তা আমার হৃদয়কে খান্খা করে ভেস্তে দিতে মাত্র ঠিক দশ মিনিট লেগেছিল এবং তাকে সারিয়ে তুলতে ছ-মাস।
অপরের যন্ত্রণা ও বেদনার কাহিনী সবাইয়ের কাছেই এক রকম মনে হয়–যে তা কাউকে আগ্রহী করে তোলে না। তাই আমি খুঁটিনাটি বাদ দিয়ে যাচ্ছি। এমন কি সুমানকেও বলিনি। যা দেখছি তা হচ্ছে এই যে প্রথম দিনের সেই সন্ধ্যাটিতেই আমি ভবঘুরে পথিকের মত আচরণ করেছিলাম এবং সে ভাবেই আমাদের দেখা হয়েছে। ইংল্যান্ডের এই সঙ্কীর্ণ অনুদার জগতে আমি ছিলাম ক্যানাডীয় আর সেজন্য পরদেশী, বহির্দেশীয়–চমৎকার লীলাখেলা। এটা যে ঘটতে যাচ্ছে এই অঙ্কটা আমি দেখিনি। সেটাই আমার পক্ষে বেশি নির্বুদ্ধিতার কাজ। সেদিনের মেয়ে! দুনিয়াকে চিনে নাও, নয়ত আবার তুমি আছাড় খাবে। এই চক্ষুষ্মন উত্থিত সুখ খুশি পরায়ণতার মধ্যেও আমার ভেতরের মেয়েটা বিনীতভাবে গুমরে গুমরে কাঁদতে। একটা সময় রাত্রিতেও আমি কাঁদতাম যেন তিনি ডেরেককে ফিরিয়ে দিন। আমার কাছে, প্রার্থনা সফল হয়নি। আর তার চিঠির সংক্ষিপ্ত কোন প্রাপ্তিস্বীকার পাঠাতে বা ফরচুনের দোকানে শ্যাম্পেনের বোতলগুলি ফেরৎ দিতে আমার সম্মানে লাগল। যা যা পড়ে ছিল তা হল ইস্পটি সম্প্রদায়ের সুরলহরীর তীব্র স্মৃতি আর উইন্ডসর হিলের সিনেমার সেই দুঃস্বপ্ন, যার স্মৃতি, মনে হয়, সারাজীবন ধরেই আমাকে ভারাক্রান্ত করে রাখবে।
কপালটা ভাল ছিল। যে চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলাম, বন্ধুর বন্ধু তস্য বন্ধুর মারফৎ সেটা পেয়ে গেলাম। কাজটা চেনসী ক্ল্যারিয়ন নামে একটা ছোট্ট স্থানীয় পত্রিকায়। ছোট ছোট বিজ্ঞাপন ছাপত কাগজটা। লন্ডনের দক্ষিণ পশ্চিমে এলাকার মানুষদের বাড়ি-ঘর-ফ্ল্যাট ভাড়া বা গৃহভৃত্য সংক্রান্ত কর্মখালি ও কর্মপ্রার্থীদের বিজ্ঞাপনের একরকম বাজারের কাজ করত কাগজটা। নতুন বালবের বিদ্যুটে মান। এগার নম্বর রোডে বাসের স্বল্পতা, দুধের বোতল চুরি–এসব স্থানীয় সমস্যা নিয়ে লেখা সম্পাদকীয় কয়েক পাতা জুড়ে থাকত।
আর থাকত একটা পুরো পাতা ভর্তি স্থানীয় গুজব সমাচার-চেলাসী সম্পকেই বেশির ভাগ খবর থাকত এবং এটা অনেককেই আকর্ষণ করত। কোন রকম মানহানির মামলা মোকদ্দমা এড়িয়ে চলত পত্রিকার ওই বিভাগটি। এ ছাড়া সাম্রাজ্যের অনুগত শ্ৰেণী, যা আশেপাশের আঞ্চলিক রাজনীতিক ধারার সঙ্গে হুবহু খাপ খেয়ে যেত, প্রভৃতি বিষয়ে চোখাচোখা সম্পাদকীয় লিখত। পিমলিকোতে বাষ্পীয় যুগের মান্ধাতা আমলের ছাপাখানায় যে সব পুরানো ধাঁচের অক্ষরের ছাঁচ রয়েছে সেগুলি থেকে হারলিং বলে একজন কারিগর প্রত্যেক সপ্তাহেই (কাগজটি ছিল সাপ্তাহিক) নতুন নতুন কায়দায় অক্ষরের ছাঁচ তৈরি করত। মোটের ওপর ছোটর মধ্যে কাগজটা ছিল বেশ ভাল, সেজন্য কর্মীরাও একে এত পছন্দ করত যে যৎকিঞ্চিত মাসোহারার বিনিময়ে বা কিছু ছাড়াই, আগস্ট মাস ছুটির দিনগুলির (যখন বিজ্ঞাপন ভাল পাওয়া যেত না) মত সময়েও কাজ করে চলত।
