দরজা পেরিয়ে কয়েক হাত যেতে না যেতে বৃষ্টিতে একদম জবজবে ভিজে যাব, বাকি রাতটা ঠাণ্ডায় জমে যাবে। পায়ে স্যান্ডেল থাকায়, পায়ে অনেক আঁচড় পড়বে। কাজেই সুযোগটা নিলে লাভের চেয়ে। ক্ষতি হবে বেশি। তবে এই সমস্যাগুলিকে বাগে আনতে হবে। প্রধান কাজ হল এই লোকগুলির কবল থেকে উদ্ধার পাওয়া। অন্য আর কিছুতেই এসে যায় না।
ডিমের এলোমেলো ভাজা তৈরি হয়ে গিয়েছিল। বেশ নরম থাকতে থাকতেই একটা রেকাবিতে সেগুলি স্কুপ করে তুলে নিলাম; ধারে ধারে মাংসের বেকন সাজিয়ে দিলাম গোল করে। আরেকটা রেকাবিতে টোস্টমাস্টার থেকে টোস্টগুলি নিয়ে সাজালাম, পাশে কাগজের মোড়ক শুধু এক টাই মাখন। তারপর একটা ট্রেতে রেকাবি দুটো তুলে সাজালাম। কফির ওপর ফুট বা পানি ঢালার সময়, মেঝের সেই ধুলোর কথা উড়তে দেখে বেশি খুশি হলাম; আসা করলাম ওদের গলায় গিয়ে এই ধুলো আটকাবে। তারপর, অ্যাপ্রন পরা অবস্থায় সম্ভ্রান্ত হয়ে ট্রেটা হাতে নিয়ে বারের পেছন থেকে বেরিয়ে রোগা লোকটা যেখানে বসে আছে সেখানে নিয়ে গেলাম।
ট্রেটা নামিয়ে রাখতেই, শুনতে পেলাম পেছনদিকের বাইরের দরজাটা খুলল, তারপর দুম করে বন্ধ হল। লক করার। ক্লিন আওয়াজ পেলাম না। চারদিকে তাড়াতাড়ি ঘুরে তাকালাম। গৃসির হাত দুটো খালি। আমার হৃৎস্পন্দন দুর্দান্ত জোরে হতে লাগল। স্নাসির টেবিলের কাছে এল। আমি ট্রে থেকে রেকাবি টেকাবিগুলি নামিয়ে রাখছিলাম। ঝুঁকে পড়ে আহার্যগুলি সে দেখল তারপর ছিটকে আমার পেছনে এসে, দু হাত দিয়ে আমার কোমর জড়িয়ে ধরে আমার। ঘাড়ে ওর বীভৎস মুখটা চেপে চেপে ধরতে লাগল, ঠিক মা যেমন করে বানায়, তেমনি হয়েছে খুকু। তুমি আমি দুজনে মিলে এবার ঘর বাধলে কেমন হয়? যেরকম রান্না করেছ এরকম যদি রাঁধতে পার, তবে তুমিই আমার স্বপ্নের। রাণী। কিছু বলছ না কেন? এটা কি একটা কথা হল না?
আমার হাতে কফির পট ধরা ছিল। ওর ভেতরের গরম তরল পদার্থটা স্লাগসির কাঁধের ওপর ঢেলে দেবার চেষ্টা। করছিলাম, হরর আমার মতলব আঁচ করে থাকবে। সে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, ওকে ছেড়ে দাও। স্নগৃসিআমি তো বলছি পরে হবে।
কথাগুলি কষাঘাতের মত বেরিয়ে এল। স্লাগসি তক্ষুনি আমাকে ছেড়ে দিল। রোগা লোকটা বলল, তুমি তো চোখ দুটো করমচার মত লাল করেছ। খালি এই মেয়েটার দিকে নজর। বুন্ধুর মত ঘুরছ। বসে পড়। আমরা একটা কাজে এসেছি।
স্লাগসির মুখে ভয়লেশহীন ভাব থাকলেও বাধ্যতার ছাপও ছিল সেখানে, একটু দিল দিয়ে ভেবে দ্যাখো, গুরু! এই জওয়ানীর এক চাকলা আমার চাই, আর এখনই!
তবে, সে চেয়ার টেনে বসল এবং আমি চটপট সরে গেলাম।
বড় রেডিও-টেলিভিশনটা পেছনের দরজার কাছে একটা উঁচু বেদীর ওপর ছিল। এতক্ষণ আস্তে আস্তে চলছিল যন্ত্রটা। আমি আদৌ বুঝতে পারিনি। যন্ত্রটার কাছে গিয়ে, চাকতি ঘরিয়ে তার স্বরগ্রাম খুব উঁচু পর্দায় তুলে দিলাম। লোক দুটো নিচু গলায় নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। কাঁটা চামচের শব্দ হচ্ছিল। এখনই; নইলে আর হবে না।
দরজার হাতল থেকে আমার দূরত্ব মনে মনে মেপে দেখলাম। তারপর বাঁ দিকে ঝাঁপ দিলাম।
.
