-এই তো আমার খুকুমনি। একেবারে আনকোরা রং করা। এখানে ওখানে দু এক জায়গায় হয়ত ছড়ে গেছে। তাই না, সোনামনি?
কোন জবাব দিলাম না। সে এসে তখন আমার বাহু ধরল, হেঃ হেঃ সহবৎ জান না খুকুমনি। তোমার দেখছি। উল্টোপিঠেও কিছু ধোলাই খাওয়া দরকার। তা সেটারও বন্দোবস্ত করে দেওয়া যাবে।
হাত ছুঁড়ে সে ভয়াবহ চোখা ডাটা করল।
–আমি দুঃখিত।
–ঠিক আছে, ঠিক আছে।
সে আমাকে ছেড়ে দিল।
-এখন হড়িকুঁড়ির ওখানে যাও, ভাজাভুজি বানাতে লেগে যাও! আর আমাকে বা আমার সাক্ষাৎ হররকে তাক করে কিছু ছুঁড়ো-ছুঁড়ো না। দ্যাখ তো ওর অমন সুন্দর মুখটার কি দশা করেছ।
রোগা লোকটা আগে যে টেবিলটায় বসেছিল সেখানেই বসে আছে। ওর সামনে কাস্টএইড বাক্সটা খোলা রয়েছে। ডান গালের ওপর স্টিকিং প্লাসটারের ফিতে কেটে ক্রসের আকারে লাগানো। ভয়ে, ভয়ে তার দিকে এক নজর দেখে নিয়েই কাউন্টারের ওপাশে চলে গেলাম। স্নগৃসি ওর কাছে গিয়ে বসল। তারপর দু জনে নিচু গলায় ফুসুর ফুসুর করে কি সব আলোচনা করতে লাগল। ফাঁকে ফাঁকে ওরা আমার দিকে তাকাচ্ছিল।
ডিম ভাজা ও কফি তৈরি করতে করতে ক্ষিদে পেয়েছে অনুভব করলাম। কারণটা বুঝতে পারলাম না। এই দুটি লোক ঘরে ঢুকেছে অবধি, আমি এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলাম, মনটা এমন চাপের মধ্যে থাকছিল যে, এক কাপ কফি খাবার ইচ্ছেটাও লোপ পেয়েছিল। অবশ্য বমি করে ফেলার ফলে পেটটা খালিই ছিল। কিন্তু বেশ কৌতূহলদ্দীপক এবং বলতে পারি, লাজুকের ভাবেই আমি অনুভব করলাম যে ওই নিদারুণ প্রহার যেন কোন রহস্যময় কৌশলে আমার মনে ভার লাঘব করে দিয়েছে। আমাকে ওরা মারবে, আমাকে ওরা মারবে–এই ভয় ভয় ভাবনা নিয়ে অপেক্ষা করার মানসিক যন্ত্রণাকে বহুগুণ ছাপিয়ে গিয়েছিল। আসলে মার খাবার দৈহিক যন্ত্রণা হয়ত বা আমার স্নায়ুকেন্দ্রকে ভারমুক্ত করেছিল। আমার সর্ব অবয়বের আশ্চর্য কেন্দ্রে কবোষ্ণ শক্তির অনুভূতি। ভয়টা তবু ছিল। নিশ্চয়ই আতঙ্ক। তবে এখন অনেকে অনুগ্র এবং সমর্পিতা ধরনের। একই সময়ে আমার শরীর বলল, সে ক্ষুধার্ত সে তার শক্তি ফিরে পেতে চাইছিল। বেঁচে থাকতে, বেঁচে থাকতে চাইছিল সে।
তাই আমি আমার খাবার জন্যও ভাজা, কফি এবং মাখন মাখানো গরম টোস্ট তৈরি করলাম। ওদের খাবার দিয়ে এসে কাউন্টারের পেছনে ওদের চোখের আড়ালে বসে বসে শান্তভাবে আমার খাবার খেয়ে একটা সিগারেট ধরালাম। ধরিয়েই বুঝলাম কাজটা বোকামী হয়ে গেছে। এতে আমার দিকে ওদের নজর পড়বে। তার যেটা খারাপ তা হচ্ছে। এই যে এতে প্রমাণিত হবে যে আমি মারের ধাক্কা সামলে উঠেছি এবং ফের মারধোরের চোট নেবার উপযুক্ত শারিরীক অবস্থায় এসেছি। সম্ভবত এক মিনিট পরে ওদের কণ্ঠস্বরের গুঞ্জন থেমে এল। রেডিওতে ভিয়েনার অরণ্য কাহিনী আস্তে আস্তে চলছিল, তারই মধ্যে চেয়ার সরাবার শব্দ পেলাম। এমন আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম যে কফির তলানির মধ্যে ডুবিয়ে সিগারেটের শেষটা নিভিয়ে দিলাম। