ক্যানাডা ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের উত্তরাঞ্চলে পিকিন এরিয়া বা চড় ইভাতির এলাকা গুলির উদ্ভাবনটা বেশ ভাল হয়েছে। জঙ্গল সাফ করে নদী বাহ্রদের ধারে খানিকটা জায়গা নিয়ে। গোপনীয়তা বজায় রাখার জন্য গাছের ফাঁকে ফাঁকে গাছের ডাল কেটে কেটে প্রচুর বেঞ্চি ও টেবিল বিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি না হলে এই সব টেবিল বেঞ্চিতে বসেই দুপুরের খাওয়াটা রোজ সেরে নেব ভাবলাম।
দোকান থেকে দামী দামী খাবার না কিনে হোটেলের নৈশবাস ছেড়ে আসার আগেই সেখান থেকে ডিম আর গোমতা শুকনো মাংস দিয়ে টোস্টারে স্যান্ডউইচ তৈরি করে নেব। এর সঙ্গে ফল ও এক ফ্লাস্ক কফি হবে আমার মধ্যাহ্ন ভোজনের খাদ্যতালিকা। তবে সন্ধ্যেবেলায় নৈশ্য ভোজের সময় এটা পুষিয়ে নেব। আমার রোজকার খরচের বাজেট রেখেছিলাম পনের ডলার। বেশির ভাগ হোটেলে একজনের থাকার খরচ আট ডলার করে, এর ওপর আবার সরকারি কর। তাই আমি এ বাবদ নয় ডলার ধরলাম। এ ছাড়া ভোরবেলা খাবার জন্য কফি এবং একটা মাংসের প্যাটিস। পেট্রোলের জন্য রোজ এক ডলারের বেশি লাগবে না। এতে দুপুর ও রাত্রে খাবার ও এক আধবার পানও কিছু সিগারেটের জন্য আমার হাতে থাকবে দিনে পাঁচ ডলার। আমি এর মধ্যেই কুলিয়ে নেবার চেষ্টা করব।
এসো কোম্পানি ও আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের যে পথনির্দেশ ও মানচিত্র আমার কাছে ছিল, তাতে সীমান্ত পেরোবার পর অসংখ্য দর্শনীয় জায়গার তালিকা দেওয়া ছিল। যেমন, ফেনিশোর কুপার রেড ইন্ডিয়ানদের রাজ্য, তারপর মার্কিন বিপ্লবের অনেক যুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত জায়গা, আসার পথে পড়বে। এদের অনেক জায়গাতেই প্রবেশ মূল্য এক ডলারের কাছাকাছি। তবে ভাবলাম যে এতেই চলে যাবে। যদি কোনদিন খরচ বেশি হয়ে যায় তবে অন্যান্য দিন না হয় খাওয়ার খরচটা কমাব।
ভেসপাকে যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়ে দেখলাম অনেক বেশি পোক্ত এবং চালানো আশ্চর্যজনক সোজা। যতই হাতের মুঠোয় গিয়ার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভালভাবে আসতে লাগল, ততই এই ক্ষুদে যন্ত্রটার ওপর শুধু চড়ে না গিয়ে, এটাকে ইচ্ছামত চালাতে লাগলাম। বিশ সেকেন্ডের মধ্যে পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত গতিবেগ ওঠানো যে কোন মার্কিনী গাড়িকে হতচকিত করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। পাখির মত পাহাড়ের পাকদণ্ডী বেয়ে যেন উড়ে উঠছিলাম; এগজস্ট দিয়ে মধুর একটা কলরব উঠছিল সীটের নিচে থেকে। তবে অল্পবয়সীদের মুহুর্মুহু সিটি দিয়ে ইশারা করা এবং বয়স্কদের হেসে হেসে হাততালি দেওয়া, আমাকে যথেষ্ট সহ্য করতে হয়েছিল। হয়ত খালার ভবিষ্যদ্বাণীর মত চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে পারে, আমি এই সব অপ্রীতিকর ঘটনাও উপভোগ করতে পেরেছি। সবাইয়ের দিকে তাকিয়েই আমি শুধু মাধুর্যের তারতম্য ঘটিয়ে স্মিত হাসি জুড়ে দিয়েছি।
