দেখলাম, বিনা পয়সায় খাওয়া থাকা এবং ওই ষাট ডলার দক্ষিণা রোজগার করতে পারলে তো ভালই হয়। এর মধ্যে ট্যুরিস্টের মেজাজে আমি গোটা পঞ্চাশ ডলার বাড়তি খরচা করে ফেলেছি। এই রোজগার আমার ওই খরচার ক্ষতিপূরণ করবে। ফ্যান্সিদের হাবভাবে ততটা আমল দিলাম না। ভেবে নিলাম যে পথে বেরিয়ে সব শ্রেণীর লোকের দেখা পাব বলে তৈরি ছিলাম, এরা তাদের চেয়ে নিকৃষ্ট কিছু নয়। তাছাড়া, এটাই প্রথম চাকরি যা আমাকে সেধে দেওয়া হচ্ছে; তাই কেমন করে এটা করি দেখার জন্য কৌতূহলও ছিল। সম্ভবত, আমার কার্যকাল শেষ হলে এরা একটা কিছু সার্টিফিকেটও দেবেন যা দেখিয়ে দক্ষিণাঞ্চলে যাবার পথে অন্য কোন হোটেলে কাজ পেতে পারি। কাজেই নম্র ভাবে কিছু খবরাখবর নিয়ে আমি বললাম যে প্রস্তাবটা বেশ চমৎকার। ফ্যান্সীরা মনে হল খুব খুশি হয়েছে এবং মিলিমেন্ট (মহিলার নাম) আমাকে পুঞ্জীভূত করার বা রেজিস্টার লেখার পদ্ধতি দেখিয়ে দিলেন। বলে দিলেন, যে সব আগন্তুকরা কম মালপত্র ও বড় স্টেশন ওয়াগন নিয়ে আসবে, তাদের ওপর যেন নজর রাখি। এরপর আমাকে তাড়াতাড়ি করে গোটা প্রতিষ্ঠানে ঘরদোর দেখিয়ে দিলেন।
সব কিছু বেশ ভালয় ভালয় উৎরে গেল; কাজটায় কোন সমস্যাই দেখা দিল না। বাস্তবিক করণীয় কাজ এতই যৎসামান্য ছিল যে আমার ভেবে অবাক লাগত যে কেন ফ্যাশীরা আমাকে আদৌ বহাল করল। তবে দুজনেই ছিল রাম কুঁড়ে, আর নিজেদের টাকায় তো আর মাইনে দিচ্ছে না এবং নিয়োগের আংশিক কারণ সম্পর্কে আরেকটা অনুমান এই যে জেড় ভেবেছিল সে একজন অনায়াস শয্যাসঙ্গিনী পেতে পারবে। ওর আগ্রাসী হাতকে এড়িয়ে এবং দৈনিক গড়ে একবার করে শীতলভাবে ওকে প্রতিরোধ করে, ঘুমোবার আগে দরজার হাতলের নিচে একটা চেয়ার আটকে রাখে, যাতে ওখানে আমার দ্বিতীয় রাত্রিতে চাবি দিয়ে যেমন দরজা খোলার চেষ্টা করেছিল, তা না করতে পারে, এসব করে, ওর সে মতলবও কোন সমস্যার সৃষ্টি করতে পারেনি।
প্রথম সপ্তাহে আমাদের গুটি কয় অতিথি এল রাত্রিবাস করার জন্য। দেখা গেল যে গেরস্থালির দেখার দিকটাও আমার কাছ থেকে আশা করা হচ্ছে। যাই হোক মক্কেলরা খসে পড়ল এবং দশই অক্টোবরের পরে আর একজনও রইল না।
দৃশ্যতঃ এই বিশেষ অবকাশকালীন জগতে পনেরই অক্টোবর যেন এক ধরনের জাদুকরী তিথি। ওই তারিখে সব কিছুর ঝাঁপ ফেলা হয় শুধু বড় বড় জাতীয় সড়কগুলির আশপাশটা–এর ব্যতিক্রম। শিকারের মরসুম আসছে। ধনী শিকারীরা পাহাড়ে নিজেদের মৃগয়া সমিতি বা মৃগয়া শিবিরে উঠবেন। যাদের অত টাকা পয়সা নেই তারা চড় ইভাতির এলাকাগুলির একটা না একটাতে গাড়ি রেখে ভোর সময় গর্বতগাত্রের জঙ্গলে ঢুকে পড়বেন হরিণের সন্ধানে। সে যাই হ ক অক্টোবরের পনেরই পেরুতে দৃশ্যপট থেকে পর্যটক-ভ্রমণার্থীরা অন্তর্হিত হন এবং অ্যাডিরোনডালে অনায়াসে অর্থোপার্জনের সুযোগও সেইসঙ্গে উধাও।
মুরসুমের শেষের বন্ধ করার দিনটি যতই এগিয়ে আসতে লাগল ততই ট্রয়ের মিস্টার সান্গুইনেত্তি ও ফ্রান্সীদের মধ্যে ঘনঘন টেলিফোনে কথাবার্তা হতে লাগল; এবং এগার তারিখে মিসেস ফ্যালী আমাকে কথায় কথায় বললেন যে, তিনি ও জেড তের তারিখেই ট্রয়ে ফিরে যাচ্ছেন, তাই সে রাতটার জন্য হোটেলের ভার নিয়ে চৌদ্দ তারিখে দুপুর নাগাদ যখন মিস্টার সানুগুইনেত্তি প্রতিষ্ঠানটি পাকাপাকিভাবে বন্ধ করার জন্য আসবেন তখন তার হাতে চাবিটি হস্তান্তর করে দিতে আমার অসুবিধা আছে কিনা।
