ফিরে এসে দেয়ালের দিকে মুখ করে বিছানার কিনারে বসলাম। আমি কি করেছি কোন অন্যায়টা আমি বলেছিলাম? কুরর্টের ব্যবহারের অর্থ কি? তারপর অমঙ্গলের ছায়াপাত দেখে নির্জীব হয়ে বিছানায় উঠে একা একা কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লাম। কাদাটা ঠিকই হয়েছিল। পরদিন সকালবেলা যথারীতি এক সঙ্গে হেঁটে অফিস যাবার জন্য ডাকতে গিয়ে দেখি যে, সে আগেই বেরিয়ে গেছে। অফিসে গিয়ে দেখি, তার ঘর আমার ঘরের মাঝখানে যোগাযোগকারী দরজাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, মিনিট পনের পরে দরজাটি খুলে সে যখন বলল যে, আমাদের কিছু কথাবার্তা বলতে হবে, তখন তার মুখাকৃতি তুষার তুহিন ভালেশহীন। তার ঘরে গিয়ে তার টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে বসলাম, যেন মালিকপক্ষ ছাঁটাই করা হবে এমন কোন কর্মচারির ইন্টারভিউ নিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত হলও তাই। ভাবাবেগ বর্জিত নৈব্যক্তিক সুরে যে বক্তৃতা সে দিয়েছিল তার সারাৎসার ছিল এই
মিত্রতার যে বন্ধনে আমরা আবদ্ধ ছিলাম, যা ছিল অত্যন্ত-উপভোগ্য, তার পক্ষে অতি প্রয়োজনীয় শর্ত ছিল, যে সব কিছু মসৃণ ও সুশৃঙ্খলভাবে চলবে। আমরা দুজনে ছিলাম (হ্যাঁ, ছিলাম) চমৎকার বন্ধু, এবং আমি স্বীকার করব যে কখনোই বিয়ের কথা হয়নি, দুজন মিত্রের (আবার সেই শব্দটি!) মধ্যে সন্তোষজনক সমঝতার চেয়ে বেশি স্থায়ী কিছু নয়। এটা ছিল খুব সুখকর সম্পর্ক, কিন্তু এখন একজন মিত্রের দোষে (মনে হচ্ছে, কেবল আমার একার) এটা ঘটেছে; কাজেই এই সমস্যা, যার মধ্যে আমাদের জীবন পথের প্রতিকূল, অস্বস্তি ও বিপদের উপাদান রয়ে গেছে, একটা সমাধান অবশ্যই খুঁজে দেখা কর্তব্য। বিয়ে-হায়–যদিও আমার গুণাবলী ও শারীরিক সৌন্দর্যের ব্যাপারে তার খুব উচ্চশ্রেণীর ধারণা–তা ছিল বিবেচনার বাইরে।
অন্যান্য বিবেচ্য বিষয় ছাড়াও সঙ্করগোষ্ঠীর (শানিত ও বৈষম্য জয়তু হিটলার) সম্পর্কেও তার বেশ দৃঢ় মতামত আছে এবং যখন সে বিয়ে করবে, পাত্রী হবেন খাঁটি জার্মান রক্তের বংশসস্তৃতা। অতএব, আন্তরিক দুঃখের সঙ্গে সে কয়েকটি সিদ্ধান্তে উপনিত হয়েছেন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যেটি তা হল যে আমি অবিলম্বে একটি অস্ত্রোপচার করিয়ে নেব। তিনমাস অতিক্রান্ত হতে দেওয়াটা বিপজ্জনক ধরনের দেরি হয়ে যাওয়া।
