.
হে পাখি পশ্চিমে যাও
অগাস্টের শেষে, যখন এসব ঘটেছিল, সে সময় জুরিখের মত–গোমড়ামুখো শহর যতটা হর্ষোফুল্ল থাকা সম্ভব ততটাই ছিল। হ্রদের হিমবাহ গলা পরিষ্কার পানি, পালতোলা নৌকা ও শী –করিয়রদের সমাবেশে বর্ণোজ্জ্বল রূপ ধারণ করেছে। সর্বজনীন সৈকত ভূমিগুলি স্বর্ণকায় আনার্থীদের ভিড়ে পরিপূর্ণ। স্বাস্থ্যকর ও ছন্দময় ক্যার্নিভালের মেলা মেলা আবহাওয়া আমার সদ্য চোট খাওয়া স্নায়ুকে যেন পীড়া দিচ্ছিল এবং আমার অসুস্থ মনে পাঁচমিশেলী দুঃখ কষ্ট এসে জমছিল।
হোটেলের দ্বাররক্ষক, অন্য অনুরূপ দ্বার রক্ষকদের মত জগৎ অভিজ্ঞ চোখে আমাকে অবলোকন করে বলল যে, হোটেলের ছুটিতে গেছেন কিন্তু আরেকজন আছে তিনিও ভারি দক্ষ। সে কি জেনেছিল? সে কি অনুমান করতে পেরেছিল?
ডাঃ সুসকিন্ড আমাকে পরীক্ষা করে দেখে জিজ্ঞেস করলেন যে, আমার প্রয়োজনীয় টাকাকড়ি আছে কিনা। হ্যাঁ আছে বলতে দেখলাম যে ডাক্তারবাবু একটু নিরাশ হলেন বলে মনে হল। স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ এই ডাক্তারবাবু আর একটু ভোলা করে বললেন। মনে হল, পাহাড়ে তার একটা গ্রীষ্মকালীন কুটির আছে। জুরিখের হোটেলগুলি এত ব্যয়বহুল। অস্ত্রোপচারের আগে কি আমি কিছু সময় বিশ্রাম নিতে চাইব না? আমি তার দিকে পাথুরে চাউনিতে তাকিয়ে বললাম যে, আমার কাকা স্থানীয় ব্রিটিশ কন্সাল; রোগমুক্তির পর তাঁর পরিবারে থেকে অবকাশ যাপনের জন্য তিনি আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এবং আর একটুও দেরি না করে ক্লিনিকে ভর্তি হতে পারলেই আমি খুব খুশি হব। তিনিই আমাকে ডাঃ সুসকিন্ডের নাম সুপারিশ করেছেন। নিঃসন্দেহে ডাঃ মিঃ ব্রনস্কভেইগ কনসালকে চেনেন?
আমার এই ধাপ্পাটায় বেশ কাজ হল। আমার নবলব্ধ স্থির নিশ্চিত ভাঙ্গতে কথাটা বলেছিলাম। এই কায়দায় চালটা আগে ছকে রেখেছিলাম। বাইফোকাল লেন্সের ভেতর ডাক্তারের চোখ দুটি আহত বলে মনে হল। এরপরই শান্ত ভাষাতে আগের প্রস্তাবের ঐকান্তিক ব্যাখ্যা দেওয়া হল এবং দ্রুত টেলিফোন করা হল ক্লিনিকে।
হ্যাঁ, বটে। আগামীকাল অপরাহ্নে। শুধু আমার এক রাতের উপযুক্ত জিনিসপত্র নিলেই চলবে।
যেমন ভেবেছিলাম, এই শল্যচিকিৎসক শরীরের পক্ষে যতটা যন্ত্রণারহিত করে–করা হল, মনের পক্ষে ছিল ততটা বেদনাদায়ক। তিনদিন পরে হোটেলে ফিরে এলাম। আমার মন প্রস্তুত হয়েছিল। প্লেনে ইংল্যান্ডে ফিরে গেলাম। বিমানবন্দরের কাছে নতুন বৃত্তাকার এরিয়েল হোটেলে উঠে আমার যৎসামান্য জিনিসপত্রের একটা গতি করে হোটেলের পাওনা মিটিয়ে দিয়ে হ্যাঁমারস্মিথে নিকটতম ভেসপা স্কুটারের বিক্রেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে তার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম। আমার পরিকল্পনা ছিল অন্তত বছর খানেকের জন্য একা একা বেড়িয়ে পড়ে বাকি অর্ধেক