আর্তনাদ
দরজার কাঠের ফ্রেম বিদীর্ণ করে একটা বুলেট ঢুকে যেতে শুনলাম। আমি হাত দিয়ে বরফ তোলার চিমটেটা ঠিক করে রাখতে গেলাম। যাতে গায়ে ওটা না বসে যায়। ভিজে ঘাসের ওপর দিয়ে আমি প্রাণপনে আশ্রয়ের জন্য। ছুটছিলাম। অশেষ অনুগ্রহ বৃষ্টিটা ধরে গিয়েছিল, কিন্তু ঘাস তখনও শুকোয়নি। আমার জুতোর তলার সমতলদেশ তাই পিছলে পিছলে যাচ্ছিল। বুঝতে পারছিলাম যথেষ্ঠ জোরে ছুটছি না। পেছনের দিকে সশব্দে দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম। স্লাগসি চেঁচিয়ে বলেছিল, থাম নইলে ঠাণ্ডা লাশ ফেলে দেব! আমি ছুটতে লাগলাম। তখনই মাপা মাপা দূরত্বে গুলি এসে পড়তে লাগল। বুলেটগুলি আমার পাশ কাটিয়ে ঘাসের মধ্যে পড়তে লাগল। আর দশ গজ যেতে পারলেই আমি আলোকিত দিকটা থেকে কেবিনের কোনায় অন্ধকারে আত্মগোপন করতে পারব। মাথা নিচু করে, একেবেঁকে ছুটতে ছুটতে চলছিলাম, যে কোন মুহূর্তে বুলেট এসে বিধবার আশঙ্কায় আমার গা শিউরে শিউরে উঠেছিল। কেবিনের একটা কাঁচের জানলা বুলেট লেগে ঝনঝন করে ভেঙে পড়ল। আমি ততক্ষণে কোনটায় গিয়ে পড়েছি। ভিজে গাছগুলির মধ্যে যেতে যেতে, একটা মোটর গাড়ির ইঞ্জিনের গর্জন শুনলাম, ওটা কি জন্য?
কি ভয়ঙ্কর এইভাবে এগোনো। বৃষ্টিসিক্ত পাইনের সারি গা ঘেঁষাঘেষি করে দাঁড়িয়ে ছিল। একের শাখা প্রশাখার মধ্যে অন্যের ডালপালা জড়াজড়ি করেছিল, মুখের ওপর হাত দুটো দিয়ে আড়াল করেছিলাম বলে, সেই হাত দুটো ওই ডালপাতার খোঁচায় আঁচড়ে যাচ্ছিল। ঘুরঘুট্টে আলকাত্রার মত অন্ধকার; দু হাত দূরের জিনিস দেখা যাচ্ছিল না। হঠাৎ বুঝতে পারলাম গাড়ির উজ্জ্বল দুই হেডলাইটের আলো গাছের ধার থেকে আমাকেই খুঁজছে, বুঝে কান্না পেয়ে গেল। আলোটা এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করতেই শুনতে পেলাম আবার গাড়ি চালু করার শব্দ, আমাকে লক্ষ্য করে আলো ফেলার জন্য এবং তৎক্ষণাৎ ওরা আমার জায়গাটা পেয়ে গেল। পাশ কাটাবার মত কোন জায়গাই ছিল না। গাছের শ্রেণীর ভেতর দিয়ে যেমন যেমন পথ পাওয়া যাচ্ছিল, তা ধরেই এগোতে হচ্ছিল। আবার কখন গুলিবর্ষণ শুরু হবে? বনের মধ্যে আমি মাত্র ষাট হাত গিয়েছি। এখন যে কোন মুহূর্তে। হাঁ করে গিলে গিলে নিশ্বাস নিচ্ছিছিলাম। আমার। জামাপ্যান্ট ছিঁড়তে শুরু করেছিল। পা চিড়ে গিয়ে রক্তাক্ত হয়ে উঠছিল। বুঝলাম আর বেশিক্ষণ এভাবে এগোনো যাবে না। আমাকে একটা ঘন পত্ৰত গাছ বেছে নিয়ে গুঁড়ি মেরে তার তলায় গিয়ে সন্ধানী আলোর চোখকে এড়িয়ে লুকিয়ে থাকতে হবে। কিন্তু গুলিবর্ষণ হচ্ছে না কেন? ডানদিক দিয়ে যেতে একটা হোঁচট খেলাম। অন্ধকারাচ্ছন্ন ছোট্ট একটা জায়গা দেখলাম। হাঁটু মুড়ে ভিজে পাইন গাছের পাতার নিচে লুকোলাম। এর মত আরেকটা আভূমি নত ঝকড়া গাছ ছিল। আমি হামাগুড়ি দিয়ে তার তলায় গিয়ে গাছটার গায়ে ঠেস দিয়ে বসে হাঁফ ধরা নিশ্বাস প্রশ্বাস স্বাভাবিক করে নিতে চাইলাম।
