে। বেশ কিছু বাড়ি থেকে সোনালি তার নেমে গেছে উপত্যকার নিচে।
একটা ধাক্কা খেয়ে হেলিকপ্টার নিচের দিকে নামল। যন্ত্রটা বন্ধ হল, আস্তে আস্তে পাখাটা থেমে গেল। তাহলে তারা এসে পৌঁছাল।
কিন্তু কোথায় যাবে? বন্ড জানে ল্যাংগার্ড পর্বত শ্রেণীর উপত্যকা ১০,০০০ ফুট উঁচুতে আছে। ধারাল ছুরির মত ঠাণ্ডা হাওয়ার জন্য বর্ষাতির বোম এঁটে নিয়ে তৈরি হল সে।
ইরমা বা অপ্রয়োজনীয় একটা মন্তব্য করে বসল, আমরা এবার এসে গেছি। হেলিকপ্টারের দরজাটা খোলা হল, বরফ চারদিকে ছিটকে পড়ল।
ইরমা মাথা নিচু করে বলল, মাথা বাঁচিয়ে। এদিকে বন্ড ভাবছিল, ওর শক্ত পাছায় যদি একটা লাথি মারা যায় তবে কেমন হয়।
ওর পেছন পেছন বন্ড নেমে গেল। তার অক্সিজেনহীন বাতাসে শ্বাস নিতে খুব কষ্ট হল। কয়েকজন লোক আশেপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। স্কী গাইডের মত তাদের পোশাক। কৌতূহলী নজরে তারা তাকাল বন্ডের দিকে। পেছনে সুটকেস নিয়ে আসছে সেই বাকি লোকটি। বাতাসে হেলিকপ্টারটা উঠে গেল। বন্ডের মুখে বরফের কুচি ছিটকে পড়ল।
প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে বাড়িগুলি দেখা গেল। সব জানালায় আলো চোখে পড়ল। একটি বাড়ির ভিতর ঢুকল ইরমা বান্ট, দরজাটা খুলে ধরল। তার নজর পড়ে গেল একটা বড় সাইনবোর্ডের উপর। লাল অক্ষরে বড় G, নিচে লেখা আছে–গ্লোরিয়া-ক্লাব, ৩৬০৫ মিটার, প্রাইভেট।
তারা সবাই ভেতরে ঢুকে গেল। ভেতরটা আরামদায়ক উষ্ণ, প্রায় গরম বললেই হয়। সামনেই ছোট একটা রিসেপশনের ঘর। টেবিলের ওপাশ থেকে একটি অল্প বয়সের ছেলে উঠে দাঁড়াল, বলল, স্যার হিলারীর দু নম্বর ঘর। ইরমা বলল, আসুন আমার সাথে।
আবার দরজা, লাল গালিচা বিছানো প্যাসেজ। আর বাঁ দিকের দেওয়ালে পাহাড়ের ফটোগ্রাফ ঝোলানো আছে। একটু এগিয়ে গেলে ডানদিকে বার ও রেস্তোরাঁ। ইরমা তখন দু নম্বর ঘরটা দেখিয়ে দিল। ঘরটা যে আরামের তা দেখেই বোঝা গেল, আর ঘর লাগোয়া বাথরুম। বড় জানালা দরজা দিয়ে ঢাকা, বন্ড কিন্তু জানে পর্দাটা সরালেই পাহাড়ের দৃশ্য দেখা যাবে। বন্ড জোড়া খাটের উপর তার সুটকেসটা রেখে দিল। বোলার টুপি আর ছাতাটা রেখে দিল ঘরের কোণায়। লোকটি তার সুটকেসটা নিয়ে ঘরে ঢুকল। লাগেজ স্ট্যান্ডে সুটকেসটা রেখে দিয়ে ঘর থেকে চলে গেল, বন্ডের দিকে আর তাকাল না।
ইরমা জিজ্ঞেস করল–আপনার এই ঘরটি পছন্দ হয়েছে তো?
বন্ড কোন জবাব দেবার আগেই ধরে নিল ঘরটা তার পছন্দ হয়েছে।
বেশ ভাল কথা, এবার আপনাকে কয়েকটা কথা বলি। ক্লাবের নিয়ম-কানুন সম্বন্ধে।
বন্ড একটা সিগারেট ধরাল। হ্যাঁ, বল, তাহলে আমাদের সুবিধা হয়। সে সঙ্গে আরো কয়েকটি কথা আছে। যেমন ধর, এই জায়গাটার নাম কি সেটা আগে জানা দরকার, তাই না?
এই জায়গাটার নাম তেমন কিছু নয়। আমরা এখন আছি আলপস্ পাহাড়ের চূড়ায় অনেক উঁচুতে। এর নাম হল। পিজ গ্লোরিয়া। এটা অবশ্য কাউন্টের সম্পত্তি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সাহায্যে কাউন্ট সিলভ্যানটা তৈরি করেছেন, দেখেছেন তো তার নেমে গেছে নিচের দিকে প্রচুর লোক আসে এখানে স্কী করতে, খুব ভাল রোজগারও হয়, চমৎকার স্কী-রান আছে কয়েকটি এখানে। স্কী নিশ্চয় আপনি জানেন? বিশেষ আগ্রহ নিয়ে হলদে চোখ জোড়া উত্তরের অপেক্ষা। করছে।
বন্ড সাবধান হয়ে গেল, বলল, না, আমার স্কী জানা নেই। আর সময়ও পাইনি কোন দিন এগুলি করবার। বই নিয়েই আমার সারাটা জীবন কেটে গেল।
সত্যি ভারী কষ্টের কথা। বলল ইরমা, কিন্তু পরিষ্কার বোঝা গেল বেশ খুশিই হয়েছে। তাহলে তো কাউন্টের ভালই রোজগার হয়। প্রতিষ্ঠান চালানো তো খুবই খরচের ব্যাপার, এটাই তো কাউন্টের জীবনের প্রধান কাজ।
বন্ড জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল।
এখানে একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠান আছে। সেখানে বৈজ্ঞানিক গবেষণা হয়। মানুষের দেহের খাদ্যের প্রতিক্রিয়া নিয়ে কাউন্টও বিশেষ অনুসন্ধান করে যাচ্ছেন, প্রায় পথিকৃত বলা যেতে পারে। যেমন, অনেকের আছে কাঁকড়া, চিংড়ি মাছ খেলেই গা চুলকাতে শুরু করে তেমনি।
ওঃ আমার অবশ্য এসব কিছু নেই। তুমি হয়ত এ্যালারজির কথা বলছ, তাই না?
হ্যাঁ, তাই তো। ল্যাবরেটরীটা আছে অন্য বাড়িতে আর সেখানেই থাকেন কাউন্ট। এই বাড়িতে রোগীরা থাকে। কাউন্ট কিন্তু একটা অনুরোধ করেছেন যে রোগীদের সাথে দেখা হলে যেন তাদের বিরক্ত করা না হয়। চিকিৎসার অসুবিধা হতে পারে, এবার বুঝলেন তো?
