-এখন ওসব নয়, স্নগৃসি। পরে হবে। আগে চল কেবিন-টেবিন দেখে নিই। ততক্ষণে ও হুঁড়ি আমাদের জন্য কিছু রান্না বান্না করে ফেলুক। ডিমের কি খাবি বল?
স্লাগসি নামের লোকটি আমার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল, ডিমের এলোঝেলো ভাজা বানাবে খুকু, বেশ নরম-নরম ধোয়া হবে, বুঝলে? মা যেমন বানায়। ঠিকঠাক না হলে বাবা কিন্তু চড় লাগাব কষে!
বলে সে মুষ্টিযোদ্ধাদের মত পা ফেলে আমার দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি দরজার দিকে পেছোতে লাগলাম। যতটা ভয় পেয়েছিলাম তার চেয়ে বেশি ভয় পাবার ভান করলাম এবং নাগালের মধ্যে আসতেই ওর মুখে সর্বশক্তি দিয়ে কষে এক চড় লাগালাম। বিস্ময়ের ঘোর কাটিয়ে ওঠার আগেই ধারে সরে গিয়ে একটা টেবিলের পেছনে দাঁড়িয়ে একটা লোহার চেয়ার তুলে তার পায়াগুলি ওর দিকে তাক করে ধরলাম।
রোগা লোকটা অল্প হেসে উঠল।
-কেমন স্লাগসি, বলিনি! বলিনি, পরে হবে ওসব। বুষ্টুমি ছোড় ইয়ার। গোটা রাতটা পড়ে আছে ওর জন্য। যেমন যেমন বলছি তেমন তেমন কাজ করে যাও, দোস্ত।
ফ্যাকাশে গোল-গোল মুখে চোখ দুটো উত্তেজনায় লাল হয়ে উঠেছিল। লোকটা একবার গাল ঘসে নিল হাত দিয়ে। ভেজা ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে হাসির রেখা দেখা দিল, জান কি খুকুমনি, তুমি কেবল তোমার জন্য রাতভর চমৎকার সময় তৈরি করে নিলে। বেশ অনেকক্ষণ ধরে, অনেক অনেকবার ঘুরে ফিরে। বুঝেছ? উঁধোনো চেয়ারের পেছন থেকে দু জনকেই দেখলাম। ভেতরে ভেতরে আমার কান্না বার হচ্ছিল। এ দু জন যেন দুঃস্বপ্ননের দেশ থেকে আগন্তুক। কোন রকম গলার স্বরটা অবিকৃত রেখে বললাম, তোমরা কে? এ সবের মানে কি? তোমাদের পরিচয় পত্র দেখাও। পরে একটা গাড়ি আসছে শুনলেই, জানালা ভেঙে সাহায্য চাইব। এখন আমার কোন ক্ষতি করলেই, কাল তোমরা মজা টের পাবে।
স্লাগসি হেসে উঠ, কালকের কথা কাল। আজ তুমি এত ঘাবড়াচ্ছ কেন খুকুমনি? হরর আমার দিকে তাকাল। তার মুখের অভিব্যক্তি শীতল, ঔৎসুক্যহীন।
-স্লাগ্সিকে মারাটা আপনার উচিত হয়নি। ও বড় শক্ত লোক। মেয়েরা ওকে অপছন্দ করুক, এটা ও অপছন্দ করে। ওর মুখের চেহারার জন্য এটা হতে পারে, সানুকেটিন-এ কিছুদিন একা কাটানোর জন্য ওটা হতে পারে। নার্ভের অসুখ। স্লাগৃসি, ডাক্তারবাবুরা যেন ওটাকে কি বলেছেন।
স্লাগসিকে বেশ গর্বিত দেখাল। সে খুব সযত্নে ল্যাটিন শব্দগুলি উচ্চারণ করল, আলোপসিয়া টোটালীস। যার মানে নির্লোম বুঝলে। একগাছি চুলও না। সে ইঙ্গিতে তার সব অবয়ব দেখাল।
-এখানে না, এখানে না বাবা, ওখানে না। তুমি এর কতটুকু জান লেড়কী?
