আরো ঝঞ্ঝাট! আরো মিথ্যার ঝুড়ি। আমি দমবন্ধ করে বললাম, হ্যাঁ। তারপর গাড়িতে উঠে ডেরেকের পাশের সিটে বসে পড়লাম। সার্জেন্ট ভদ্রলোক চতুর দৃষ্টিতে আমাকে দেখে দত্ত পাটি বিকশিত করে হাসলেন-ঠিক আছে। তবে পরের বার মনে রাখবেন এই উহভসর হিলে গাড়ি দাঁড় করাবার নিয়ম নেই। এমন কি ওরকম জরুরী কাজের অজুহাতেও নয়।
ডেরেকের উদ্দেশ্যে কথাগুলি বলে তিনি গোঁফে আঙুল বুলাতে লাগলেন। সার্জেন্টকে ধন্যবাদ জানিয়ে এবং একটা বাজে রসিকতার রস পেয়েছে এমনভাবে চোখ টিপে, ও গাড়িতে গিয়ার দিল। শেষ পর্যন্ত আমরা রেহাই পেলাম।
একেবারে নিচের আলোকমালার ওখানে গিয়ে ডানদিকে মোড় না নেওয়া পর্যন্ত ডেরেক একটাও কথা বলেনি। প্রথমে ভেবেছিলাম যে ও আমাকে স্টেশনে পৌঁছে দিতে যাচ্ছে; কিন্তু দেখলাম ও ডাচেট রোড ধরেই এগিয়ে চলেছে! স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বলল–ফুঃ! একেবারে কানের পাশ দিয়ে তীর গেছে। ভেবেছিলাম একটা ঝামেলায় পড়ব। আগামীকালের কাগজে বাবা-মার পড়ার মত চমৎকার একখানা খবর বটে। আর অক্সফোর্ডেও অনায়াসেই এটা যেতে পারত।
-মারাত্মক, ভয়ঙ্কর ব্যাপার!
বলতে গিয়ে আমার গলায় এত বেশি আবেগ ফুটল যে ও আড়চোখে আমার দিকে তাকাল। তা বেশ। সত্যিকারের ভালবাসার পথ এবং অন্যদিকে ওই সব কাঁটা। ওর কণ্ঠস্বর বেশ সহজ ও হাল্কা শোনাল।
ও সামলে নিয়েছে। আমি যে ছাই কখন পারব ও কথার কথা বলছে এমনভাবে বলল, ধ্যাত্তেরী, লজ্জার নিকুচি করেছেবল? এখন আমরা সব ঠিকঠাক করে নেব।
গলায় বেশ উৎসাহ ঢেকে বলল, তোমাকে যা বলছি। ট্রেন আসতেই তো এখন একঘণ্টা দেরি আছে। এ সময়টা নদীর পাড়ে বেড়াই না কেন। উইন্ডসরের যুগলদের বেড়াবার জন্য এই জায়গাটা বেশ নামকরা। সম্পূর্ণ গোপন ও ব্যক্তিগত। সবকিছু এবং সময়, ওসব নষ্ট করতে মায়াই লাগে। আর আমুরা তো এখন মন স্থির করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
আমার মনে হল ওসব মানে সেই জিনিসটা যেটা ও কিনে এনেছিল।
আমি একেবারে থ মেরে গেলাম। তাড়াতাড়ি বললাম, ওঃ। কিন্তু আমি আর পারি না, ডেরেক! সত্যিই, পারি। যা হয়ে গেল তা যে আমার কি ভয়ানক ভাবে লেগেছে, সে সম্পর্কে তোমার কোন ধারণা নেই।
চট করে আমার দিকে তাকিয়ে ও বলল, কি বলতে চাইছ? ভয়ানক শরীর খারাপ লাগছে, না অন্য কিছু হয়েছে?
–ওঃ তা না! এটা শুধু এই, যে ঘটনাটা বিশ্রী। শুধু ধোঁকাবাজি।
–ও তাই বল। ওর গলা বিদ্রুপাত্মক শোনাল। আমি তো সেটা কাটিয়ে উঠেছি; তাই না? এস। আরে মজা নিতে পারছ না!
আবার?
কিন্তু আমি চাইছিলাম সান্তনা পেতে, ওর বাহুবেষ্টনের মধ্যে স্বস্তি পেতে। যদিও ওর সবকিছুই গণ্ডগোল হয়ে গেছে। তবে ও আমাকে ভাল যে বাসে সেটা ঠিক। তবু আবার আগের মত সব কিছু করতে হবে, এটা ভাবতেই আমার পা কাঁপতে শুরু করল। আমি দুহাত দিয়ে দু হাঁটু চেপে ধরলাম। সেই কাঁপুনি থামাতে। দুর্বল গলায় বললাম, আচ্ছা, বেশ…।
-ওই তো আমার লক্ষ্মীটি!
