দরজাটা ফাঁক হল এবং লবি থেকে একটা আলোক রেখা এসে ঢুকল। একটু পরে আমার পাশেই ও এসে হাজির। ফিসফিস করে জানাল পেয়ে গেছে। কাউন্টারে একটা মেয়ে বসেছিল। অনেক চিন্তা করে মেয়েটাকে বাচ্চা না হবার একটা জিনিস দিতে বললাম, কোন ধরনের জিনিসের দরকার, সে জানতে চাইল। আমি বললাম সবচেয়ে দামীটা। অন্য কিছু সে জিজ্ঞাসা করে বসবে আমার চিন্তা হল।
হেসে উঠে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল ও।
উত্তরে আমি শুধু দুর্বলভাবে হাসলাম।
খেলা হিসাবে নেওয়াই ভাল, এ নিয়ে নাটক না করাই ভাল।
এমন তাড়াহুড়ো করা যে আমাকে তো প্রায় কাঁদিয়ে ফেলল। তারপর বক্সের পেছনে ওর চেয়ারটা ঠেলে সরিয়ে দিল, গায়ের কোট খুলে মেজেতে বিছানা পাতল। আমাকে তার পাশে শুতে বলল।
আমার সমস্ত প্রবৃত্তি তখন যে কোনভাবে ওকে সাহায্য করল। হঠাৎ এক রাশ হলুদ আলো ঝাঁপিয়ে পড়ল।
ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর, আমার সিনেমাটাকে তোমরা কি একটা নোংরা জায়গা পেয়েছ?
ডেরেকের মুখ কাগজের মত সাদা। উঠে দাঁড়ালাম। বক্সের দেওয়ালের গায়ে ধাক্কা লেগে গেল। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মৃত্যুদণ্ডের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
দাঁড়ানো ছায়ামূর্তি আমার ব্যাগ আর তার পাশে আমার প্যান্টির দিকে নির্দেশ করল।
মাথা নিচু করে মার খাওয়া লোকের মত সেগুলো তুলে নিলাম।
ছায়ামূর্তি আবার তীব্রস্বরে নির্দেশ দিল, এবার দূর হয়ে যাও।
ম্যানেজার আমাদের সামনে এসে দাঁড়াল। বিশ্রামকক্ষ থেকে কয়েকজন লোক তাকিয়ে দেখল। ভয়ে আমি আঁতকে উঠলাম।
ম্যানেজার সাহেব স্থুলকায়, বাদামী রঙের মানুষ।
আমাদের অবলোকন করতে করতে তার মুখ রাগে লাল হয়ে উঠল।
-নোংরা খুদে বাচ্চারা।
আমার দিকে ফিরে বলল, তুমি বাজারের মেয়েছেলের বেশি কিছু নও। পুলিশে খবর দেওয়া উচিত ছিল। অশ্লীলভাবে Mr-বে শান্তি ভঙ্গ করা।
তোমাদের নাম কি?
তোতলাতে তোতলাতে ডেরেক বলল, জেমস্ গ্রান্ট ছবিটা ক্যারী গ্রান্ট অভিনীত। চব্বিশ অ্যাকাসিয়া রোড়, নেটলবেড।
নেটলবেডে হেনলে অক্সফোর্ড রোড ছাড়া তো কোন রাস্তার নাম নেই।
হ্যাঁ, আছে পেছনের দিকে।
ডেরেক জোর দিয়ে বলল। মানে অনেকটা লেনের মতই।
সন্দেহের চোখে ম্যানেজার আমার দিকে তাকাল। আমার মুখের ভেতরটা শুকিয়ে গিয়েছিল। কোন রকমে বলে ফেললাম।
– মিস টমসন, আড্রে টমসন, চব্বিশ ডেরেকের ঠিকানাই যে নম্বরটা বলেছিল এটা তার সঙ্গে এক হয়ে যাচ্ছে তবু অন্য নম্বর মনে এল না
আর কি- রোড লন্ডন।
–ডিসট্রিক্ট? শব্দটা দিয়ে সে কি জানতে চায় বুঝতে না পেরে হতাশ ভাবে তার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।–পোস্টাল ডিসট্রিক্ট অধীরভাবে সে জিজ্ঞেস করল।
