.
মহিলাটি বিপজ্জনক
পরদিন লন্ডন এয়ারপোর্টে। তার মাথায় আছে বোলার হ্যাট, হাতে পাকানো ছাতা, ও টাইমস পত্রিকা সাথে নিজেকে দেখে তার একটু হাস্যকর বলে মনে করল জেমস্ বন্ড। প্লেন ছেড়ে দেবার পূর্বে তাকে যখন ভি. আই. পি. লাউঞ্জ দেখিয়ে দিল তখন আর সামান্য নয়, নিজেকে বেশ হাস্যকর মনে হল রীতিমত। টি বোট ডেস্কে-এ তাকে একজন স্যার হিলারী বলে ডাকল, তখন সে চমকে উঠে পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখল। নাঃ, এভাবে আর চলবে না, তাকে স্যার হিলারী ব্লে হতেই হবে।
দুটো ব্র্যান্ডি জিঞ্জারের সাথে নিয়ে সে খেয়ে ফেলল। তারপর একপাশে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে নিজেকে ব্যারনেট ভাবতে মনে করল। তার মনে হল আসল হিলারী ব্লে-র কথা, সে জেমস বন্ডই হতে চায়, আর কিছু নয়। বন্ড টাইমস কাগজটা ছুঁড়ে ফেলে দিল একদিকে, তারপর একখানা ডেইলি এক্সপ্রেস তুলে নিল। তারপর আর একটা ব্র্যান্ডি জিঞ্জার এইল মিশিয়ে দিতে বলল। এবার সুইস এয়ার ক্যারাভেল যখন আকাশে উঠে গেল, জুরিখের সলিসিটরদের কথা তার মনে হতে থাকল। তারাই তো তার এই অভিযানের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। কটে দ্য ব্লিউভিলির একজন সেক্রেটারী এয়ারপোর্টে স্যার হিলারীকে অভ্যর্থনা জানাবার জন্য উপস্থিত হবে। কাউন্টের সঙ্গে দেখা হবে আজ কিংবা কাল। এক সময়ের জন্য তার মনে একটা আশংকা দেখা দিল। সে লোকটাকে কি বলে ডাকবে? কাউন্ট? মসিয়ো লি কমূটে? না, কিছুই সে বলবে না, হয়ত, কোন্ সময় যদি ডাকার প্রয়োজন হয় তবে বলবে মাই ডিয়ার স্যার।
কেমন দেখতে হবে ব্লোফেল্ড? ওর চেহারা কি খুবই পরিবর্তন হয়ে গেছে? হয়ত হতে পারে, তা না হলে এই ধূর্ত শিয়ালটা কেন কৃতিত্বের সাথে শিকারী কুকুরদের চোখে কিভাবে ধুলো দিয়ে থাকতে পারত না। একজন সুন্দরী স্টুয়ার্ডস তাকে লাঞ্চ দিয়ে চলে গেল। ফ্রান্সের অস্পষ্ট ধূসর সীমারেখা দিগন্তে মিশে গেল। তারপর কুয়াশা ও রাইন নদীতে বরফের স্রোত। বাসলে ক্ষণিতের জন্য প্লেনটা থেকে গেল। এরপর জুরিখের এয়ারপোের্ট–প্লেন নিচে নামছে, ছোট্ট একটা ধাক্কা লাগল।
প্লেন থামল। বেশ কয়েক গজ দূরে ইউরোপীয় ধাচের বড় বড় বাড়ির গায়ে নানা দেশের সব পতাকা উড়ছে। রিসেপশন কাউন্টারের কাছে এসে বন্ড থেমে গেল। একটি মেয়ে এসে তাকে জিজ্ঞেস করল, স্যার হিলারী ব্লে?
