শুনতে পেলাম ওদের একজন আমার সন্ধানে এগিয়ে আসছে। আস্তে আস্তে না, কারণ সেটা সম্ভব ছিল না, তবে অবিচলিত গতিতে, মাঝে মাঝে কান পেতে শুনছিল। সন্ধানকারী যেই হোক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই কোন শব্দ না পেয়ে বুঝতে পেরেছে যে আমি মাটিতে রয়েছি। যদি অরণ্য পথে চলার অভ্যাস থেকে থাকে তবে সে শীগগিরই ভাঙা ডালপালা আর মাটিতে ঘটানোর চিহ্ন দেখে বের করতে পারবে আমার নিশানা। তারপর শুধু সময়ের প্রশ্ন। আমি ধীরে ধীরে বেড় দিয়ে ঘুরে গাছের পেছনে চলে গেলাম ওর সঙ্গে দুরত্ব বাড়াতে। দেখতে পেলাম গাড়ির সন্ধানী আলো আমার মাথার ওপরে গাছের ডালপালা উদ্ভাসিত করে তুলেছে।
আগন্তুকের পায়ের শব্দ ক্রমেই কাছে আসছিল। ভারি নিশ্বাসের শব্দ পেলাম। স্লাগসির গলা খুব কাছে, খুব ধীরে ধীরে বলছিল, বেরিয়ে এস খুকুমনি। নইলে বাপজান খুব চড়চাপড় খাবে। লুকোচুরি খেলাটা এখন খতম। এখন বাপজানের কাছে খুকুমনির বাড়ি ফেরার সময়।
ফ্ল্যাশলাইটের ছোট আলোর বৃত্ত এখন গাছের তলায় তল্লাসি করছে। একটার পর একটা গাছ ধরে ধরে। সে জানত আমি মাত্র কয়েক হাত দূরে আছি। তারপর আলোর বৃত্তটা আমার গাছটার তলায় এসে দাঁড়াল। স্লাগসি হৃষ্টচিত্তে আস্তে আস্তে বলল, হেই খুকু, বাবা দেখে ফেলেছে!
সত্যিই কি দেখে ফেলেছে। আমি নিঃসাড়ে শুয়েছিলাম। নিশ্বাস পর্যন্ত টানছিলাম না ভাল করে।
দুম করে একটা গুলি এল অগ্নিবিন্দুর মত। আমার মাথার পেছনে গাছের কাণ্ডে বুলেটটা বিধে গেল। ওটা তোমাকে তাড়া দেবার জন্য খুকুমনি। পরের বার, এটা তোমার খুলিতে বিধবে।
তবে দেখতেই পেয়েছে! ভয়ার্ত স্বরে বললাম, ঠিক আছে, আসছি। গুলি ছুঁড়ো না যেন! চার হাত পায়ে ভর দিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। প্রায় অপ্রকৃতিস্থ ভাবে ভাবলাম, নিজের প্রাণদণ্ডের জন্য এগিয়ে যাবার মক্কার ধরন এটা, ভিড়।
লোকটা ওখানে দাঁড়িয়ে ছিল। ওর ফ্যাকাশে টাকের ওপর হলুদ আলো ও কালো ছায়া এসে পড়েছে। ওর হাতের পিস্তর আমার পেটের দিকে তাক করা ছিল। সে পাশের দিকে পিস্তলটা দিয়ে ইঙ্গিত করে বলল, ঠিক আছে আমার আগে আগে চল। আর যদি না যাও তবে তোমার নরম পিঠে মাংস ছিদ্র করে ঢুকে যাবে এটা।
মাথা নুইয়ে গাছের ভেতর দিয়ে দূরের গাড়িটার চোখ ধাঁধানো আলোর দিকে তাকালাম। হতাশায় আকণ্ঠ ভরে উঠেছিল, আত্মশোচনায় ব্যথিত হয়ে উঠেছিল মন। কি করেছি যার জন্য এসব সইতে হবে আমাকে? এই দু জন অচেনা লোকের করাল গ্রাসে ফেলবার জন্য কেন আমাকে সৃষ্টিকর্তা বেছে নিলেন? এবার তো ওরা সত্যি সত্যি ক্ষেপে যাবে। ওরা আমাকে মারধোর করবে আর শেষে নির্ঘাৎ খুন করবে। আমার দেহ থেকে পুলিশ বুলেট গুলি বের করতে পারে! কোন অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকায় আমার মৃতদেহের সাক্ষ্য ওরা উপেক্ষা করবে কি করে? তা সে যে কোন অপরাধই হোক না কেন তারা স্থির নিশ্চিন্ত হবে যাতে কোন সাক্ষ্য না থেকে যায়। আমি তো আর থাকব না। ওরা আমাকে পুঁতে ফেলতে পারে, আমার মৃতদেহের গলায় পাথর বেঁধে হ্রদের পানিতে ডুবিয়ে দিতে পারে।