হরর আবার শুরু করল, তাই স্লাগসি সহজেই ক্ষেপে যায়। মনে করে সমাজ থেকেও সুবিচার পাচ্ছে না। তোমার সম্বন্ধে তাই ধারণা। হয়ত তুমিই তাই করেছ। তাই ট্রয়ে ওকে আমরা বলি মাস্তান। লোকেরা অন্য লোককে কিছু শিক্ষা দিতে হলে ওকে ভাড়া করে। ও মিস্টার সান্গুইনেত্তি ভেবেছিলেন যে, আমরা দুজনে এখানে এসে ট্রাক ওয়ালা না আসা পর্যন্ত সব কিছুর ওপর নজর রাখব। মিস্টার সাল্গুইনেত্তি চান না যে, তোমার মত একটা বাচ্চা মেয়ে সারারাত এখানে একা থাকুক। তাই সঙ্গে থাকার জন্য আমাদের পাঠিয়ে দিলেন। তাই না স্লাগসি?
–সাচ্চা বাৎ। আলবৎ তাই। বলে সে চাপা হাসি হাসল। শুধু তোমাকে সঙ্গ দেবার জন্য বিম্বো নেকড়েগুলোকে খেদিয়ে দেবার জন্য। সেই সঙ্গে শরীরের মাপ টাপ ঠিক রাখার জন্য। নিশ্চয় এমন সময় আসে যখন তোমার পাহারা দরকার হয় খুব। ঠিক না?
টেবিলের ওপর হাত ধরা চেয়ারটা নিচু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তোমাদের নাম কি? পরিচয় পত্রের কি হল? বার কাউন্টারের ওপারের তাকে শুধু একটিন ভর্তি ম্যাক্সওয়েস হাউস কোম্পানির কফি ছিল। স্নাগুসি হঠাৎ নড়ে উঠল এবং যদিও কোন পিস্তল বের করতে দেখলাম না, তবু ওর ডান হাত থেকে আগুনের শিখা বেরিয়ে এল। পিস্তল ছোঁড়ার শব্দ হল। টিনটা লাফিয়ে উঠে পড়ে গেল। শূন্যে থাকতে থাকতেই আবার টিনটার গায়ে গুলি করল স্লাগসি। কফির বাদামী বঁড়োর বিস্ফোরণে ঘর ভরে গেল। তারপর অসহ্য নীরবতা নেবে এর ঘরে, মেঝেতে খালি কৌটোটা গড়াতে গড়াতে গেল। স্লাগসি আমার দিকে তাকাল, হাতে পিস্তল ছিল না। তার চোখ লক্ষ্যভেদের কৃতিত্বে আচ্ছন্ন। নরম গলায় সে বলল, পরিচয় পত্তর হিসাবে এটা কেমন খুকুমনি? নীল ধোয়ার পাতলা মেঘটা আমার কাছে ভেসে। এল। তাতে ধোয়াহীন যে বিস্ফোরক আছে, তার গন্ধ পেলাম। আমার পা কাঁপছিল। ঘৃণার স্বরে আমি বললাম, তাতে অনেক কফি নষ্ট হল। এখন তোমাদের নাম কি?
রোগা লোকটা বলল, ইনি ঠিক বলেছেন। ওই কৌটাটা নষ্ট করা তোমার উচিৎ হয়নি, স্লাগসি! তবু দেখুন, ওই জন্যই সবাই ওকে স্লাগসি বলে ডাকে। কারণ লোহার অন্ত্রের ব্যাপারে ও খুবই তুখোড়। স্নগুসি মোরন্ট। আমি, আমি হলাম হরউহজ্ব। ওরা আমাকে ডাকে হরর বলে। কেন জানি না। স্লাগসি তুমি বলতে পার?
স্লাগসি চাপাস্বরে হাসল, হরর-মানে ভয়। হয়ত কখনো তুমি কাউকে বেজায় ভয় দেখিয়েছিলে। হতে পারে একদল লোককে। তাইত সবাই আমাকে বলল।
হরর কোন মন্তব্য করল না। সে শান্তভাবে বলল, ঠিক আছে। চল যাই। স্লাগসি যেমন বলেছি কেবিন টেবিনগুলো দেখে নাও। আর আপনি ঘাবড়াবেন না। আমাদের কিছু খাবার বানিয়ে দিন। সাহায্য করুন। গায়ে আঁচড়টি লাগবে না। ঠিক আছে।