প্রথমত, একটি অচেনা মেয়ের হাতে এত মূল্যবান সম্পত্তি ছেড়ে যাবার ব্যাপারটা কিছুটা অনির্দিষ্ট ধরনের বন্দোবস্ত বলেই মনে হল। তবে পরে বিশদ করে বুঝিয়ে দেওয়া হল যে, ফ্যাশীরা টাকাকড়ি, রেজিসটার খাতা, খাবার ও পানীয়ের মজুত মাল ওদের সঙ্গে নিয়ে যাবে; যা আমাকে করতে হবে তা হল শোবার আগের দিকেই অস্থাবর বাকি যা রইল সেগুলি নিয়ে যাবার জন্য মিস্টার সাল্গুইনেত্তি ট্রাক নিয়ে আসবেন। আমি আবার নিজের কার্যসূচি শুরু করতে পারব। আমি তাই বললাম, বেশ, রাজি।
খুব উল্লসিত হয়ে মিসেস ফ্যান্সী বললেন যে, আমি দারুণ লক্ষ্মী মেয়ে। যখন বললাম যে তিনি আমাকে কোন সার্টিফিকেট দিয়ে যাবেন কিনা তখন যেন কেমন অস্বস্থি প্রকাশ করে বললেন যে, সে ব্যাপারটা তাকে মিস্টার সাল্গুইনেত্তির ওপরই ছেড়ে দিতে, তবে তিনি নিশ্চয় উল্লেখ করবেন যে, আমার কাছ থেকে কত সাহায্য পাওয়া গেছে।
কাজেই শেষ দিনভর, আমার এবং যারা ট্রাক নিয়ে আসবে তাদের জন্য প্রচুর শুকনো মাংস, ডিম, কফি এবং রুটি রেখে কাকটোরিয়া ও মালগুদাম থেকে জিনিসপত্র বেঁধে হেঁদে ওদের স্টেশন ওয়াগনে বোঝাই করা চলতে লাগল।
ওই শেষ দিনটা ভেবেছিলাম ফ্যালীরা অন্তত আমার সঙ্গে ভাল ব্যবহার করবে। মোটের ওপর আমরা একত্রে আমার কাজের এক্তিয়ারের বাইরে এসে সব বিষয়ে ওদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে কাজ করে সাহায্য করতে লাগলাম। কিন্তু ভারি অদ্ভুত ঠেকল ওদের ঠিক বিপরীত ধরনের ব্যবহারের রীতি দেখে। মিসেস ফ্যান্সি আমাকে এমন ভাবে হুকুম করতে লাগলেন যেন আমি ওদের ঝি। আর জেড ও বেপরোয়া লম্পটের মত, ওর বৌ শুনতে পায় এমন জায়গা থেকে ও নোংরা সব কথা বলতে লাগল এবং বেশ প্রকাশ্যে হাতের আওতার মধ্যে এলেই গায়ে হাত দেবার চেষ্টা করতেও লাগল। এই পরিবর্তনের কারণটা ঠিক বুঝে উঠতে পারলাম না। মনে হল আমার কাছ থেকে যা যা কাজ আদায় করা দরকার তা উশুল হয়ে গেছে তাই এখন তারা আমাকে অসম্ভব ও এমনকি প্রায় ঘেন্নার সঙ্গে উপেক্ষা করতে চাইছে। শেষ পর্যন্ত আমি এমন রেগে গেলাম সে মিসেস ফ্যান্সির কাছে গিয়ে বললাম, যে আমি চলে যাব, আমার পাওনাটা কি এখন পেতে পারি? তিনি শুধু হেসে বললেন, ওঃ না। মিস্টার সানুগুইনেত্তি এসে আমার পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবেন। যদি কাঁটা চামচের সংখ্যা তখন গুনতি মিলিয়ে কম হয়ে দেখা যায়, তাতে তারা সে দায়িত্ব নেবে না। এর পরে এবং অপরাহ্নের যাবার সময় আর ওদের মুখদর্শন করার প্রবৃত্তি না হওয়ায়, আমি নিজের জন্য কিছু জ্যাম দিয়ে স্যান্ডউইচ বানিয়ে নিয়ে ঘরে এসে চাবি আটকে বসে যে সকালবেলা ওরা চলে যাবে। তার আগমনের জন্য প্রার্থনা করতে লাগলাম। প্রার্থনা অনুসারেই অবশেষে এক সময় ঘড়িতে ভোর ছ টা বাজল এবং দানবদানবী যুগল বিদায় হল।
