আর এখন দা ড্রিমি পাইনসে আজই আমার শেষ রজনী, আগামীকাল থেকে আমি আবার মুক্ত। জীবনের একটা অংশ এখানে পেলাম যা ফ্যান্সীরা থাকা সত্ত্বেও পুরোপুরি অপ্রীতিকর নয়, বরং এখানে একটা কাজের প্রাথমিক দিকটা আমি শিখতে পেরেছি যা থেকে পরে ভালই হবে। ঘড়ি দেখলাম। নটা বাজল, আলবেনীর জয়াকো বেতার কেন্দ্রের নিয়তি নির্দেশ শুরু হল। অ্যাডিরোনডালের আবহাওয়া আজ মধ্যরাত্রের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
কাজেই কপাল যাই হোক সকালবেলা রাস্তাটা শুকনোই পাচ্ছি। কাফটেরিয়া বারের পেছনে গিয়ে বৈদ্যুতিক উনুনটা জ্বালালাম তারপর তিনটে ডিম এবং ছ-টুকরো মাংস নিয়ে তাতে চড়িয়ে দিলাম, ক্ষিদেয় পেট জ্বলছিল। আর ঠিক তখনই দরজার ওপর তুমুল করাঘাত শোনা গেল।
.
ভয়ঙ্কর দুঃস্বপ্ন
আমার আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার দাখিল। কার আসার সম্ভাবনা? তখন মনে পড়ল। বাজ পড়ার সময় ঘরখালি আছে লেখা নিওন-বিজ্ঞাপনের সুইচটা জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। পরে আর সেটা নেভাতে ভুলে গেছি। কি আহাম্মকী! আবার দরজা ধাক্কানো শুরু হল। যাকগে, আমাকে ব্যাপারটা সামলাতে হবে, ক্ষমা চাইতে হবে, আগন্তুকদের লেক জর্জে ফেরত পাঠাতে হবে। এস্ত পায়ে দরজার কাছে গিয়ে চাবি ঘুরিয়ে দরজা খুলে চেন দিয়ে দরজাটা সামান্য ফাঁক করা। অবস্থায় আটকে রাখলাম।
কোন গাড়িবারান্দা ছিল না। নিওন আলোর বিজ্ঞাপনটা একটা লাল দ্যুতি ছড়িয়ে রেখেছিল বৃষ্টির মধ্যে। আগন্তুক দু জনের চকচকে বর্ষাতি এবং শিরস্ত্রাণে তার আভা পড়ে চিকমিক করছিল। তাদের পেছনে একটা কালো রঙের বড় গাড়ি। সামনের লোকটি নম্রভাবে বলল, মিস মিশেল? হ্যাঁ আমারই নাম। তবে ঘর খালির নিওনের বিজ্ঞাপনটা ভুলে জ্বালানো হয়েছে। এই হোটেল এখন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমি বললাম।
-নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমার মিস্টার সাইনেত্তির কাছ থেকে আসছি। তার বীমা কোম্পানি থেকে। কাল মালপত্র সরাবার আগে আমরা সব কিছুর একটা লিস্ট বানাব। বৃষ্টি থেকে ভেতরে আসতে দেবেন? ভেতরে গিয়ে আপনাকে পরিচয় পত্র দেখাচ্ছি। কি ভয়ঙ্কর রাত্রি, লোকটি বলল। সন্ধিগ্ধ দৃষ্টিতে দু জনকে নিরীক্ষণ করলাম একে একে। কিন্তু বর্ষাতির শিরস্ত্রাণে তাদের মুখ এমন আবৃত ছিল যে মুখের কিছুই প্রায় দেখতে পেলাম না। কথাটায় তেমন কোন গলতি ছিল না ঠিকই, কিন্তু আমার ভাল লাগছিল না। একটু ভয় ভয় ভাবে বললাম, নিশ্চয়, মিস্টার টমসন। বলে সে আবার হাসল।
-ঠিক আছে মেমসাহেব। আমরা কি ভেতরে আসতে পারি? বাইরে একেবারে দোজয়ের পানি ঝরছে।
–আমি জানি না। কাউকে ভেতর ঢুকতে দেবার কথা আমাকে বলা হয়নি। তবে যেহেতু আপনারা মিস্টার সাল্গুইনেত্তির কাছ থেকে…
আমি ত্রস্তভাবে চেনটা খুলে দরজা খুললাম।
তারা ঠেলে ঢুকল আমাকে অভদ্রভাবে পাশ কাটিয়ে। তারপর দুজনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে বড় ঘরটাকে দেখতে লাগল। যাকে মিস্টার টমসন বলে ডাকা হল সে হাঁচল। শীতল, ধূসর, মুখ থেকে কালো চোখ দুটো আমাকে দেখছিল।
-সিগারেট খান?