হ্যাঁ।
আমি ফ্রলাইন ইরমা বান্ট। কাউন্টের একদম পারসোন্যাল সেক্রেটারি। …আশা করি আরামেই এসেছেন।
জেলের স্ত্রী-প্রহরীর মত রোদে পোড়া চেহারা, কর্কশ চৌকো একখানি মুখ, কঠিন হলুদ রঙের দুটি চোখ। রসহীন হাসি, ধূসর তামাটে চুল পেছন দিকে শক্ত করে বাঁধা। মাথায় স্কী-টুপি। চিবুকের সাথে ফিতে দিয়ে বাঁধা। আকারে ছোট কিন্তু জবরদস্ত শরীর। পরনে বেমানান ট্রাউজার আর জ্যাকেট, বাঁদিকে বড় লাল আকারে G দেখা যাচ্ছে।
বন্ড বলল, হ্যাঁ, খুব আরামেই এসেছি।
আসুন আমার সাথে। আগে পাসপোর্ট এই তো এদিকে।
বন্ড তার পিছনে পিছনে পাসপোর্ট কন্ট্রোল অফিসে এল, তারপর কাস্টমস্ হল।
একটি লোক ব্রিফকেস হাতে নিয়ে বাইরে অপেক্ষা করছে বন্ড দেখতে পেল। লোকটি তাকে দেখে এক টেলিফোন বুথে ঢুকে পড়ল। আপনি কি জার্মান ভাষায় কথা বলতে পারবেন? জিজ্ঞেস করল ইরমা বান্ট, জিব দিয়ে তার ঠোঁটটা চেপে চেটে নিল, রোদের কড়া তাপে ফোস্কার ঘা হয়ে গেছে ঠোঁটের একদম পাশে।
না। আমি জার্মান ভাষা তো জানি না।
ফ্রেঞ্চ হয়ত পারতে পারেন?
কিছু কিছু, তবে আমার কাজ চলে যায়।
হ্যাঁ, সেটাই আপনার কাজে লাগবে। ট্ৰলী থেকে বন্ডের সুটকেস নামানো হল। কাস্টমস্ অফিসারকে ইরমা একটা পাশ দেখাল। একটি কুলি সুটকেসটা তুলে নিল। বাইরে এসে দাঁড়াতেই একটা মার্সিডিস গাড়ি এসে তাদের পাশে দাঁড়াল। সোফারের পাশে সেই লোকটিকে বসে থাকতে দেখা গেল। সেই টেলিফোনে কথা বলতে গিয়েছিল। বন্ডের সুটকেস গাড়িতে তুলে দিল, গাড়ির দরজাটা ইরমা বান্ট খুলে দিল। বন্ড গাড়িতে উঠে পড়ল। তারপর ইরমা। গাড়ি ছুটে চলল জুরিখের দিকে। কিছু দূরে আসতেই সোফারের পাশের লোকটি বলল, ডাইনে। বন্ডের চোরা চাউনি ছুঁয়ে যাচ্ছে আয়নাতে। আদেশ পেয়ে গাড়ি ডানদিকে ঢুকে গেল। একটি বোর্ডের লেখা দেখতে পেল, প্রাইভেট রোড। কিছুটা এগিয়ে একটা বাড়ির পাশে কয়েকটি হ্যাঁলিকপ্টার চোখে পড়ল বন্ড-এর। গাড়ি গিয়ে থেমে গেল কমলা রঙের হেলিকপ্টারের পাশে। এর গায়ের বড় লাল অক্ষরের G লেখা আছে। তাহলে আর মোটর নয় এবার হেলিকপ্টারে।
আগে কখনো উঠেছেন? ইরমা গাড়ি থেকে নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল, চড়েননি? ভারি কিন্তু চমৎকার লাগবে। আলপস্-এর চমৎকার দৃশ্য দেখা যায়। গলার শব্দে তাপ। কোন তাড়া নেই, প্রাণ নেই, মাথাটা বাঁচিয়ে।
ছয়জন লোক অনায়াসে বসতে পারে। লাল চামড়ার আরাম করার মত আসন। পাইলট বুড়ো আঙ্গুলের ইশারা করতেই নিচের কাঠিটা সরিয়ে দিল। ধীরে ধীরে হেলিকপ্টার উপরে উঠে যেতে লাগল। চারিদিকে ছড়ানো আছে বরফের টুকরো। ইরমা বান্ট বন্ডের সামনে, বাড়তি লোকটা তার পিছনে বসে আছে। যন্ত্রের প্রচুর শব্দ হচ্ছে। বন্ড উঁচু গলায় প্রশ্ন করল, আমরা কোথায় যাচ্ছি?
ইরমা এমন ভান দেখাল যেন কিছুই শুনতে পায়নি।
