এগার নম্বর রোডের কন্ডাক্টরেরা অভিযোগ করেছেন যে ভিড়ের সময় তাদের অনেকক্ষণ ধরে কাজ করতে হয়। তার পেন্সিল দিয়ে এটা কেটে দিয়ে বললেন, জনসাধারণ, জনসাধারণ ও জনসাধারণ, জনসাধারণ! যেভাবে এই খবরটা পরিবেশন করা উচিৎ, তা হল এই রকম?
ফ্র্যাঙ্ক ডোনাল্ডসন, উৎসাহী যুবক, বয়েস সাতাশ। স্ত্রীর নাম ঘেনী। এদের দুটি ছেলেমেয়ে; বিল, বয়েস ছয় এবং এমিলি, বয়েস পাঁচ। এর একটা অভিযোগ রয়েছে। দেখা হতেই বললেন, গরমের ছুটির পর থেকে কোনদিন আর বিকালবেলা ছেলেমেয়েদের সঙ্গে দেখা হয় না। ৩৬ নম্বর বোল্টন লেনের পরিচ্ছন্ন বসবার ঘরে বসে ভদ্রলোক বলে চললেন আজকাল যখন ডিউটি থেকে ফিরি, ওরা তখন ঘুমিয়ে পড়েছে। দেখুন, আমি এগার নম্বর রোডের একজন কন্ডাক্টর এবং নতুন সময় তালিকা চালু হওয়া যাবৎ আমাদের নিয়মিত একঘণ্টা বেশি খাটতে হয়।
বলে লেন থামলেন।
-কি বোঝাতে চাইছি, দেখেছ? বাসগুলি চালাচ্ছে জনসাধারণ। বাসগুলির চেয়ে তারা অনেক বেশি চিত্তাকর্ষক। এখন বেরিয়ে পড়ে একজন ফ্রাঙ্ক ডোনাল্ডসনকে খুঁজে বার কর এবং ওই গল্পটাকে প্রাণ দাও।
সস্তা জিনিস। মামুলী দৃষ্টিভঙ্গি! কিন্তু এই হচ্ছে সাংবাদিকতা–যা আমার জীবিকা। আর তিনি যা বলতেন, আমি তাই করতাম এবং আমার লেখা সম্পর্কে চিঠি লিখতেন কাছে পিঠের এলাকা থেকে ডোনাল্ডসনরা, তাঁদের স্ত্রীরা, তাদের সঙ্গীরা। সম্পাদকরা চিঠিপত্র আসাটা ভালবাসেন। এরাই একটা কাগজের ব্যস্ত চেহারা ফুটিয়ে তোলে, পাঠক বাড়ায়।
আরও দু বছর, একুশ পূর্ণ হয়ে যাবার কিছু পর অবধি, আমি ক্ল্যারিয়নে কাজ করলাম। এর মধ্যে আমি ন্যাশনাল এক্সপ্রেস মেল প্রভৃতি কাগজের পক্ষ থেকে চাকরি নেবার আমন্ত্রণ পাচ্ছিলাম। আমারও মনে হচ্ছিল সে সাউথ ওয়েস্ট ৩ এলাকার বাইরে বেড়িয়ে জগতে এবার পর্দাপণ করা উচিৎ। তখনও সুমানের সঙ্গে থাকি। বিদেশ দপ্তরে যোগাযোগ বিভাগে সে কাজ করে। কাজটা সম্পর্কে বা ওই বিভাগের যে ছেলেটি ওর বন্ধু তার সম্পর্কে সুমান গোগাপনীয়তা বজায় রেখে চলে। তবে আমি জানি যে খুব শিগগীরই ওরা বাগদত্ত হবে এবং পুরো ফ্ল্যাটটাই চেয়ে বসবে।
আমার ব্যক্তিগত জীবন শূন্য–ভেসে যাওয়া বন্ধুত্ব এবং প্রেম প্রেম ভাব–যা থেকে বরাবর আমি নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছি। একটি পোত্ত, হয়ত সফল, জীবিকায় উন্নতিকামী মেয়েতে পরিণত হবার আকাঙ্ক্ষা করা চলত আমার সম্পর্কে যে খুব বেশি সিগারেট খায়, অনেক ভদ্কা ও টনিক গেলে আর একা একা বসে টিনের খাবার খায়।
তারপর মিউনিকের বাবোক উৎসবের সাহায্যার্থে আয়োজিত একটি প্রেম শোতে আমার সঙ্গে ভি, ডরু, জেড় এর রাইনার সঙ্গে আলাপ হল।
.
