শিগগিরই আমার উপর কুরর্টের এতটা আস্থা জন্মাল যে, একা আমার ওপর অফিসের সব ভার ছেড়ে গিয়ে যেতে লাগল। তখন দারুণ উত্তেজনা, জরুরী বিষয়গুলি নিজের হাতে করতে গিয়ে আমার জেনে রোমাঞ্চ হত, জার্মানিতে বসে কুড়িজন সম্পাদক দ্রুত ও নির্ভুল হবার জন্য আমার ওপর নির্ভর করে আছেন। ক্ল্যারিয়নের আঞ্চলিক অকিঞ্চিৎ করতার চেয়ে এটা অনেক বেশি গুরুত্ব ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ বলে মনে হত আর তাই আমি কুরৰ্টের, নির্দেশ ও সিদ্ধান্তের, কর্তৃত্বের পাশাপাশি সংবাদ সরবরাহ সংস্থার জড়িত সেই জরুরী গন্ধটা বেশ পছন্দ করতাম।
যথাসময়ে সুমান বিয়ে করল আর আমি বুমবারি স্কোয়ারে একখানা আসবাবপত্র সজ্জিত ফ্ল্যাটে উঠে এলাম, ওই বাড়িরই ফ্ল্যাটে কুরর্ট থাকত। একবার মনে হয়েছিল যে এখানে বাসাভাড়া নেওয়াটা কি সমীচীন হল! তবে সে দিনের আচরণ ছিল এমন সঙ্গত এবং আমাদের দুজনের মধ্যেকার পরিস্থিতি বোঝাতে সে সর্বদা অস্পষ্ট শব্দগুলি ব্যবহার করত–যে আমি মনে করতাম আমার অন্তত যথেষ্ট বিচার বিবেচনা হয়েছে।
আমার দিক থেকে কাজটা ভারি বোকার মত হয়ে গিয়েছিল। একই বাড়িতে ফ্ল্যাট নেবার জন্য ওর প্রস্তাব অত তাড়াতাড়ি গ্রহণ করাতে কুরর্ট আমাকে ভুল বুঝতে পারত, এ ছাড়া এটা যখন খুব স্বাভাবিক হয়ে উঠেছিল যে ছুটির পর আমরা দুজনে একসঙ্গে হেঁটে অফিসের কাছেই এই বাড়িটায় ফিরে আসব। এক সঙ্গে নৈশভোেজ সমাধা করাটাও নিত্যনৈমিত্তিক হয়ে দাঁড়াল। শেষদিকে খরচ বাঁচবার জন্য সে তার গ্রামোফোনটা আমার বসবার ঘরে নিয়ে আসত আর আমি আমাদের দুজনের জন্য কিছু রান্নাবান্না করে নিতাম। অবশ্যই আমি বিপদের আশঙ্কা করতাম এবং কয়েকজন কাল্পনিক বন্ধুর সঙ্গে বিকেলটা কাটাবার ওজর দেখাতাম। এর মানে হত একা একা রাত্রির খাওয়া দাওয়া সেরে কোন সিনেমা হলে গিয়ে বসে থাকা, সেখানেও রাতের বেলা একলা যুবতী মেয়ে দেখলেই পুরুষেরা তাকে তোলবার চেষ্টা করবে।
তবে কুরট ছিল এত সঙ্গত ও শালীনতা সম্পন্ন এবং আমাদের পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল এমন সোজাসুজি ও উচ্চস্তরের যৌথ মানসিকতার যে আমার আশঙ্কাগুলি ক্রমশ নির্বুদ্ধিতাসূচক বলে মনে হতে লাগল। আর যতই আমি মিত্ৰতাপূর্ণ জীবনকে গ্রহণ করতে লাগলাম, সেটা শুধু পুরোপুরি সম্ভ্রান্ত কালেই নয়, আধুনিক রীতির প্রাপ্তমনস্ক বলেও মনে হচ্ছিল, আমি আরও বেশি আস্থা ফিরে পেলাম যখন এরকম মাস তিনেক শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পর একবার জার্মানি ঘুরে এসে কুটি আমাকে জানাল যে সে বাগদত্ত হয়ে এসেছে। মেয়েটির নাম ক্রুদ, ওর বাল্যসখী। সে আমাকে যা বলল, তাতে বুঝলাম যে একেবারে রাজযোটক হতে যাচ্ছে। মেয়েটির বাবা হাইডেলবার্গে দর্শনের অধ্যাপক। কুরর্টের হাতে একটা ফটোগ্রাফে তার দুই শ্রান্ত নয়ন, চকচকে দুই লতানো বেনী এবং সুবিন্যস্ত সাজগোজ জীবন্ত দেখাচ্ছিল।
ক্রুদ এর চিঠিগুলি আমাকে তর্জমা করে শুনিয়ে, তাদের ক টি সন্তান হবে সে সম্পর্কে আলোচনা করে লন্ডনের পোস্টে তিন বছরের সীমা পেরোলেই যখন তার হাতে বিয়ের খরচার জন্য যথেষ্ট জমবে তা দিয়ে হামবুর্গে যে ফ্ল্যাটটা তারা কিনবে বলে ঠিক করেছে তার অলঙ্করণ সম্পর্কে আমার পরামর্শ চেয়ে কুরর্ট আমাকে গোটা ব্যাপারটার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে ফেলল। ওদের দুজনের কাছে আমি হয়ে গেলাম একটি সার্বজনীন খালা র মতন কেউ। পেল্লায় দুটি পুতুল নিয়ে বিয়ে বিয়ে খেলার মত, এই নতুন ভূমিকাটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক অথবা মজার বলে মনে না করলে, আমি একে হাস্যকর বলে মনে করতে পারতাম।