— সামান্য সামান্য। কেন?
-মনে হয় আপনি সঙ্গ পেতে পারতেন। আমার হাত থেকে দরজার হ্যান্ডেলটা নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে চেন আটকে দিল। ওরা দু জনে জলসিক্ত বর্ষাতি খুলে বিচ্ছিরিভাবে মেঝের ওপর ছুঁড়ে দিল। এখন দু জনকেই দেখতে পেলাম। অনুভব করলাম আমি চরম বিপদের মধ্যে পড়েছি।
মিস্টার টমসন।
নিশ্চয়ই দলপতি। লম্বা, পাতলা, প্রায় কঙ্কালসার, ধূসর চামড়া, কোটরে ঢাকা চোখ, যেন সব সময়ে ঘরের ভেতরেই থাকে। কৌতূহলহীন কালো চোখ ধীরে ধীরে নড়ে। এবং লাল পাতলা ঠোঁট দুটি সেলাই না করা ক্ষতস্থানের মত ফাঁক হয়ে রয়েছে।
গায়ে একটা ছাই ছাই রং-এর শার্ট। গলা অবধি বোম আটকানো। টাইনেই। পায়ে ছুঁচালো ইটালিয়ান ধাঁচের ছাই রঙ সুয়েডের জুতা। সব কিছুই আনকোরা নতুনের মত দেখাচ্ছিল। একটা ভীতিকর গিরগিটির মত দেখতে তাকে। ভয়ে আমার গা শিউরে উঠল।
এই লোকটাকে দেখতে যেমন মারাত্মক, এর সঙ্গী সেক্ষেত্রে বরং শুধু অপ্রীতিকর। বেঁটে খাটো গোল গোল মুখ, ভেজা-ভেজা ফ্যাকাশে নীল রং-এর চোখ, পুরু রসসিক্ত অধর। গায়ের চামড়া ধবল শ্বেত রং-এর। তার বোধহয় কোন অসুখ ছিল যাতে গায়ের চামড়া নির্লোম হয়ে গিয়েছিল। ভুরু কিংবা চোখের পালক ছিল না। মাথায় এক গাছি চুলও না। টাকটা একেবারে বিলিয়ার্ড বলের মত চকচকে পালিশ করা। অমন ভয় না পেয়ে গেলে, ওর জন্য আমার দুঃখই হত। বিশেষ করে ওর ঠাণ্ডা লেগেছিল এবং বর্ষাতিটা ভোলা মাত্র নাক ঝাড়তে শুরু করেছিল। তার গায়ে একটা কালো চামড়ার কোট, পরনে হদ্দ নোংরা একটা প্যান্ট আর স্ট্র্যাপ ওয়ালা মোটা চামড়ার মেক্সিকান জুতা। আমার ভীষণ অনুশোচনা হচ্ছিল। হায় রে, যদি নগ্নতাকে মুখর করে তোলার মত এই সাংঘাতিক আঁটসাট পোশাকের বদলে বেশি ঢাকাটুকি দেওয়া কোন পোশাক আমি সেদিন পরতে পারতাম।
নিশ্চয়ই ওর নাকঝাড়া পর্ব সমাপ্ত করে প্রথমে আমার দিকে মনোযোগ দিতে এখন উদ্যোগী হল। দন্তপাটি বিকশিত করে উফুল্লভাবে আমাকে অবলোকন করল। আমার চারপাশে চক্কর মেরে নিয়ে, সামনে এসে লম্বা একটা শিষ দিল। সঙ্গীকে চোখ টিপে বলল, হরর বস্ খাসা ডবকা মাইরী! ক্যায়সা মাল বো–জবাব নেই!