-এস ডব্লু। ড।
নোট বইটা বন্ধ করেই ম্যানেজার বলল–ঠিক আছে–বেরিয়ে যাও এখান থেকে। তোমরা দু জনেই। ত্রস্তভাবে আমরা তার পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে এলাম।
আর কখনো আমার হলে আসবে না। তোমাদের দুটোকেই আমি চিনি। আবার যদি এখানে দেখি পুলিশে খবর দেব।
উজ্জ্বল আলোর ভিতর দিয়ে আমরা বেরিয়ে এলাম। নিজের থেকেই যেন ডানদিকে মোড় নিয়ে পাহাড়ী পথে নামতে লাগলাম যাতে দ্রুততর বেগে পা চালাতে পারি। একটা শাখা পথ না পাওয়া পর্যন্ত এক নাগাড়ে হেঁটে গেছি।
গাড়ি পর্যন্ত ডেরেক একটাও কথা বলেনি।
এখন ভারিক্কী গলায় বলল, গাড়ির নম্বর নিতে ওদের দেব না। আমি একাই গাড়িটা নিয়ে এসে উইন্ডসর হিল এ ফুলের এর দোকানের উল্টো ফুটপাথ থেকে তোমাকে তুলে নেব। মিনিট দশেকের মধ্যে।
ওর হাত মুক্ত করে রাস্তা বেয়ে ওপরে উঠে গেল।
ওর অপসৃয়মান দীর্ঘকায় সুপুরুষ আকৃতি দেখলাম–যা একদা ছিল গর্বিত ও ন্যায়বান।
একটা লাইট পোস্টের নিচে থেমে ব্যাগ থেকে আয়নাটা বের করলাম।
কি বিচ্ছিরি চেহারা হয়েছে আমার।
আমার সারা গা অপরিচ্ছন্ন, অপবিত্র, পাপে মাখা। আমাদের কি হবে? লোকজন আমাদের নোংরা বলছে। পেছনের চুলগুলো এলোমেলো অগোছালো, মুখের উপর ডেরেকের চুম্বন চিহ্ন। দেখে আঁতকে উঠলাম।
নোংরা শুয়োর একেবারে সঠিক বর্ণনা। লোকটা কি পুলিশ লাগিয়ে দেবে আমাদের পেছনে। গত শনিবার বা আজ। শনিবার নিশ্চয়ই কেউ না কেউ আমাদের মনে রেখেছে। গাড়ি নম্বর মনে রেখেছে। অপরাধমূলক প্রতিটা ঘটনাতেই গাড়িরক্ষক এসে হাজির হবেই।
হ্যাঁ তাই তো। রক্ষণশীল ইংল্যান্ডের পক্ষে তো নারকীয় অপরাধ যৌনতা, নগ্নতা, অশ্লীলভাবে গা বেআব্রু করা। আমি কল্পনা করে আঁতকে উঠলাম, এই ভেবে ডেরেক আমার শরীরের ওপরে উঠেছে এই দৃশ্য ম্যানেজার দেখেছে।
কিন্তু এর মধ্যেও আমার হাত দুটো সক্রিয়ভাবে মুখটাকে পরিষ্কার করার জন্য কাজ করছিল। যতটা সম্ভব পরিষ্কার করে পাঁচিলের দেওয়াল ঘেঁষে উইন্ডসর হিলের দিকে রওনা দিলাম। আমার মনে হচ্ছিল লোকেরা এক্ষুনি আঙুল তুলে দেখিয়ে বলবে ওই তো যাচ্ছে নোংরা শুয়োর দুটি।
.
প্রিয় ভিড
সেই নিদাঘ রজনী আমার পক্ষে তখনো শেষ হয়নি।
ফুলারের দোকানের উল্টোদিকের ফুটপাথে পুলিশের একজন সার্জেন্ট ডেরেকের গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে ওর সঙ্গে তর্কাতর্কি করছিল। ডেরেক ফিরতেই আমাকে দেখতে পেল।
-এই যে উনি এসে গেছেন, সরে, কেমন আমি বলিনি, এক মিনিটের মধ্যে উনি এসে পড়বেন। এই বাথরুম টাথরুম খুঁজে দেখার জন্য, মানে এই আর কি। তাই না লক্ষ্মীটি?