কুরর্ট এমনকি তাদের জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলি নিয়ে মনোযোগের সঙ্গে, হতে পারে হয়ত কিছুটা বিকৃতভাবেই আমার সঙ্গে পরিকল্পনা করত। এই আলোচনায় অংশ গ্রহণ করতে প্রথম প্রথম আমার বেশ অস্বস্তি হত, কিন্তু পুরো বিষয়টা সম্পর্কে তার দৃষ্টিকোণ ছিল এমন চিকিৎসা বিজ্ঞানীর মত যে, ওই আলোচনার শিক্ষাগত মূল্যের দিকটা ছিল উঁচুস্তরের। মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে ওরা ভেনিসে (সব জার্মানিরাই ইটালীতে যায় মধুচন্দ্রিমা যাপন করতে) যাবে এবং প্রত্যেক রাতেই মিলিত হবে, কারণ কুর্ট বলল সে সহবাস ক্রিয়া প্রয়োগের ব্যাপারে নিখুঁত করে তোলার জন্য প্রচুর অনুশীলন করা প্রয়োজন। এই জন্য তারা রাত্রিবেলা হালকা খাবার খাবে, কারণ ভরপেটে থাকাটা বাঞ্চনীয় নয়।
রাত এগারটার বেশি দেরি করবে না শুতে যেতে, কারণ কর্মোদ্দম ফিরে পেতে আট ঘণ্টা ঘুম খুব দরকার। সে বলত ক্রুদ্ এর যুবতী সত্তার জাগরণ হয়নি, ফলে যৌনতার ব্যাপার নিরুত্তাপ হয়ে যাবার প্রবণতাই বেশি, সে ক্ষেত্রে সে নিজে ছিল তীব্র যৌনবোধ সম্পন্ন। এজন্য তাকে সংযত থাকতে হবে। এই বিষয়ে নিজেকে সামলাতে হবে। কঠোরভাবে। কারণ, তার কথা অনুসারে সুখী দম্পতি হতে গেলে দুজনের যৌন আবেগের চরম শিখরে দু জনকেই উঠতে হবে একসঙ্গে। এ সব কিছুই কুরর্ট অত্যন্ত প্রাঞ্জল বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় পরিবেশন করত এবং এমনকি টেবিল ক্লথের ওপর কাঁটা চামচের কাঁটা দিয়ে নক্সা ও ছবি এঁকে বোঝাত।
এই বক্তৃতামালা এমন সারগর্ভ ছিল যে আমি স্থির নিশ্চিত হয়েছিলাম যে প্রেমিক হিসেবে কুরর্ট ছিল অত্যন্ত অসাধারণ সূক্ষ্মতা সম্পন্ন। কবুল করতে ভাষা নেই-, ক্রু এর জন্য সুনিয়ন্ত্রিত ও পুরোপুরি স্বাস্থ্যসম্মত পুলকরাজি প্রস্তুত হয়ে আছে। তা শুনে আমি চমৎকৃত ও কিছুটা ঈর্ষাপরায়ণ হয়ে পড়েছিলাম। অনেক রাত্রিই এমন কেটেছে যখন ওই সব অভিজ্ঞাগুলি নিজস্বভাবে পেতে চেয়েছি, চেয়েছি এমন কাউকে, কুরর্টের ভাষা অনুসরণ করে যাকে বলতে পারি এক মহান যৌন শিল্পী যার হাতে দেহ সঁপে দিয়ে বলব, আমারে করো তোর বীণা। আর মনে হয় এটাঅনিবার্য ছিল যে আমার স্বপ্নে ওই ভূমিকায় কুরই অবতরণ করত–অতি নিরাপদ, অতি সুভদ্র, নারীর শরীরের আকুতি সম্পর্কে অতি গভীর রসজ্ঞ। কয়েকমাস অতিবাহিত হয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে ক্রু-এর চিঠিগুলির সুর ও সংখ্যা পরিবর্তিত হতে শুরু করল। আমিই প্রথমে এটা লক্ষ্য করি; তবে কিছুই বলিনি। প্রতীক্ষার সুদীর্ঘ সময় নিয়ে ঘন ঘন তীক্ষ্ণ অনুযোগ। আসতে শুরু করল। চিঠির নিবিড় মধুর অনুচ্ছেদগুলি হয়ে উঠতে লাগল যেমন তেমন করে শেষ করা। টিগারসীর গ্রীষ্মবকাশের সুখস্মৃতি গুলি, যা এর সঙ্গে কুরট এর প্রথম দেখার পর আর উল্লিখিত হল না। তারপর একবার। ক্রুদ এর তিন সপ্তাহব্যাপী নীরবতার পরে একদিন বিকেলবেলা ফ্যাকাশে মুখে অশ্রুসিক্ত আননে কুরর্ট আমার ঘরে এসে হাজির হল।