আমার মাইনে ঠিক হল সপ্তাহে পাঁচ পাউন্ড তৎসহ যেসব বিজ্ঞাপন জোগাড় করতে পারব তার ওপর কমিশন (গুরুত্বপূর্ণ না হলেও উল্লেখযোগ্য যে ওখানে ট্রেড ইউনিয়ন বলে কিছু ছিল না)। কাজেই আমি নিঃশব্দে ভগ্ন হৃদয়কে একত্র করে নিলাম পাঁজরার খাঁচায় এবং নিঃসঙ্গ ভাবেই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার জন্য সিদ্ধান্ত নিলাম। বুদ্ধির সাহস এবং জুতার সুকতলার উপরই নির্ভর করে এই ইংরেজ উন্নাসিকদের দেখিয়ে দেব যে যদি জীবনে ওদের সঙ্গে চলতেও আমি পারি, তবু ওদের সমাজ থেকে আমি আমার জীবিকা অন্তত উপার্জন করে নিতে পারি। তাই আমি দিনের বেলা কাজ করতে যেতাম এবং রাত্রিবেলা কাঁদতাম। এভাবে আমি কাগজের খুব সক্রিয় কর্মচারি হয়ে উঠলাম।
কর্মীদের জন্য চা তৈরি করতাম, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় যোগ দিতাম। শোকাহতদের তালিকা ঠিকঠাক করতাম। গুজব সমাচারের জন্য সূচিমুখ অনুচ্ছেদগুলি লিখতাম, প্রতিযোগিতার কলমগুলি চালাতাম, এমন কি শব্দছকের সূত্রগুলি পর্যন্ত কম্পোজ হবার আগে দেখে দিতাম। এর ফাঁকে ফাঁকে আশেপাশের এলাকা চষে কাটখোট্টা দোকানী, হোটেলওয়ালা, রেস্তোরাঁগুলির কাছ থেকে চমৎকার চমৎকার বিজ্ঞাপন জোগাড় করে এনে দিয়ে বুড়ো স্কচ অ্যাকাউন্টেন্টের কাছে। আমার কমিশনের শতকরা কুড়িভাগ জমাতে লাগলাম। শিগগিরই ভাল আয় হতে লাগল–সপ্তাহে বার থেকে কুড়ি পাউন্ড এবং সম্পাদক ভাবলেন যে আমাকে সপ্তাহে পনের পাউন্ড করে মাইনে দিয়ে পাকাপাকিভাবে নিয়োগ করলে কাগজের আর্থিক দিকেই সাশ্রয় হবে, তাই তিনি নিজের ঘরের পাশে ছোট একটা কুঠুরিতে আমার বসার বন্দোবস্ত করে তার সম্পাদকীয় সহকারী হিসাবে আমাকে বহাল করলেন। এই পদে কাজ করার অন্যতম সুবিধা ছিল তাঁর শয্যাসঙ্গিনী হতে পারার সুযোগ পাওয়া। কিন্তু শরীরের পশ্চাদ্ভাগে প্রথম চিমটি কাটা বুঝতে পেরেই আমি তাকে সাফসুফ বলে দিয়েছিলাম যে কানাডায় একজন ভদ্রলোকের আমি বাগদত্তা। শুনে তার চোখের চেহারা পালটে ভীষণ হয়ে গেল এবং গটমট করে বেরিয়ে গেলেন।
তা সে যাই হোক, সম্পাদকের সহকারী হিসাবে নতুন চাকরিতে আমি স্থিতি হয়ে বসলাম। ছুটোছুটি করার কাজের চেয়ে লেখার কাজই আমাকে বেশি দেওয়া হতে লাগল। এখানে কাজ করার এক বছর পরে যথাসময়ে অন্য একটি শাখায় চলে গেলাম এবং ভিভিয়েন মিশেল একজন গন্যমান্য লোক হয়ে গেল। আমার মাইনে বেড়ে হল বিশ গিনি। যেরকম নির্ভীকভাবে আমি মানুষের বিচার করতাম ও যেভাবে সব কিছুর সঙ্গে চলতাম, তা যেন ভারি পছন্দ করতেন। তিনি আমাকে লেখা সম্পর্কে অনেক কিছু কৌশল শিখিয়েছিলেন, পাঠককে প্রথম অনুচ্ছেদ থেকেই তীব্রভাবে আকৃষ্ট করতে হয়, ছোট ছোট বাক্য ব্যবহার করা, চালচুলোহীন নিকৃষ্ট কথ্য ভাষা পরিহার করা, এবং সর্বোপরি জনসাধারণ সম্পর্কে লেখা। এটা তিনি এক্সপ্রেস কাগজ থেকে শিখেছিলেন এবং সব সময় আমার মাথায় ঢোকাবার জন্য আউড়ে চলতেন।
