হে সৃষ্টিকর্তা, কি সব ঘটছে।
তারপরেই সূচিমুখ এক ঝলক যন্ত্রণা…একটুখানি ঝাঁকিয়ে ওঠা…আমি চট করে দম বন্ধ করে রইলাম। দেখি সে আমার বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে।
আমি দুহাত দিয়ে ওকে বেষ্টন করলাম। হাতে ওর ভেজা শার্টটি লাগল।
ওভাবে আমরা অনেকক্ষণ শুয়েছিলাম।
গাছের শাখা প্রশাখার ভিতরে দিয়ে চুঁইয়ে চুঁইয়ে জ্যোত্সা ঝরে পড়ছিল। আমি অশ্রুজল থামাতে চেষ্টা করলাম।
তবে এই ব্যাপার?
মহান মুহূর্ত–যাকে আর পাওয়া যাবে না। এখন আমি নারী–অনাঘ্রাতা বালিকাটি রূপান্তরিত হয়েছে।
কই সুখ কোথায়–ওরা যেমন বলে, শুধু কষ্ট পাওয়া। কিন্তু কিছু থেকে যায়। আমার বাহুপাশে ধরা দেওয়া এই পুরুষটি। আমি তাকে শক্তভাবে আঁকড়ে ধরলাম। আমি তার, সম্পূর্ণভাবে তার, সে আমার, সে আমার। সে আমার ভার নেবে। আমরা দুজনে দুজনার। আর নিঃসঙ্গতা আমাকে পীড়ন করবে না। আমরা এখন থেকে যুগলবন্দী। ডেরেক আমার গালে চুমু খেল। আস্তে উঠে দাঁড়াল। হাত বাড়িয়ে দিল, স্কার্টের ঘাগরা নামিয়ে দিলাম। ও আমার হাত ধরে তুলে দাঁড় করিয়ে দিল। আমার মুখের দিকে তাকাল। ওর অল্প অল্প হাসিতে অস্বস্তি মাখা ছিল।
তোমার লাগেনি তো?
না। তোমার ঠিকঠাক হয়েছে তো?
ও হ্যাঁ, তাতো বটেই!
সে ঝুঁকে পড়ে কোটটা তুলে নিয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল।
আরে, ট্রেন আসতে আর পনের মিনিট মাত্র বাকি। এখন রওনা হওয়াই ভাল।
স্থলিত পায়ে হেঁটে রাস্তায় এলাম। চলতে চলতে চুলে একটা চিরুনি চালিয়ে নিলাম। স্কার্টটা ঝেড়ে নিলাম। আমার পাশে পাশে ডেরেক নিঃশব্দে হাঁটছিল। চাঁদের আলোয় ওর মুখ এখন স্তব্ধ। ওর হাত জড়িয়ে ধরলেও সে কোন সাড়া দিল না আমার হাতে চাপ দিয়ে। আহা! যদি একটু ভালবাসার কথা এখন বলে, আমাদের পরবর্তী সাক্ষাৎকার সম্বন্ধে কিছু। কিন্তু বুঝলাম সে যেন হঠাৎই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে, কি শীতলতা! এ সব ব্যাপারের পরে পুরুষদের মুখে অভিব্যক্তি সম্পর্কে আমার কোন অভিজ্ঞতাই ছিল না। নিজেকেই দোষারোপ করলাম, যথেষ্ট উপভোগ্য হয়নি ব্যাপারটা। আমি চেঁচিয়ে ছিলাম, ব্যাপারটা একেবারে নষ্ট করেই দিয়েছি।
গাড়ির কাছে এসে উঠে আমরা নিঃশব্দে স্টেশনের দিকে চললাম। প্রবেশ পথের কাছে ওকে থামাতে বললাম। হলদে আলোয় ওর মুখের রেখাগুলি টানটান ও ক্লিষ্ট দেখাচ্ছিল। আধখোলা চোখে ও আমার দিকে তাকাল। আমি বললাম, তুমি ট্রেনের কাছে যেও না। আমি দেখে যেতে পারব। পরের শনিবার কি হবে? আমি অক্সফোর্ড যেতে পারি। নয়ত একটু ঠিকঠাক না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে নাকি।
ভিড়, মুশকিল হচ্ছে এই যে, অক্সফোর্ডে সব আলাদা ব্যাপার। দেখি কি হয়। আমি তোমাকে চিঠিতে জানাব।