আমরা সেতু পেরিয়ে গেলাম; ডেরেক গাড়িটাকে এক পাশে এনে রাখল। বেড়া টপকাতে আমাকে সাহায্য করল। বেড়ার ওপাশের মাঠে নেমে ও আমাকে বাহু বেষ্টনে জড়িয়ে নিয়ে চলল নদীর ধার ঘেঁষে গুন টানার সরু পথ দিয়ে, উইলো গাছের নিচে নোঙর করা কয়েকটা বজরা পেরিয়ে যেতে যেতে বলল, আমাদের যদি এ-রকম একটা থাকত। একটার মধ্যে ঢুকে পড়লে কেমন হয়? তুলতুলে নরম জোড়া বিছানা। কাবার্ডে সম্ভব কিছু মালও আছে।
এই ডেরেক, না! অনেক ঝঞ্ঝাট হয়ে গেছে। আমি কল্পনায় একটা চড়া গলা শুনতে পেলাম…কি হচ্ছে ওখানে? এই বজরাটা কি তোমাদের সম্পত্তি নাকি, আঁ? বেরিয়ে এস, চেহারাটা একটু দেখাও দেখি চাঁদেরা।
ডেরেক হেসে উঠল, হয়ত তুমিই ঠিক বলেছ। যাই হক ঘাসও তো একই। দেখ, চমৎকার লাগবে। তখন আমরা সত্যিকারের প্রেমিকা হব।
-হ্যাঁ সেই ভাল, ডেরেক। তবে একটু বুঝেসুঝে, আস্তে। কেমন, মনে থাকবে তো? প্রথম বার অনভিজ্ঞতার জন্য আমি তো আর ভাল পারব না।
ডেরেক মুঠো চেপে আমাকে ধরল, মোটেও ভেব না। তুমি দেখ।
আগের চেয়ে ভাল লাগছিল। শক্তি ফিরে পাচ্ছিলাম। চাঁদনী রাতে ওর সঙ্গে বেড়াতে ভারি ভাল লাগছিল। মাথার উপর ঝুপসী হয়ে কয়েকটা গাছ রয়েছে। আমার মন বলল ওখানেই কাজটা করা হবে। ওর জন্য আমি অবশ্য অবশ্যই কাজটাকে এবার সহজ এবং তৃপ্তিকর করে তুলব। আমি কিছুতেই উজবুকের মত হব না! কান্নাকাটি করব না।
ওই বৃক্ষপুঞ্জের মাঝখান দিয়ে পথটা চলে গেছে। ডেরেক চারপাশটা দেখে নিল তারপর বলল, ওর ভেতরেই, বুঝলে। আমি আগে যাচ্ছি। মাথা নিচু করে আমার পেছন পেছন এস। ডালপালার নিচ দিয়ে আমরা গুঁড়ি মেরে এগোচ্ছিলাম। যাবার জন্য ছোট্ট একটা জায়গা পরিষ্কার রয়েছে। অন্যেরা আগে এসেছে এখানে। একটা সিগারেটের প্যাকেট, একটা কোকাকোলার খালি বোতল পড়ে রয়েছে। শ্যাওলা ও পাতাগুলি দলিত পিষ্ঠ। আমার মনে হল যে ওটা যে বেশ্যা বাড়ির বিছানা, যেখানে শয়ে শয়ে, হয়ত হাজারে হাজারে প্রেমিক প্রেমিকারা দেহভার স্থাপন করে। সুরভি দ্বৈরথে লিপ্ত হয়েছে। এখানে আর ফিরে যাওয়ার কোন উপায় নেই। এই ব্যাপারের জন্য অন্তত কুঞ্জটি নিশ্চয়ই ভাল।
ডেরেক অধীর হয়ে পড়েছিল। সে তার কোটটা খুলে আমার জন্য পেতে দিল, এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শুরু করে দিল। প্রাণ জ্বরগ্রস্তভাবে তার হাত দিয়ে আমাকে যেন গোগ্রাসে গিলছিল। আমি একটু পিছন হবার চেষ্টা করলাম। কিন্তু স্নায়ু তখনো জমাট বেঁধে ছিল। আমার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ কাঠ কাঠ হয়েছিল। ভারি ইচ্ছা হচ্ছিল যদি কিছু শুনতাম, কিছু মিষ্টি প্রণয় প্রলাপ। কিন্তু ও একাগ্র হয়ে নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে চলছিল, আমাকে যাচ্ছেতাই ভাবে, প্রায় পাশবিকভাবে, পীড়ন করে, যেন আমি একটা বয়স্কা ধুমসো যুবতী।
