যন্ত্রপাতি সম্বন্ধে কিছু জানতাম–উত্তর আমেরিকার প্রতিটি শিশুই মোটর গাড়ির সঙ্গে বড় হয়। এবং আমি ১২৫ সি সি মডেলের তুলনা করছিলাম। শেষ পর্যন্ত শেষোক্ত মডেল সম্পর্কেই মনস্থির। এই স্কুটারটায় স্পীড ওঠে চমৎকার আর এর সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ষাট মাইল। এক গ্যালনে পাড়ি দেবে আশি মাইল রাস্তা। অন্য স্কুটারটা চলত গ্যালনে একশ মাইলের মত। আমি মনে মনে বললাম যে আমেরিকায় পেট্রোল খুব সস্তা, আমাকে বেশি গতিবেগ সম্পন্নটিই নিতে হবে; না হলে দক্ষিণে গিয়ে পৌঁছাতে মাসের পর মাস লেগে যাবে। হোটেলে ফিরে এসে মানচিত্র খুলে কুইবেক থেকে শুরু করে আমার যাত্রা পথের প্রথম পর্ব দেখতে লাগলাম। এরপর ফ্লোরেন্স খালাকে টেলিগ্রাম করলাম, সবচেয়ে সস্তার ট্রান্স ক্যানাডা বিমানপথে মন্ট্রিলে যাবার টিকিট কিনলাম এবং কোন এক পয়লা সেপ্টেম্বরের সুন্দর সকালে আমার যাত্রা হল শুরু।
ছ বছর পরে এই প্রত্যাবর্তন ছিল একই সঙ্গে মনোহর ও বিস্ময়কর। আমার খালা বললেন যে, তিনি আমাকে চিনতেই পারতেন না। আমিও কুইবেককে দেখে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। যখন চলে যাই তখন কেল্লাটাকে মনে হত বিশাল ও রাজকীয়; এখন এটাকে মনে হল ডিসৃনিল্যান্ডের খেলাঘর থেকে কোন একটা বাড়ির অনুকরণে তৈরি বিরাট খেলনা। অবাক হবার কিছু নেই এই ভূমির সন্তান হবার দরুন বাইরের বিশাল জগতে অবতরণের ফলে আমি ছিলাম অপ্রস্তুত, অস্ত্রহীন। তা স্বত্ত্বেও যে আমি বেঁচে ফিরতে পেরেছি সেটাই পরমাশ্চর্য!
খালার কাছ থেকে খুব সাবধানে এই সব চিন্তাগুলি গোপন করে রাখতাম। তবে সন্দেহ হয় যে, তিনিও ইউরোপে অর্জিত আমার সমাপ্তির র ছটা দেখে সমপরিমাণেই চমকিত এবং সম্ভবত একটা ঝাঁকুনি খেয়ে থাকবেন। তিনি নিশ্চয়, আমি যতই ভেতরে ভেতরে সোজা সরল অনুভব করি না কেন, আমাকে একটি শহুরে ইঁদুর বলেই চিনতে পেরেছিলেন। তাই তিনি একগাদা প্রশ্নাবলী নিক্ষেপ করে আবিষ্কার করতে চাইলেন কেন আমার চেহরার সহজ লাবণ্য চলে গিয়েছিল। দ্রুতগতির জীবনযাত্রা আমার জীবনকে কতটা নোংরা করেছে (খালা ধরেই নিয়েছিলেন যে ওদেশে আমি দ্রুতগামী জীবনই যাপন করেছি)।
সত্যি কথা শুনলে তিনি মূচ্ছা যেতেন। কাজেই আমি সতর্কতার সঙ্গে বলেছি যে, যদিও ছেলেদের সঙ্গে আলাপ পরিচয় ইত্যাদি হয়েছে তবুও আমি অভগ্ন হৃদয় ও ক্ষগ্রিস্ত না হয়েই কালাপানির ওপারের রক্তিম শহরগুলি থেকে ফিরতে পেরেছি। না, কোন সাময়িক অর্থের কারো সঙ্গে কোন ইয়ে টিয়ে হয়নি। সম্ভ্রান্ত কোন লর্ড তো দূরের কথা সাধারণ মানুষও আমাকে বিবাহের জন্য প্রস্তাব দেয়নি–এটা আমি সত্যি সত্যিই বলতে পারি তাই কোন ছেলে বন্ধু। রেখে আসিনি পেছনে।