ব্যাপারটা ভারি সরল। আমি প্লেনে জুরিখ চলে গিয়ে হন্টবানোফের কাছে কোন একটা হোটেলে উঠব। বিমান বন্দর থেকে যে কোন ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে ওই অঞ্চলের একটা হোটেলে তুলে দেবে। হোটেলের দারোয়ানের কাছে হোটেলের ভারপ্রাপ্ত ডাক্তারের নাম জেনে নিয়ে তার পরামর্শ নেবে, জুরিখে চমৎকার সব ডাক্তাররা রয়েছেন। তিনি পরামর্শ দেবেন যে, আমার রক্তচাপ হয় খুব উচ্চচাপ গ্রস্ত নয়ত নিম্নচাপ গ্রস্ত এবং আমার স্নায়ু সন্তানের জন্ম দেওয়ার মত সঠিক অবস্থায় নেই। তিনি একজন স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলবেন।
সুইজারল্যান্ডের চমৎকার সব স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। আমি সেই বিশেষজ্ঞের সঙ্গে দেখা করব। তিনি হোটেলের ডাক্তারবাবুর অভিমত সমর্থন করবেন এবং সেই ফর্মে কাগজ পত্রে সই করবেন।
ওই বিশেষজ্ঞ কোন একটা ক্লিনিকে কেবিন সংরক্ষিত রাখবেন। আর এক সপ্তাহের মধ্যেই গোটা সমস্যাটার সমাধান হয়ে যাবে। সম্পূর্ণ সুবিবেচনার সুবিধা রয়েছে। এ সব পদ্ধতি সুইজারল্যান্ডে পরিপূর্ণ আইনসিদ্ধ। আমাকে এমনকি পাসপোর্ট দেখাতেও হবে না। ওখানে আমি যে নাম ইচ্ছে–স্বাভাবিক কারণেই কোন সধবা নাম ব্যবহার করতে পারি। তবে খরচাটা একটু বেশি পড়ে যাবে। হয়ত একশ, আবার দেড়শ পাউন্ডেরও হতে পারে। সেটাও সে ভেবে দেখেছে। টেবিলের দেরাজ টেনে একটা খাম বার করে টেবিলের এধারে ঠেলে দিল। ন্যায়ই হবে এটা, প্রায় দু-বছর যোগ্যতার সঙ্গে চাকরি করার পর কোন নোটিশ ছাড়াই এক মাসের বেতনসহ বরখাস্ত হওয়া। তা ছিল একশ কুড়ি পাউন্ড। নিজের পকেট থেকে টুরিস্ট ক্লাসে বিমান ভাড়া ও জরুরী অবস্থান বাবদ আরক্ত পঞ্চাশ পাউন্ড এতে যোগ করার স্বাধীনতা সে গ্রহণ করেছে। অর্থের সমস্ত অঙ্কটা জার্মান মুদ্রায় দেয়া হয়েছে যাতে বিনিময় করার ঝক্কি না পোহাতে হয়।
কুরর্ট পরীক্ষামূলকভাবে অল্প একটু হাসল; তার কর্মকুশলা ও উদারতার জন্য আমার ধন্যবাদ ও অভিনন্দনের জন্য যেন একটু অপেক্ষা করল। আমার মুখের শূন্যময় আতঙ্কের অভিব্যক্তি দেখে সে নিবে গিয়ে থাকবে কারণ সে মিত্রতা এনে ফেলল কথাবার্তায়, মোটের ওপর কোন দুশ্চিন্তা করব না। এসব দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা জীবনে ঘটেই থাকে। এসব খুবই বেদনাদায়ক, বড় অপরিচ্ছন্ন। সে নিজেই এত সুখদায়ক একটা সম্পর্কের, তার অভিজ্ঞতায় সবচেয়ে বেশি সুখদায়ক গুলির অন্যতম, সমাপ্তি ঘটবে বলে খুব বিমর্ষ। হায়! যেহেতু এটা ঘটতেই হবে। উপসংহারে সে বলল যে, সে আশা করে যে আমি বুঝব।
মাথা ঝাঁঝিয়ে আমি উঠে দাঁড়ালাম। খামটা তুলে নিয়ে শেষ বারের মত সেই সোনালি চুল, অধরোষ্ঠ, যা আমি ভালবাসতাম, শক্তিশালী স্বদেশ, দেখে নিলাম এবং চোখে পানি আসছে বুঝতে পেরে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বেরিয়ে দরজাটা আস্তে বন্ধ করে দিলাম।
কুরর্টের সঙ্গে দেখা হবার আগে আমি ছিলাম একটি ডানা ভেঙ্গে যাওয়া বিহঙ্গ। এবার আমার অন্য ডানাটাও গুলিতে জখম হল।