নিজেকে বাঁচিয়ে ও বলল।
ওর মুখের অভিব্যক্তির অর্থ বুঝতে চেষ্টা করছিলাম। সচরাচর আমাদের বিদায় মুহূর্তগুলি যেমন ছিল, তা থেকে এবারেরটা একেবারে আলাদা ধরনের। হয়ত সে ক্লান্ত। সৃষ্টিকর্তা জানেন আমিও তো! আমি বললাম, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। তবে লক্ষ্মীটি, চিঠি দিতে দেরি করো না যেন। তুমি কেমন আছ জানার জন্য চিন্তা করব। কাছে গিয়ে ওকে চুমু খেলাম। ওর ঠোঁটে কোন সাড়া জাগল না। ও মাথা ঝাঁকাল, ভিড় তবে ততদিন…
এক ধরনের কষ্টকর হাসি মুখে ফুটিয়ে ও ফিরে গিয়ে গাড়িতে উঠল।
দু সপ্তাহ পরেই আমি সেই চিঠি পেলাম। দু-দুবার চিঠি দিয়েছি। উত্তর পাইনি। মরিয়া হয়ে একবার টেলিফোন করেছিলাম কিন্তু যে লোকটি ধরেছিল সে একটু পরেই এসে বলল যে মিস্টার ম্যালাবী বাড়ি নেই।
চিঠিটা শুরু হয়েছিল এভাবে ও প্রিয় ভিড়, এই চিঠি পড়তে অন্য রকম লাগবে। এই অবধি পড়ে আমি শোবার ঘরে ঢুকে দরজায় ছিটকিনি এটে, বিছানায় বসে সাহস সঞ্চয় করলাম। চিঠিতে তারপর ছিল–এই প্রথম চমৎকার ভাবে কেটেছিল গ্রীষ্মটা। সে আমাকে কোনদিন ভুলবে না। কিন্তু এখন তার জীবনের গতি বদলে গেছে। মেয়েদের সঙ্গে মেলামেশার সুযোগ কম। ওর বাবা মাকে আমার কথা বলেছে। কিন্তু এই প্রণয়ের ব্যাপার তারা অনুমোদন করেননি। তারা বলেছেন যে, যদি কোন মেয়েকে বিয়ে করবে না বলে ঠিক কর, তবে তার সঙ্গে মাখামাখি করাটা ন্যায়সঙ্গত নয়। তারা ভয়ঙ্কর দ্বীপকেন্দ্রিক মনোভাব পোষণ করেন। আশঙ্কা হয় পরদেশীদের সম্পর্কে তাদের হাস্যকর ধারণা রয়ে গেছে, যদিও সৃষ্টিকর্তা জানেন যে তোমাকে আমি ঠিক অন্য যে কোন ইংরেজ মেয়ের মতই মনে করি আর তুমি জান যে তোমার জীবনের স্বরসত আমি ভীষণ পছন্দ করি। ওঁদের গ্রামের বাড়ির জনৈক প্রতিবেশীর কন্যার সঙ্গে ওর বিয়ে ওঁরা ঠিক করে রেখেছেন। আমি যে এ ব্যাপারে তোমাকে কিছুই বলিনি সেটা আমার পক্ষে ভারি দুষ্টুমি হয়ে গিয়েছিল। আসল ব্যাপার হল এই আমরা প্রণয় বাগদত্তাই ছিলাম। একসঙ্গে আমাদের সময়টা এমন চমৎকার কাটছিল এবং এমন সুচাৰু লীলাসঙ্গিনী তুমি ছিলে, যে এই সব কিছুকে নষ্ট করে দিতে আমি চাইনি। সে লিখেছিল যে সে আশা রাখে আবার একদিন আমরা দুজনে দুজনের মধ্যে ডুব দেব ইতিমধ্যে আমাদের প্রথম দেখার স্মারক হিসাবে সে ফরচুন কে বলেছে যাতে আমাকে এক ডজন সর্বোকৃষ্ট গোলাপি শ্যাম্পেনের বোতল পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এবং আমি আশা করি যে, এই চিঠি তোমাকে খুব বেশি বিচলিত করে তুলবে না ভিড়, কারণ আমি প্রকৃত অর্থেই মনে করি যে, তুমি এক আশ্চর্য মেয়ে সবচেয়ে আশ্চর্য মেয়ে, আমার মত কোন লোকের পক্ষে অনেক অনেক ভাল। মনোহর স্মৃতিপুঞ্জ ও অজস্র ভালবাসার সঙ্গে–ডেরেক।
