আমার বুক ধড়াস ধড়াস করছিল জোরে জোরে। যাই হোক, যাই ঘটুক না কেন, নিজেকে বাঁচাতে হবে!
দরজায় বেশ জোরে ধাক্কা পড়ল। আমি আস্তে আস্তে আমার জামার ওপরের অংশটার দুই মুখ একত্র করে ধরে নিয়ে এগিয়ে গেলাম। প্রথমে কি করতে হবে ভেবে নিয়েছিলাম। দরজার কাছে যেতেই স্লাগসি ধার থেকে ঝুঁকি এসে লকটা খুলে দিল। এখন আমার হাতের ক্ষিপ্রতার ওপর সব কিছু নির্ভর করছে। বাঁ হাত দিয়ে দরজার হাতলটা ধরে ঘোরাতেই ডান হাত থেকে নিচু গলায় কে যেন আমাকে শাপান্ত করল। আমি পিঠে পিস্তলের নল ছোঁয়ানো আছে বুঝতে পারলাম। কিন্তু ততক্ষণে দরজা সপাট খুলে দিয়েছি। পাল্লার পেছনে আড়াল হয়ে স্লাগসি দেয়ারের সঙ্গে মিশে রয়েছে। বরাত ঠুকে এই ঝুঁকিটা নিয়েছিলাম। আগন্তুক যদি পুলিশের লোক হয় বা ভ্রাম্যমাণ পাহারাদার হয় তবে তো ওরা গুলি করতে পারবে না। ওরা করলও না। এখন ওই নিঃসঙ্গ আগন্তুকের ওপরই সব কিছু নির্ভর করছে। সে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিল।
প্রথমে এক নজর দেখে মনে মনে হায় হায় করে উঠলাম–হে সৃষ্টিকর্তা! এ যে ওদের দলেরই একজন! আগন্তুক খুব শান্ত, সংযত এবং ওদের মতই ভয়ঙ্কর স্থৈর্য নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সিনেমার গুণ্ডা বদমাশদের যেরকম পোশাক পরতে দেখা যায়, সেরকম একটা পোষাক ছিল তার পরনে–গাঢ় নীল রংয়ের কোমরবন্ধ আঁটা বর্ষাতি এবং ফিকে কালো রং-এর টুপিটা নামানো রয়েছে মুখ ঢেকে। অজ্ঞাত, নিষ্ঠুর ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোকটিকে দেখতে সুদর্শন। বা চিবুকের নিচে একটা কাটা দাগ। আমার নগ্নতা ঢাকবার জন্য আমি তাড়াতাড়ি হাত দিয়ে শরীর আড়াল করার চেষ্টা করলাম। তিনি হাসলেন। হঠাৎ আমার মনে হল আমি বেঁচে যেতে পারি। তিনি যখন কথা বললেন, আমার মন নেচে উঠল। তিনি ইংরেজ!
দুঃখিত! আমার গাড়ির টায়ার ফেটে গেছে (আমেরিকান হলে বলতেন ফেঁসে গেছে)। ঘর-খালি আছে বিজ্ঞাপনটা দেখলাম। আজ রাতের জন্য একটা ঘর পেতে পারি? বলে কৌতূহলপূর্ণ চোখে তিনি আমাকে দেখলেন, যেন আঁচ করতে পারছিলেন যে কোথাও একটা গণ্ডগোল রয়ে গেছে।
খুব কৌশলে কাজ হাসিল করতে হবে। আমি সহজেই আমাদের দুজনের মৃত্যু ডেকে আনতে পারি। আমি বললাম, দুঃখিত। এই হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে! ভুল করে ঘর খালির বিজ্ঞাপনটা জ্বালানো হয়েছে।
কথাটা বলতে বলতে আমি বুকে তর্জনী ঠেকিয়ে তাঁকে ভেতরে আসার ইশারা করছিলাম। তিনি কিছুটা হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন। আর একটু স্পষ্ট করে বোঝাতে হবে, আপনার টায়ারের অবস্থা কি এমনই সঙ্গীন যে লেক জর্জ অবধিও যাওয়া চলবে না।
-না পারারই সম্ভাবনা। এর মধ্যে শেষ এক মাইল এসেছি চাকতির ফ্রেমের ওপর ভর দিয়ে। আর যেতে গেলে সেটাও যাবে। অলক্ষিত ভাবে আমি মাথা ঝাঁকিয়ে তাকে ভেতরে আসতে ইঙ্গিত করলাম।
