সোফায় শুয়ে শুয়ে কিছু পড়ছিলাম; সে আমার কাছে এসে হাঁটুর উপর ভর রেখে আমার বুকে মুখ গুঁজে থাকল। ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে বলল, সব শেষ হয়ে গেছে। টিগারসীতেও মিউনিকের একজন বিপত্নীক ডক্টরের সঙ্গে আলাপ হয়েছে। তিনি ওকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন আর সেও তাতে সম্মতি দিয়েছে। এটা ওদের প্রথম দর্শনে প্রেম। কুরর্টের অবশ্যই বোঝা উচিৎ যে এ-রকম ঘটনা কোন মেয়ের জীবনে মাত্র একবারই ঘটে। ক্রুকে তার ক্ষমা করা। উচিৎ এবং ভুলে যাওয়া উচিৎ। সে তার যোগ্যা নয় (আঃ! আবার সেই বিচ্ছিরি কথাটা বলতে বল)। সম্মানিত বন্ধু হিসাবে তারা থাকবে। পরের মাসে বিয়েটা হয়ে যাবে। কুরর্ট চেষ্টা করে তাদের জন্য শুভ প্রার্থনা জানাবে। তোমার অতিদীন ক্রু বিদায় দাও।
কুরর্টের বাহু আমাকে বেষ্টন করেছিল। সে আমাকে মরিয়ার মত আঁকড়ে ধরেছিল।
–এখন তুমি ছাড়া আর আমার কেউ নেই। মৃদু কান্না ভেজা গলায় সে বলল, আমাকে দয়া করো। আমাকে শান্তি দাও।
যতটা সম্ভব বাৎসল্য সহকারে তার চুলে হাত বোলাচ্ছিলাম। এই শক্ত সমর্থ মানুষটার হতাশা এবং আমার ওপর। তার ওই নির্ভরতায় আর্দ্র হয়ে ভাবছিলাম যে কিভাবে ওর আলিঙ্গন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। নিরেট গদ্য গলায় বললাম, আমাকে যদি জিজ্ঞাসা কর তো বলব যে নেহাৎ বরাত জোরে বেঁচে গেছ। ওই রকম অস্থির মতি কোন মেয়ে বৌ হিসেবেও ভাল হতে পারত না। খুঁজলে জার্মানিতে ওর চেয়ে ঢের ভাল মেয়ে পাওয়া যাবে। যেতে দাও, কুরর্ট।
উঠে বসার চেষ্টা করতে করতে বললাম, আমরা বাইরে কোথাও ডিনার খেয়ে, একটা সিনেমা দেখে আসি। এতে ও সব চিন্তা থেকে মনটা বাঁচবে। গতস্য শোচনা নাস্তি। নাও ওঠ কুরর্ট। বেশ কিছুটা জোরে আমি নিজেকে মুক্ত করে নিলাম এবং দুজনেই উঠে দাঁড়ালাম।
মাথা ঝাঁকিয়ে কুরর্ট বলল, ওঃ ভিড়, তুমি যে কি ভাল! তুমি দুঃসময়ের প্রকৃত বন্ধু–আইনে এইটে কামরাডিন– এক সত্যিকারের সুহৃদ। আমি অমন দুর্বলের মত ভাব করব না। তোমার তাহলে লজ্জা লাগবে আমার জন্য। সেটা আমি সহ্য করতে পারব না।
যন্ত্রণাময় একটা হাসি হেসে সে দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। এর মাত্র দু সপ্তাহ পরেই আমরা প্রেমিক প্রেমিকা হয়ে গেলাম। এটা ছিল অনিবার্য। আমি কিছু কিছু বুঝেছিলাম যে এটা কোথায় গিয়ে গড়াবে, তবু নিয়তিকে কোন ছল করে এড়াতে যাইনি। আমি যে ওর প্রেমে পড়েছিলাম, তা নয়, তবে অন্য দিক দিয়ে আমরা পরস্পরের এত কাছে এসেছিলাম যে পরের ধাপে সহবাস ছিল-অবধারিত ও অপ্রতিরোধ্য বাস্তব। তার খুঁটিনাটি বিবরণ নীরস। গালের ওপর সহোদর সুলভ যে হালকা চুম্বনগুলি মাঝেমধ্যে উড়ে আসত, সেগুলি ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল ঠোঁটের দিকে, এবং একদিন মুখের মধ্যে উড়ে এল। এরপর অগ্রসর হওয়ার স্বল্প বিরতি, যে অবকাশ এই জাতীয় চুম্বন আমি মোটামুটি মেনে নিয়েছে। তারপর এল আমার বুকের ওপর মৃদু হস্তক্ষেপ; তারপর শরীরে
সব কিছুই গাঢ় সুখদায়ক, নিবিড় শান্ত ও সম্পূর্ণ নাটকীয়তা বিবর্জিত ছিল; এবং একদিন সন্ধ্যায় আমার বসবার ঘরে ধীরে সুস্থে আমার বস্ত্রহরণ করে আমার দেহকে নিরাবরণ করা হল
–না, তুমি কত সুন্দর তা আমি দেখব। প্রাথমিক দুর্বল নিস্তেজ প্রতিবাদের পরে, ক্রু এর জন্য যে বৈজ্ঞানিক ক্রিয়াকলাপ প্রস্তুত করা হয়েছিল তা আমার ওপর প্রয়োগ করা হল।
আমার নিজের ঘরের আশ্চর্য গোপনীয়তায়, কি সুস্বাদু যে তা লেগেছিল। কি নিরাপদ!