জগতটাকে দেখা। লন্ডন আমারই ছিল। সেখানের জীবন আমাকে বেধড়ক পিটিয়েছে। আমার পা টলছে। এই সিদ্ধান্তেই এসেছি যে আমি এখানকার কেউ না। ডেরেকের পরিশীলিত পৃথিবীকে আমি বুঝতে পারিনি আবার কোন কায়দায় যে কুরর্টের দেওয়া নিস্তাপ ও বৈজ্ঞানিক আধুনিক প্রেম সামলাতে হয় তাও জানতাম না। নিজেকে বুঝিয়েছিলাম যে, আমি যে পারিনি তার কারণ আমাকে যেটা বেশি ছিল তা হল হৃদয়। এদের দুজনের কেউই। আমার হৃদয়কে পেতে চায়নি। তারা শুধু আমার শরীরটাকেই পেতে চেয়েছিল। আমার ব্যর্থতাকে ব্যাখ্যা করে বলার জন্য এই দু জনকে দায়ী করে, বাতিল করা নারীদের আবহমান কালের আত্মবিলাপের এই যে গলা মেলাচ্ছি তা হৃদয় ঘটিত ব্যাপারের থেকে আমার ব্যর্থতারই গুরুত্বপূর্ণ হদিশ দেবে। এই ঘটনাবলী থেকে নিষ্কাশিত সত্য এই যে আমার সরলতা বড় শহরের জটিল অরণ্যে টিকতে পারে না। সহজেই আমি লুণ্ঠনের শিকার হয়ে পড়ি। আমি নিজে এত বেশি ক্যানাডীয় ছিলাম যে ইউরোপের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে উঠতে পারতাম না। তবে তাই হোক!
আমি যখন সরল, তখন সরল এক দেশেই যাব চলে। উদ্দেশ্যহীন নিস্তেজ অবস্থায় বসে বসে ভাবার জন্য নয়। সেখানে আমি যাব আবিষ্কারের উদ্দেশ্যে, দুঃসাহসিকতাপূর্ণ অভিযানের যাত্রা হিসেবে। গোটা শীতের সময়টা আমি সারা আমেরিকা ঘুরে বেড়াব কখনো রেস্তোরাঁর পরিচারিকা, কখনো বাচ্চা সামলানোর কাজ, কখনো রিসপশনিস্ট হিসাবে কাজ করে গিয়ে, যতদিন না আমি ফ্লোরিডা পৌঁছাই। সেখানে কোন খবরের কাগজের অফিসে একটা কাজ জুটিয়ে নেব এবং ঋতুরাজ বসন্ত না আসা পর্যন্ত রোদ পোহাব সেখানে।
মনটাকে প্রস্তুত করে ফেলা মাত্রই, আমার পরিকল্পনা খুঁটিনাটি বিষয়গুলি আমাকে গ্রাস করে নিল। আমার দুঃখকে তাড়িয়ে না হক দূরে সরিয়ে দিয়ে আমার পাপবোধ, আমার লজ্জা, আমার ব্যর্থতাকে অসাড় করে দিয়ে পলমল-এ আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশন-এর অফিসে গিয়ে সদস্য হলাম এবং যে মানচিত্র প্রয়োজন তা পেলাম। তাদের সঙ্গে আমি যানবাহনের ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করলাম। আমেরিকায় পুরানো মোটর গাড়ির দাম ও চালানোর খরচ খুব বেশি। হঠাৎ একটা মোটর স্কুটার কেনার চিন্তা আমাকে খুব পেয়ে বসল। আন্তদেশিক বিরাট বিরাট সড়কগুলিতে এরকম এক ক্ষুদে দু চাকার যান নিয়ে যাত্রা করার চিন্তাটা প্রথম দিকে হাস্যকর লেগেছিল। তারপর মুক্ত আকাশের নিচে থাকা, গ্যালনে একশ মাইল যাবার ক্ষমতা, গ্যারাজের জন্য দুশ্চিন্তার কিছু না থাকা, হালকা মালপত্র নিয়ে বেড়ান, আর স্বীকার করতেই হবে যে যেখানেই যাব, সেখানেই একটা চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করে চলব, এটা ভাবতেই। হ্যাঁমারষ্টিথের স্কুটার বিক্রেতার কাছে গেলাম, বাকিটা উনিই করে দিলেন।