আমার মনে হয় না যে, তিনি এগুলি বিশ্বাস করেছিলেন। আমার চেহারা সম্পর্কে তিনি প্রশংসাই করলেন। আমি একটি সুন্দরী–বিড়ালীতে পরিণত হয়েছি। মনে হচ্ছিল যে, আমার মধ্যে গড়ে উঠেছে সেই লাস্য যার মূল ফরাসি শব্দটির অর্থ যৌন আবেদন অথবা অন্ততপক্ষে সেরকম ভাবসাববিশিষ্ট। এটা তার কাছে অবিশ্বাস্য ঠেকেছিল যে তেইশ বছর বয়সেও আমার জীবনে কোন পুরুষ্যের আগমন ঘটেনি। আমার দেশ পর্যটনের পরিকল্পনা শুনে তিনি আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়লেন এবং পথে যে-সব সর্বনাশা বিপদ ওঁৎ পেতে আছে তার জীবন্ত ছবি আঁকলেন। আমেরিকা তো ডাকাত গুণ্ডায় ভর্তি। রাজ্যে রাজ্যে প্রসারিত আন্তনগর সড়কগুলিতে আমি নিশ্চয় আক্রান্ত হব; আমার যথাসর্বস্ব লুঠ করে নেওয়া হবে। যাইহোক স্কুটারে চেপে এরকম অভিযানে বেরানোটা নারীজননাচিৎ কাজ নয়। বসবার সীটটা যেন এমন হয় যাতে একই দিকে দুই পা ঝুলিয়ে বসতে পারি। আমি তাঁকে বুঝিয়ে বললাম যে, আমার ভেসপা রীতিমত খানদানি স্কুটার এবং যখন মন্ট্রিলে ডেলিভারি নিতে গিয়ে মাইলের পর মাইল নব নব রোমাঞ্চের মধ্যে দিয়ে রাজকীয়ভাবে সেই স্কুটার একা চালিয়ে ফিরে এলাম তখন মাসি সন্দেহের গলায় বললেন, তাহলে তো খুব চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হবে দেখছি। তারপর একদিন পনেরই সেপ্টেম্বর, আমেরিকান এক্সপ্রেস -এ আমার যৎসামান্য অ্যাকাউন্ট থেকে এক হাজার ডলারের ট্রাভেলার্স চেক কেটে নিয়ে, স্কুটারের বসবার আসনের দু পাশের থলি দুটোতে অতি প্রয়োজনীয় পরিচ্ছদের নূন্যতম সম্ভার ভরে নিয়ে, ফ্লোরেন্স মাসিকে বিদায় চুম্বন দিয়ে সেন্ট লরেন্সের পাশাপাশি দু নম্বর প্রধান সড়ক ধরে এগিয়ে চললাম। যুদ্ধের পর থেকে এর লম্বা তীর জুড়ে যে বাড়ি ও গোসল করার কুটিরগুলি ব্যাংয়ের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছে, সেগুলি না থাকলে কুইবেক থেকে দক্ষিণে মন্ট্রিলের দিকে এগিয়ে যাওয়া এই দু নম্বর সড়ক পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী রাজপথগুলির অন্যতমা হতে পারত। এই মহান নদীর ঠিক উত্তর পাড়ে পাড়ে চলেছে এই প্রধান সড়ক। ছোট বেলার গোসল-চড় ইভাতির জন্য জায়গাটা চিনতাম। তখনই সেন্ট লরেন্স দিয়ে সমুদ্রপথে যাবার জন্য যাতায়াত ব্যবস্থা উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং ক্রমাগত বড় বড় জাহাজের ইঞ্জিনের ঝুপঝুপ শব্দ। তাদের ভোঁ বাজা, সিটির শব্দ ছিল এক নতুন রোমাঞ্চ।
বেশ মেজাজে গুঞ্জন করতে করতে ঘন্টায় চল্লিশ মাইল জোরে ছুটে চলেছিল ভেস্পা। দৈনিক গড়ে দেড়শ থেকে দু শ মাইল যাব বলে ঠিক করেছিলাম; অর্থাৎ রোজ ছ ঘণ্টা করে চালানো, তবে কাঁটায় কাঁটায় এই ছক মেনে চলবার তেমন কোন ইচ্ছা আমার ছিল না। আমি সব কিছু দেখতে চাইছিলাম। যদি কোন গুপ্ত রহস্যময় শাখাপথ বেরিয়ে গিয়ে থাকে, সেটা আমি ধরে যাব; তখন যদি কোন নয়নাভিরাম উল্লেখযোগ্য জায়গা চোখে পড়ে আমি তবে সেখানে থেমে চোখ ভরে তা দেখে নেব।