উত্তর আমেরিকার বেশির ভাগ পথের আস্তরণই খারাপ। আশঙ্কা ছিল যে জাতীয় সড়কগুলিতে খোবলানো খোবলানো গর্তগুলির জন্য স্কুটার চালাতে আমাকে ভারি বেগ পেতে হবে এবং দূরপাল্লার স্কুটার যাত্রিনী দেখতে বহু লোকের ভিড় হবে। কিন্তু দেখলাম এ পথের অন্যান্য ড্রাইভাররা আসলে ছোট কোন পুতুলের মত ভেবেছিল; তারা আমাকে পথের এমন চমৎকার চওড়া অংশ ছেড়ে দিয়ে যেতে লাগল যে প্রায় সময়ই রাজপথের মধ্যবর্তী একটি আংশিক সরণী আমার একার ব্যবহারের জন্যই পেতে লাগলাম।
প্রথম দিনটা এত সুন্দর উৎরে গেল যে আমি মন্ট্রিল পার হয়ে গেলাম সন্ধ্যা নামার আগেই, তখন আমি ননম্বর জাতীয় সড়কে বিশ মাইল এগিয়েছি; পরদিন সকালে সীমান্ত পেরিয়ে নিউইয়র্ক রাজ্যে ঢুকব। দা সাদার্ন ট্রেল মোটেল -এ উঠলাম রাতের অতিথি হয়ে। সেখানে আমাকে এমনভাবে দেখা হল যেন আমি আসোশিয়া ইয়ারহার্ট অথবা অ্যামি মলিসন। যেভাবে এ যাবৎ চলছিল, তার তুলনায় খুবই দারুণ এই অভ্যর্থনা। কাফেটেরিয়াতে ভরপেট খেয়ে, হোটেলের মালিকের প্রচণ্ড এক গ্লাস পানীয় সঙ্কোচের সঙ্গে বসে পান করে, আমি শুতে গেলাম সুখ ও চাঞ্চল্য নিয়ে। দীর্ঘ কিন্তু আশ্চর্য দিন ছিল সেটি। ভেসপা ছিল আমার স্বপ্ন, আমার সমস্ত পরিকল্পনা সুন্দরভাবে রূপায়িত হয়ে চলছিল।
প্রথম দশ মাইল পাড়ি দিতে আমার একটা দিন লাগল। এর পরের আড়াইশ মাইল পেরোতে লাগল প্রায় দু সপ্তাহের মত। এতে কোন রহস্যের ব্যাপার নেই। মার্কিন সীমান্তরেখা ভেদ করে ঢুকতেই অ্যাডিরোনডাসের আশেপাশে আমি বেড়াতে লাগলাম, যেন বিলম্বিত গ্রীষ্মবকাশ উপভোগ করতে বেরিয়েছি। ভ্রমণ কাহিনী লিখতে যাচ্ছি না, তাই খুঁটিনাটি বিবরণ দেবার দরকার নেই। তবে ওই অঞ্চলে এমন কোন পুরানো দুর্গ, জাদুঘর জলপ্রপাত, গুহা বা উঁচু পাহাড় ছিল না, যা আমি দেখিনি। স্টেরিল্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার টাউন এবং নকল রেড) ইন্ডিয়ান সংরক্ষণ প্রভৃতি জায়গাতেও দর্শনী হিসেবে এক ডলার করে খরচ হয়েছিল। হৈ-চৈ করে দর্শনীয় বস্তুগুলি দেখতে যাবার মধ্যে প্রকৃত কৌতূহল থাকলেও আমার আর একটা বিশেষ গুঢ় উদ্দেশ্য ছিল। তা হল রাতের জন্য একটা আস্তানা খুঁজে বের করা; যখন এইসব হ্রদ নদী বন ছেড়ে দক্ষিণের দিকে যাব জাতীয় সড়কগুলির দুর্গম কমডোলারেডো সসেজের দোকান এবং নিওনের ফিতের মত আলো সেখানে ঝরে পড়ছে।