বৃক্ষরাজির ধার ঘেঁষে ঘেঁষে বেরিয়ে এলাম। রোগা লোকটা গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্লাগসিকে ডেকে সে বলল, ঘরে নিয়ে যা। কোন ঝামেলা নয়। ওকে আমি পাহারা দেব। বলে গাড়িটার মুখ ঘুরিয়ে নিল।
স্লাগসি আমার পাশে এসে আমার শরীর কামুকের মত হাত দিয়ে চটকাতে লাগল। আমি শুধু বললাম, হে সৃটিকর্তা! প্রতিরোধ করার ইচ্ছে যেন বিদায় নিয়েছিল। সে বেশ আস্তে আস্তে বলল, বহুৎ বিপদে পড়ে গেছ, সখী। হরর খুব বদমিজ আছে। তোমাকে জোর ধোলাই দেবে। আজকের রাতটার জন্য আমাকে বোল রাজি আছ কিনা। আমার সঙ্গে মিষ্টি করে কথা বল। আমি ওকে ঠাণ্ডা করে দেব। কি রাজি আছে?
আমি সংগ্রামের শেষ বিন্দু ইচ্ছা সঞ্চয় করে বললাম, তুমি যদি আমার গায়ে হাত দাও তবে তার আগে আমি বরং মরতেও রাজি।
–বহুৎ আচ্ছা, তাহলে দিতে রাজি নও। বেশ, আমাকেই আদায় করে নিতে হবে তবে। মনে হচ্ছে আজকের রাতটা খুব বদখৎ বানিয়ে নিলে, বুঝেছ? বলে এমন ভীষণ জোরে সে চিমটি কাটল যে আমি চেঁচিয়ে উঠলাম। হৃষ্টচিত্তে স্লাগসি হাসল। ওই ঠিক হয়েছে। গান গাও খুকুমনি যতটা পার রেয়াজ করে নাও। সে আমাকে ধাক্কা দিয়ে পেছনের খোলা দরজাটা দিয়ে বসবার ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে দরজা বন্ধ করে আটকে দিল লক করে। ঘরটা অবিকল আগের মতই দেখাচ্ছিল–আলো জ্বলছে, রেডিওতে ফুর্তিভরা একটা নাচের বাজনা বাজছে।
প্রত্যেকটা জিনিস ঝকঝকে পালিশ করা, আলোর মধ্যে তাদের ঝলমলানি এখন যেন চোখ টিপে চলেছে। মনে পড়ল, কয়েক ঘণ্টা মাত্র আগে এই ঘরে আমি কত সুখেই না ছিলাম। মনে পড়ল আরাম কেদারায় শুয়ে শুয়ে কত
মধুর, কত বিষণ্ণ স্মৃতির রোমন্থন করছিলাম। আমার সেই ছেলেমানুষী ঝামেলাগুলো কত তুচ্ছ! যখন আমার জীবনের একদিকে অন্ধকার থেকে এই দু জন লোক এগিয়ে আসছে তখন ভগ্ন হৃদয় ও হৃত যৌবনের কথা বলা কত হাস্যকর, উইন্ডসর-এ সেই সিনেমা? একটা নাটকে, বলা ভাল প্রহসন, সে তো ছোট্ট একটা অঙ্কনমাত্র। জুরিখ, সে ছিল যেন স্বর্গ। পৃথিবীর আদিম অরণ্য, তা থেকে বেরিয়ে আসা দুই দানব এমন কুচিৎ দেখা দেয় পথচারী কোন লোক বা মেয়ের জীবনে। কিন্তু এরা সর্বত্র হাজির রয়েছে। পা ফেলতে ভুল কর, নিয়তির খেলায় ভুল তাস চাল-তবেই এদের কবলে পড়ে যাবে, তুমি তখন হারিয়ে যাবে হারিয়ে যাবে এমন এক জগতে যা তোমার অকল্পনীয়, যার বিরুদ্ধে দাঁড়াবার জন্য নেই তোমার কোন দিগদর্শন যন্ত্রও, যা পথের ইঙ্গিত দেবে।