ডানাভাঙা পাখি
ভি, ডব্লু, জেড বা ফেরারবান্ট ভেডয়টচার জাইটুঙ্গেন হল পশ্চিম জার্মানির সংবাদপত্র সমূহের একটি সমবায় প্রতিষ্ঠান কর্তৃক অর্থ সাহায্য প্রাপ্ত রয়টরের মতই একটি সংবাদ সরবরাহ প্রতিষ্ঠার। লন্ডনে কুরর্ট রাইনার এই প্রতিষ্ঠানের প্রথম প্রতিনিধি এবং আমার সঙ্গে আলাপ হবার সময় দ্বিতীয় এমন একজনকে সে খুঁজছিল যে স্থানীয় সংবাদপত্র ও সাপ্তাহিক থেকে জার্মানির স্বার্থ সংক্রান্ত খবরাখবর জোগাড় করতে পারে, যাতে সে উচ্চ স্তরের কূটনীতিক তথ্যগুলির দিকে নজর দিতে পারে। বাইরের দায়িত্বগুলি নির্বাহ করতে পারে।
সেদিন রাত্রিবেলা সে আমাকে শার্লট স্ট্রিটে স্মিৎ-এ-ডিনার খেতে নিয়ে গেল। নিজের কাজের গুরুত্ব সম্বন্ধে এবং জার্মান সম্পর্কের ক্ষেত্রে তার কাজের ভূমিকার বিষয়ে সে বেশ সুন্দরভাবে সচেতন। শক্তসমর্থ রোদ বৃষ্টি সওয়া চেহারার একজন যুবক, যার সুন্দর চকচকে চুল, নির্ভীক দুই নীল চোখের জন্য তাকে তার তিরিশ বছর বয়েসের চেয়ে কম মনে হত।
সে আমাকে বলেছিল যে মিউনিকের কাছে ওগসবার্গ-এ তার বাড়ি; সে বাবা-মার একমাত্র সন্তান। তার বাবা-মা দু জনেই ছিলেন ডাক্তার; নাৎসীদের বন্দীশিবির থেকে আমেরিকানরা তাদের দু জনকে উদ্ধার করেছিল। মিত্রশক্তির বেতার শোনার জন্য এবং তরুণ কুরর্টকে হিটলারের যুব আন্দোলনে যোগ দিতে না দেবার জন্য তাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। তার শিক্ষা মিউনিক উচ্চ বিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর সাংবাদিকতায় স্নাতক হয়ে, পশ্চিম জার্মানির শ্রেষ্ঠ সংবাদপত্র ডি ভেল্ট এ যোগ দেয়, সেখান থেকে ইংরাজিতে তার ভাল দখল থাকায় লন্ডনের এই কাজটার জন্য তাকে মনোনীত করা হয়।
আমার কাজ সম্বন্ধে জানতে চাওয়ায় পরদনি চ্যান্সেরী লেন-এ-তার দু কামরার অফিসে গিয়ে আমার কাজের কিছু নমুনা তাকে দেখালাম। নিজস্ব পুঙ্খানুপুঙ্খ ধরনের, তার প্রেস ক্লাবের বন্ধুদের কাছ থেকে আমার সম্পর্কে প্রয়োজনীয় খবর টবর ইতিমধ্যে জোগাড় করে নিয়েছিল, এবং এক সপ্তাহ পরে দেখলাম যে, তার পাশের কামরায় আমি বসে আছি, সঙ্গে রয়েছে একজন ব্যক্তিগত সহকারী–আমার টেবিলের পাশে রয়টার এবং এক্সচেঞ্জ টেলিগ্রাফের দূরমুদ্রণী অনবরত টকটক করে খবর পাঠিয়ে চলেছে। মাইনেটা দারুণ–সপ্তাহে ত্রিশ পাউন্ড। শিগগিরই এই নতুন কাজটাকে আমি পছন্দ করে ফেললাম, হামবুর্গে আমাদের সদর দপ্তরের সঙ্গে দিনে দু বার টেলেক্সে যোগাযোগ কর, যাতে প্রভাতী ও সান্ধ্য জার্মান দৈনিকগুলির প্রকাশের আগেই বার্তা প্রেরণ করা যায়। জার্মান ভাষায় আমার অজ্ঞতা প্রায় কোন অসুবিধারই সৃষ্টি করত না, কারণ টেলিফোনে কুরর্টের কাছ থেকে প্রেরিতব্য যে সব বার্তার অনুলিপি পেতাম। তাছাড়াও আমার কর্মচারিরা টেলিফোনে খবর পাঠাত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে, যা অপর প্রান্তের ভারপ্রাপ্ত অপারেটার অনুবাদ করে নিত। হামবুর্গে দূর মুদ্রণীয় কর্মীরও ইংরেজি ভাষার জ্ঞান ততটুকু ছিল, যাতে আমি এ প্রান্তে যন্ত্রটা চালাবার সময়, তারা আমার সঙ্গে টুকটাক কথাবার্তা চালাতে পারত। কাজটা নিষ্প্রাণ যান্ত্রিক হলেও এতে খুব ক্ষিপ্ত ও নির্ভুল হওয়া দরকার; আর প্রকাশের কয়েকদিন পর, বিভিন্ন জার্মান সংবাদপত্র থেকে আমার প্রেরিত সংবাদগুলির কর্তিত অংশের সঙ্গে মূল পাণ্ডুলিপি মিলিয়ে কাজের সাফল্য ব্যর্থতার একটা চেহারা দেখতে পাওয়াও বেশ মজার। ব্যাপার ছিল।