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে, কল খুলে বেসিনের মধ্যে থালা রেকাবিগুলো নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। না তাকিয়েও বুঝতে পারলাম যে স্লাগসি এদিকে আসছে। সে কাছে এসে কাউন্টারে হেলান দিয়ে দাঁড়াল। অবাক হয়ে গেছি এমনভাবে তাকালাম। যে তখনও খড়কে কাঠি চিবিয়ে চলছিল। মাঝে মাঝে তার ডিম্বাকৃতি মুখের পুরু ঠোঁটের মধ্যে এপাশ ওপাশ চালাচ্ছিল কাঠিটা। তার হাতের পাতলা কাগজভর্তি একটা বাক্স কাউন্টারের ওপর রাখল। কয়েকটা পাতলা টিসু পেপার তা থেকে বের করে নিয়ে নাক ঝেড়ে কাগজটা মেঝেতে ফেলল। ভাল মানুষের মত গলায় বলল, তুমি আমাকে ঠাণ্ডা লাগিয়ে দিয়েছ খুকুমনি, বনের মধ্যে ছোটাছুটি করার জন্য। আমার তো একটা ঝামেলা, মানে এই আলোপেনিয়া অসুখটা আছেই যাতে সব চুল উঠে যায়। জান তাতে কি হয়? তাতে নাকের মধ্যেকার চুল পড়ে যায় অন্যান্য জায়গার সঙ্গে সঙ্গে। আর জান তার ফলে কি হয়? তার ফলে ঠাণ্ডা লাগলে সর্দি হাঁচিতে নাজেহাল হয়ে পড়তে হয়। হেই বিষো, তুমি মাইরি আমাকে ঠাণ্ডা লাগিয়ে দিলে। তার মানে চব্বিশ ঘণ্টায় এ-রকম এক বাক্স পাতলা কাগজ। বেশি লাগতে পারে। এটা ভেবে দেখেছ? নাকের ফুটোর মধ্যে একদম চুল নেই, এরকম লোকদের কথা ভেবে দেখেছ? হাঃ! পক্ষহীন দুই চক্ষু হঠাৎ ক্রোধে কঠিন হয়ে উঠল। তোমরা মেয়েরা। সবারই এক ধারা। খালি নিজের দিকটা দেখবে। যারা মুস্কিলে আছে তারা চুলোয় যাক! তোমরা কেবল লক্কা পায়রাগুলোর সাথে বকম বকম করবে।
রেডিওর শব্দ লহরীর মধ্যে শান্ত স্বরে বললাম, তোমার অসুবিধার জন্য আমি দুঃখিত। আমার অসুবিধার জন্য তুমিও কেন দুঃখিত হচ্ছ না। বেশ জোর দিয়ে তাড়াতাড়ি কথাটা ছুঁড়ে দিলাম। তোমরা দুজনে কেন এখানে এসে আমাকে নিয়ে পড়েছ? আমি তোমাদের কি করেছি। আমাকে ছেড়ে দিচ্ছ না কেন? যদি ছেড়ে দাও, তবে আমি প্রতিজ্ঞা করছি যে কাউকে কিছু বলব না। আমার সামান্য কিছু পয়সা আছে। তা থেকে কিছু তবে তোমাদের দিতে পারি। ধরো দু শ ডলার। এর চেয়ে বেশি দেওয়া সম্ভব নয় আমার পক্ষে। বাকি পুজির ওপর ভরসা করেই আমাকে ফ্লোরিডা অবধি সমস্তটা পথ পাড়ি দিতে হবে। আমাকে ছেড়ে দেবার মত দয়াটুকুও কি আশা করতে পারি না?