কেমন ব্যস্ততাবিহীন, মন্থর! সতর্কতামূলক ব্যবস্থাগুলি কি স্বস্তিকর! আর কুরৰ্টের গায়ে কি জোর, তবু কত ধীর স্থির আর সর্বোপরি সহবাসের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি স্বর্গীয় নম্রতা।
প্রতিবারের শৃঙ্গার–ক্ষতির পরে একটি করে পুষ্প উপহার। প্রতিটি তীব্র বাসনাত মিলনের পরে ঘর গুছিয়ে পরিচ্ছন্ন করে নেওয়া। অফিসে এবং অন্য লোকের সামনে অনুশীলিত নিখুঁত আচরণ, একটুও বেজাল না–এ যেন একজন শল্যচিকিৎসক শয্যাকালের শ্রেষ্ঠ আচরণ বিধি মেনে, অসাধারণ রমণীয় অস্ত্রোপচারগুলি সম্পাদন করে চলেছেন। অবশ্য এ সমস্ত কিছুই ছিল নৈর্ব্যক্তিক। কিন্তু আমার তা ভাল লাগত।
তারপর অনিবার্যভাবে ঘটনাটি ঘটল। ঠিক যখন থেকে আমরা নিয়মিত সহবাস করতে শুরু করেছি তার কিছু পরেই।
কুরর্ট আমাকে একজন নির্ভরযোগ্য মহিলা ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল যিনি আমাকে গর্ভনিরোধ সম্পর্কে একটি প্রজ্ঞান বক্তৃতা দিলেন, এবং আনুষঙ্গিক বন্দোবস্ত করে দিলেন। কিন্তু তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, এসব সাবধানতাও বেঠিক হয়ে যেতে পারে। আর ঘটেছিলও তাই। প্রথমে, চেপে থাকাই সব চেয়ে ভাল হবে আশা করে, কুরকে কিছুই বলিনি। তারপর, নানান দিক থেকে ভেবে–এই গোপনীয়তাকে এককভাবে বহন করতে চাই না, একটা ভীষণ আলোর আশায় যে সে খুশি হতেও পারে এবং আমাকে বিয়ের প্রস্তাবও দিতে পারে, আমার নিজের অবস্থা সম্পর্কে সত্যি সত্যি আশঙ্কাপোষণ করে–তাকে সব বললাম। তার ওপর এর কি প্রতিক্রিয়া হবে সে সম্বন্ধে আমার কোন ধারণা ছিল না। তবে আমি ভেবেছিলাম তার কাছ থেকে কোমলতা, সহানুভূতি ও অন্তত একটা ওপর ওপর ভালবাসার ছোঁয়া পাওয়া যাবে। বিদায় নেবার আগে সেদিন রাত্রিবেলা আমরা আমার শোবার ঘরের দরজার কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। আমার গায়ে এক টুকরো কাপড়ও ছিল না, সে ছিল দস্তুর মত পোশাক-আষাক পরা। কথাটা বলা শেষ হতেই সে নীরবে তার গলা থেকে আমার দুই বাহুর বেষ্টনী খুলে দিল। আমার আপাদমস্তক রাগ আর ঘৃণা মেশানো দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল এবং দরজার হাতলে হাত রাখল। ঠাণ্ডা চোখে আমার চোখের ওপর চোখ রেখে মৃদুস্বরে বলল, তাহলে? বলে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে দরজাটা আস্তে বন্ধ করে দিল।
