এই দু-সপ্তাহের শেষদিকেই আমি লেকজর্জের কাছে এলাম। অ্যাডিরোনডাকলে পর্যটনের দুরন্ত কেন্দ্র যা কোন রকমে বনভূমি এবং অরণ্যচরদের একটা বন্য আশ্রয়ে পরিণত হয়েছিল। এখান থেকেই ন নম্বর জাতীয় সড়কের ভয়ঙ্কর ব্যস্ততা থেকে কেটে পড়েছিলাম এবং বনের বুক চিরে যে ধুলিধুসর পথটা গেছে, তা ধরেই দা ড্রিমি পাইনস মোটর কোর্টে পৌঁছে আরামকেদারায় বসে এখন মনে করে চলেছি কিভাবে এখানে এলাম।
.
ওরা এল বসার ঘরে
আগের মতই মুষলধারে তীব্র বৃষ্টিপাত হচ্ছিল।
বৃষ্টির পানি বেরুবার জন্য বাড়িটার ছাদের চারতলায় চারটি মুখ রয়েছে তা দিয়ে কলস্বরে জমা পানি বের হবার শব্দের নেপথ্য সঙ্গীত হিসাবে ওই ধারাপাতের অবিশ্রান্ত গর্জন বেশ মিলে গিয়েছিল। আমি বিছানার দিকে তাকালাম। আমার ছোট্ট কুঠুরিতে কি নিবিড় ঘুমেই না আমি আচ্ছন্ন হয়ে পড়ব–ওই চমৎকার পার্কেল চাদরের ওপর, যা দিয়ে হোটেলের বিজ্ঞাপনে আগন্তুক অতিথিদের নিমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। বিলাসবহুল, এলিয়েট ফ্রে মার্কা বিছানা, ম্যাজি কাস্টমের নক্সা করা কার্পেট, ফিলকো কোম্পানির তৈরি টেলিভিশন এবং বাতানুকূল ব্যবস্থা, আইস ম্যাজিক যন্ত্রে তৈরি বরফ, অ্যাক্রিন কম্বল, সিম ভিভ্যার তৈরি আসবাবপত্র। (আমাদের কেসেলিক ল্যামিনেটরে তৈরি দেরাজ ও টেবিলের ওপরটা, সিগারেটের পোড়া ও মদের দাগ প্রতিরোধক)-অ্যাক্রিলাইটের তৈরি ধারা স্নানাগারের বন্ধনী, অলসোনাইট পার্লেমেন্টের তৈরি শৌচাগারের পাদানি এবং তথাকথিত টয়লেট পেপারের বদলে বাথরুম টিসু (সমকালীন গৃহবর্নের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শৌচাগারে ব্যবহার কাগজগুলি আধুনিক নানারঙে রঞ্জিত)–এসবই আজ রাতে আমার, একলা আমার!
এই সব সাজ-সরঞ্জামসহ একটা সুন্দর জায়গাতে অবস্থিত হওয়া স্বত্ত্বেও, মনে হয়, দা ড্রিমি পাইনস তেমন একটা ভাল চলছিল না। দু সপ্তাহ আগে যখন আমি এখানে এসেছিলাম তখন গোটা বাড়িটায় মাত্র দুজন রাত কাটানোর অতিথি ছাড়া আর কোন খদ্দের ছিল না। মরশুম শেষ হতে মাত্র দু-সপ্তাহ বাকি, এই দু সপ্তাহের জন্য কোন কক্ষই কেউ সংরক্ষণ করেনি।
সেদিন বিকেলে যখন আমি এখানে এলাম, তখন মিসেস ফ্যান্সি তিক্ত, অবিশ্বাস্যপূর্ণ, গম্ভীর মুখ, সদ্য ঢালাই করা লোহার মত ধূসর রং-এর ত্বক নিয়ে রিসেপশনিস্টের টেবিলে বসে। উনি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। একা একটি মেয়ে, সঙ্গের ঝুলিতে যৎসামান্য জিনিস নিয়ে তার ভেসপা স্কুটারে? নম্বর সড়ক থেকে এদিকে আসছে; আমার কার্ডটা হাতে ধরে তিনি খুঁটিয়ে, খুঁটিয়ে দেখলেন যে আমার ড্রইভিং লাইসেন্সটা ভুয়া কিনা।
মহিলার স্বামী জেড় এদিকে অনেক বেশি উদার; কিন্তু পরে যখন কাফেটেরিয়াতে লোকটির হাত আমার বুকে ঘটে গেল তখন বুঝতে পারলাম ওই উদারতা কেন। পরে অবশ্য তিনি আমার জন্য কফি বয়ে আনলেন। দেখা যাচ্ছিল তিনি ছোটখাট ফাইফরমাসের কাজ এবং টুকটাক রান্নার কাজ এই দ্বৈত ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে আমার সর্বাঙ্গ ধীরে ধীরে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ঘুরে ফিরে ঘ্যানঘ্যান করছিলেন যে মোটল বন্ধ করার আগে চারদিকে কত কাজ তার পড়ে রয়েছে। এরই মধ্যে যারা মালপত্র নেবার কাজ করছে তাদের ডিম ভেজে দেবার জন্য ঘন ঘন তার ডাক পড়ছিল। মনে হল যে মালিকের এই দু জন ম্যানেজার। হোটেল মালিক থাকতেন ট্রয় শহরে। নাম মিস্টার সানগুইনেত্তি।
