হরর নামে লোকটি দু হাত ঝুলিয়ে অলস ঢিলেঢালা ভাবে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল। সে তার ঔৎসুক্যহীন চোখে আমাকে লক্ষ্য করছিল। ডান হাত তুলে আঙুল দিয়ে আমাকে কাছে আসতে ইঙ্গিত করল। আমার ক্ষতবিক্ষত পা জোড়া আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওর কাছে। ওর কাছে যেতে যখন কয়েক পা বাকি তখন যেন আমি অর্ধচেতন। আচ্ছন্ন অবস্থা কাটিয়ে উঠলাম। হঠাৎ মনে পড়ল ও বাস্তবিকই ছুঁয়ে দেখলাম যে বরফ তোলার চিমটেটা অ্যাপ্রনের তলায় আমার প্যান্টের কোমরের পটির মধ্যে গোঁজা রয়েছে। হাতলটা ধরে ওটাকে বের করে আনা খুব শক্ত হবে। আমি ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওর দিকে চোখ রেখে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম ওর ডান হাত সাপের মত উঠে এল। আমার গালে ডানে বায়ে চড় পড়তে লাগল চটচট করে। আমার চোখ পানিতে ভরে উঠেছিল। আমার মনে পড়ে গেল। আর একটা চড় থেকে আত্মরক্ষা করেছি এরকম ভান করে ঝুঁকে পড়লাম। এই ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিয়ে ডান হাতটা কোমরের পটির মধ্যে হাত দিয়ে জিনিসটা বের করে নিয়ে মাথা উঠিয়ে ওর ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। ওর মাথা লক্ষ্য করে বেধড়ক মারতে লাগলাম। জিনিসটা লাগছিল ওর গায়ে, তবে তা কেবল কান্নি মেরে বেরিয়ে যাচ্ছিল। হঠাৎ পেছন থেকে কে যেন আমার হাত ধরে পিছমোড়া করে চেপে রাখল।
লোকটার ফ্যাকাশে ধূসর মুখে রক্তের ধারা নেমে আসছিল গালের ওপরে একটা ক্ষত থেকে। আমি দেখছিলাম রক্তের ধারা চিবুকের কাছে গড়িয়ে নেমে এল। ওর মুখের অভিব্যক্তি চাঞ্চল্যহীন। সেখানে যন্ত্রণার কোন চিহ্ন ছিল না; কেবল উদ্দেশ্য সাধনের ভয়াল দৃঢ়তা। চোখের কালো মনির পাশে কেবল একটা লাল ছিটে। রোগা লোকটা পায়ে পায়ে আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার হাতের মুঠো খুলে চিমটেটা শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল। অবচেতন মনে যেন এর অনুষঙ্গ প্রতিক্রিয়া দেখা দিল। শিশুরা যেমন অস্ত্র ফেলে দেয়, আমি ফেলে দিলাম! আত্মসমর্পণ করলাম। যুদ্ধবিরতি!
এবার সে আস্তে আস্তে প্রায় সোহাগ করার কায়দায়, সূক্ষ্ম কেরামতি দেখিয়ে শরীরের জায়গা বেছে বেছে কখনো হাতের তালু দিয়ে, কখনো ঘুসি ছুঁড়ে আমাকে মেরে চলল। প্রথম দিকে আমি শরীর মুচড়ে, নিচু হয়ে ঝুঁকে লাথি ছুঁড়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করছিলাম। তারপর আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠলাম। ওই ফ্যাকাশে ধূসর শোনিত রেখায় চিহ্নিত মুখের কোটরাগত দুই চক্ষু আমাকে পর্যবেক্ষণ করছিল আর সমান তালে হাত চালিয়ে যাচ্ছিল।