-মালিকের তরফ থেকে বীমা কোম্পানির লোকেরা ভেতরে রয়েছেন। তাদের জিজ্ঞেস করতে হবে। আপনি একটু দাঁড়ান।
আবার আমি আঙুল দিয়ে ইঙ্গিত করলাম। তারপর ঘরের ভেতরে দু-পা পিছিয়ে গেলাম দরজার ওপর ভর রেখে যাতে ওরা দুম্ করে দরজা বন্ধ করে দিতে না পারে। ওরা দুজনে পকেটে হাত পুরে পেছনেই দাঁড়িয়েছিল। আমার দিকে আলাদা ধরনের খর দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল। বর্ষাতিপরা আগন্তুক আমার ইঙ্গিত ধরতে পেরে থাকবেন। তিনি বেশ কিছু ভেতরে চলে এসেছিলেন। যখন তোক দুটিকে তিনি দেখলেন, তার মুখ ধারাল হয়ে উঠল। কিন্তু বেশ সহজ। ভঙ্গিতেই তিনি বললেন, আশা করি আপনারা সব শুনেছেন। আজ এখানে আমার রাত্রিযাপন করা সম্পর্কে আপনাদের কোন আপত্তি আছে।
– ক্রাইস্ট! আশ্রয়প্রার্থী। এটাকে কি পেয়েছে রাষ্ট্রসংঘ।
রোগা লোকটা ভনিতা না করে বলল, জায়গা হবে না বন্ধু। মহিলাটি যা বললেন তা তো শুনেছেন। এই হোটেল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে যাতে যেতে পারেন, সে জন্য চাকা বদলাতে আমরা সাহায্য করছি বরং। ইংরেজ ভদ্রলোক সহজভাবেই বললেন, পথে আবার বেরুবার পক্ষেও একটু বেশি রাত হয়ে গেছে। আমি দক্ষিণমুখ যাব। আমার মনে হয় না গ্লেন ফলসের এধারে এই সড়কের ওপর মাথা গোঁজার আর কোন জায়গা পাব। এখানে থেকে যাওয়াটাই পছন্দ করব বেশি। যাই হোক ঘর খালির বিজ্ঞাপনটা তো দেওয়া হয়েছে।
-আমি যা বললাম, তা তো শুনেছেন।
হররের গলার স্বর কঠিন। স্লাগসির দিকে ফিরে বলল, এস, এবার ফেঁসে যাওয়া টায়ারটা বদলে দিই। ওরা দু জনে দরজার দিকে এগোচ্ছিল। কিন্তু ইংরেজ ভদ্রলোক, সৃষ্টিকর্তা তাকে আশীর্বাদ করুন, অটল হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন নিজের বক্তব্যে, ব্যাপারটা এরকম দাঁড়াচ্ছে যে আলবেনীতে আমার কয়েকজন বন্ধু আছেন, তারা বেশ প্রতিপত্তিশালী ব্যক্তি। আপনারা নিশ্চয় চাইবেন না যে এই হোটেলের লাইসেন্সটা বাতিল হয়ে যাক। বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে–ঘর খালি আছে, এখানে আলোও জ্বলছে। আমি ক্লান্ত, আমি একটা ঘর দাবী করছি।
আমার দিকে ফিরে তিনি বললেন, তাতে কি আপনাকে খুব মুস্কিলে ফেলব? –আরে না। একটু না। একটা ঘর গুছিয়ে তৈরি করে দিতে আমার এক মিনিটও লাগবে না। লাইসেন্সটা বাতিল হয়ে যাবার মত কিছু মিস্টার সান্গুইনেত্তি করতে চাইবেন বলে তো মনে হয় না।
আমি সরলভাবে চোখ বড় বড় করে গুণ্ডা দুটোর দিকে তাকালাম; এখন মনে হচ্ছিল যে ওরা এক্ষুনি বুঝি পিস্তল বের করে ছুঁড়বে। কয়েক মুহূর্ত তারা ফিসফিস করে কথা বলল! এই সুযোগটা হাতছাড়া না করে আমি খুব জরুরী এবং আকুল ভাবে মাথা নেড়ে, ওই ইংরেজ ভদ্রলোককে ইশারা করলাম। তিনিও আমাকে আবার আশ্বস্ত করলেন, তার সেই হাসি দিয়ে।