-মালদার আদমী। কোহেস রোড বেয়ে নেবে গেলে একটা জায়গায় প্রচুর সম্পত্তির মালিক, নদীর ধারেই। এ ছাড়া আলবেনীর পরে ননম্বর সড়কে পেল্লায় সে বাড়িটা ট্রোজান হর্স –তার কথা শুনেছেন? শুনিনি বলতে মিস্টার ফ্যান্সি ধূর্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন, যদি কখনো মজা করতে হয় তো হর্সের কাছে চলে যান। তবে একা না। যাওয়াই ভাল। আপনার মত সুন্দরী একটু ঝামেলায় পড়তে পারে। পনের তারিখের পরে যখন আমরা এখান থেকে চলে যাব, তখন একবার ফোনে যোগাযোগ করবেন। আমার নাম ফ্যান্সি, টেলেফোন ডিরেক্টরীতে পেয়ে যাবেন। আপনার সঙ্গী হতে পারলে খুশিই হব। মজার অন্ধি সন্ধি বাৎলে দেব। — ধন্যবাদ। তবে এখন তো শুধু এসব অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। আমার গন্তব্য দক্ষিণের দিকে যাবার জন্য। হলদে দিকটা ওপরে রেখে কয়েকটা ডিম ভাজা মাংস দিয়ে যদি আমাকে দেন আপাতত?।
শুনেও মিস্টার ফ্যান্সি আমাকে একা ছেড়ে যাবেন না, যাবার সময় আমার ছোট টেবিলটার সামনে বসে ওর নিজের এক ঘেয়ে জীবন কাহিনীর টুকরো ও তার অনেক ঘটনা শোনাতে শোনাতে আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে স্বাভাবিক কৌতূহলেই প্রশ্ন করে যেতে লাগলেন, বাবা মার কে কে আছেন, বাড়ি ছেড়ে এতদূর এসে মন খারাপ লাগছে কিনা, মার্কিন দেশে আমার কোন বন্ধু আছে কিনা–এইসব।
মোটের ওপর লোকটির বয়েস পঁয়তাল্লিশের ধারে কাছে, প্রায় আমার বাবার বয়সী হবে। এর স্ত্রীও এর জাতেরই। ঘরের অন্য সীমা থেকে অভ্যর্থনা কেন্দ্রের টেবিলের ওপাশে বসে তিনি আমাদের লক্ষ্য করে যাচ্ছিলেন।
শেষ পর্যন্ত মিস্টার ফ্যান্সি আমাকে ছেড়ে ওর স্ত্রীর কাছে গেলেন। আমি কফির দ্বিতীয় কাপ (এর জন্য কোন দাম লাগবে না দিদিমনি। দা ড্রিমি পাইনস এর শুভেচ্ছা জানাবার জন্য এটা) শেষ করতে করতে সিগারেট খাচ্ছিলাম বসে। নিচু গলায় কোন বিষয় নিয়ে ওদের কথা বলতে শুনছিলাম যা, মাঝে মাঝে হাসির শব্দ ওঠায়, মনে হচ্ছিল, ওদের কাছে বেশ সন্তোষজনক হচ্ছে। শেষে মিসেস ফ্যান্সি আমার কাছে উঠে এলেন। আমার দুঃসাহসী অভিযান। সম্পর্কে মা-খালার মত উকণ্ঠা। (ও মাগো! তোমরা আধুনিক মেয়ে এরপর কি করবে গো) জানালেন। তারপর ঝেকে বসলেন এবং যতটা মনোরম ভাব ফোঁটানো সম্ভব ফুটিয়ে বললেন যে, আমি আরও কয়েকদিন ওখানে থেকে জিরিয়ে নিয়ে সঙ্গে কিছু ডলার রোজগার করে নেই না কেন। ওদের রিসেপশনিস্ট চব্বিশ ঘণ্টা আগেই চলে গেছে। এজন্য সব কিছু দেখা, গোছগাছ করা, মরশুমের শেষে হোটেল বন্ধ করার হ্যাপা–এসব সামলে ওই কাজ কে দেখে? আমি কি শেষ দু-সপ্তাহের জন্য কাজটা চালিয়ে নেব? খাওয়া-থাকা ছাড়া সপ্তাহ তিরিশ ডলার হিসেবে।