আমার ঘরে ধারা গোসলের টবে আমি এখন শোয়া। টালি পাতা মেঝের ওপর বিবস্ত্র অবস্থায় শুয়ে রয়েছি। আমার সুন্দর পোষাকটার ছিন্ন বিচ্ছিন্ন অপরিচ্ছন্ন অবশিষ্ট অংশ আমার পাশেই রয়েছে। একটা খড়কে কাঠি চর্বনরত স্লাগসি দেয়ালে হেলান দিয়ে, ঠাণ্ডা পানির কলের ট্যাপ ধরে আছে। তার চেরা চোখ ঝিকমিক করছিল। সে কল বন্ধ করে দিল। আমি কোন রকমে হাঁটুর ওপর ভর দিয়ে উঠলাম। বুঝতে পারছিলাম বমি পাচ্ছে। তার আর পরোয়া করি না। আমি একটা পোষা রোরুদ্যমান প্রাণীতে রূপান্তরিত হয়েছিলাম। বমি করে ফেললাম।
স্লাগসি হাসল। ঝুঁকে পড়ে আমার পেছনে চাপড় দিতে লাগল, চালিয়ে যাও খুকুমনি। ধোলাই খাবার পরে সবাই ই বমি করে। নিজেকে সাফসুৎরো করে, চমৎকার একটা নয়া পোশাক পরে বেরিয়ে এস দিকিনি। তোমার পালানোর জন্য ওই ডিমভাজাটা একেবারে খাজা হয়ে গেছে। আর কায়দা করতে যেও না! অবিশ্যি মালুম হচ্ছে, তোমার আর কিছু করার ক্ষমতাও নেই। ঘরটা আমি পেছনের দরজা থেকে নজরে রাখব! নাও জামা কাপড় পরে নাও। রক্ত-টক্ত কিছু বেরায়নি। মাত্র কয়েকটা আঁচড়। মেয়েদের ব্যাপারে হরর খুব মোলায়েম। খুব বরাতজোর তোমার। ও তো আমার হিপি। যদি ও সত্যি সত্যি ক্ষেপে উঠত, তবে এতক্ষণে তোমার জন্য আমরা কবর খুড়তাম। সৃষ্টিকর্তার দয়া দেখ। আচ্ছা, পরে দেখা হবে।
ঘরের দরজা বন্ধ করার শব্দ পেলাম। এখন আমার শরীরের ক্ষমতা ফিরে পাওয়া, মোটামুটিভাবে নিজেকে গুছিয়ে নিতে আধঘণ্টা লাগল। বারে বারে ইচ্ছে করছিল যে কাঁদতে কাঁদতে বিছানায় লুটিয়ে পড়ি। ওরা আসুক। গুলি করে শেষ করে দিক এই প্রাণটা। কিন্তু বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা ফিরে এল আমার মধ্যে, অতি পরিচিত ভঙ্গিতে চুল আঁচড়াচ্ছিলাম। জীর্ণ, শক্তিহীন, ব্যথাভরা শরীর ঠিক ঠাক করছিলাম যদিও ভেতরে ছিল গভীরতর যন্ত্রণার অনুভূতি। আস্তে আস্তে আমার মনে একটা সম্ভাবনার কথা উদয় হল, হয়ত সবচেয়ে খারাপ অংশটা পার হয়ে এসেছি। তাই যদি না হয়, এই লোক দুটি আমাকে এখানে রাখতে চায়, নজরের মধ্যে রাখতে চায়। স্নগুসি তো গুলি দিয়ে লক্ষ্যভেদ করতে সিদ্ধহস্ত। যখন দৌড়ে পালাচ্ছিলাম তখন সে ঠিকই আমাকে মারতে পারত। ওর নিক্ষিপ্ত গুলি আমার খুব কাছে এসে পড়েছিল; সেটা কি ভয় দেখিয়ে আমাকে থামাবার জন্য নয়?
আমি আমার সাদা পোশাক পরে নিলাম। সৃষ্টিকর্তা জানেন, এই পোশাকটা খুব নৈর্ব্যক্তিক। একটা পকেটে টাকা পয়সা নিয়ে নিলাম যদি তেমন সুযোগ আসে। তেমন কিসের সুযোগ আর পালানো চলবে না। বেড়ালছানার মত ক্লান্ত অশক্ত শরীরটা টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলাম বসবার ঘরে।
এগারোটা বেজেছিল। তখনও বর্ষণ বিরতি চলছিল। এয়োদশীর চাঁদ মেঘের মধ্যে দ্রুত সাঁতার কেটে যাচ্ছিল; অরণ্যভূমি থেকে থেকে রূপালি আলোয় ভরে উঠেছিল। হলুদ রং এর দরজার ফ্রেমের মাঝখানে স্লাগসি নিশ্চলভাবে দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই খড়কে কাঠি চর্বণরত। আমি আসতেই পথ ছেড়ে দিল।
