ডেরেকের আসলে থিয়েটার দেখতে যাবার কথা ছিল তারপরে ঘুম। কিন্তু আমার দেওয়া পার্টিটা এসে জোটায় সবকিছুই অন্যরকম হল। হঠাৎ আমাকে বলে বসল, এখন ফোর হানড্রেড-এ গেলে হয় না?
আমি তো অবাক, ফোর হানড্রেড লন্ডনের সেরা নাইট ক্লাব। আমি নিজের সম্বন্ধে কিছু কথা বললাম, অ্যাস্টর হাউজকে নিয়ে হাসাহাসি করলাম। রেস্তোরাঁর বিল আসার পর দেখলাম ও ঠিক জানে কত বকশিস দিতে হবে। মনে হল স্কুলের ছাত্র হবার জন্য বড় বেশি লায়েক হয়ে গিয়েছে। ইংল্যান্ডের পাবলিক স্কুলের ছাত্ররাই বড় তাড়াতাড়ি। লায়েক হয়ে ওঠে। ট্যাক্সিতে উঠে ও আমার হাতটা ধরল, ঘটনাটা আমার কাছে তেমন আজব বলে মনে হয়নি।
ফোর হানড্রেডের লোকেরা দেখলাম অনেকেই ওকে চেনে। ও দিন টনিক দিতে বলল। আধ বোতল জিন দিয়ে যায় টেবিলে। মনে হচ্ছিল বাকি অর্ধেকটা ওই আগে খেয়ে গেছে এখানে।
মঞ্চ থেকে একটা মিষ্টি কোমল সুরের বাজনা আসছিল ভেসে। আমরাও নেচে উঠলাম আনন্দে। নাচে তাল মেলাতে কোন অসুবিধাই হল না। মনে হল যেন একেবারে নিজেরই তৈরি সুর।
সত্যি সত্যি প্রমোদে ভরে উঠেছিল আমার হৃদয়, ওর কালো চুল সুন্দর কপালের পাশে, ওর হাসিভরা মুখ সুন্দর হাত দুটি সবই আমার কাছে আনন্দের অনুভূতির কারণ হয়েছিল।
ভোর চারটে পর্যন্ত আমরা নিশিকুঞ্জে ছিলাম, তারপর বেরিয়ে এলাম। রাস্তায় যখন পা দিলাম তখন বুঝতে পারলাম আমি হাঁটতে পারছি না, আমার ওকে ধরে চলতে হচ্ছে। একটা ট্যাক্সি ভাড়া করে নিলাম। ট্যাক্সিতে ও আমাকে আবেগে একটু চুম্বন দিল, প্রতিদানে আমিও দিলাম, গোটা ব্যাপারটাই ছিল স্বাভাবিক।
আমার বুকের উপর ও দু বার হাত রাখল আর আমি দু বারই ওর হাত সরিয়ে দিলাম। তৃতীয়বারে এরকম প্রত্যাখ্যান করাটা ভারি অস্বস্তি হত আমার পক্ষে।
ও তৃতীয়বার যখন হাতটা ছোঁয়াল, তা নামিয়ে আনল আমার শরীরের নিচের দিকে। ওকে সেই সময় আমি বাধা। দিলাম। না এ আমি দিতে পারি না। যদিও আমার সারা শরীর আকাক্ষার উত্তাপে উষ্ণ হয়ে উঠেছিল।
সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, কারণ সেই সময়ই পৌঁছে গেলাম আমার ফ্ল্যাটের সামনে। ও বেরিয়ে এসে দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিয়ে গেল।
আমি বললাম আবার দেখা হবে। ও বলল চিঠি লিখবে।
ও যখন আমাকে বিদায় চুম্বন দিচ্ছে তখন ওর হাত দুটো আমার পিঠে ঘুরে নেমে আসে শ্রোণীদেশে। আর আমার শরীরের মাংসল স্তূপটাকে দুটি হাতের মুঠোর মধ্যে আনার চেষ্টা করে। ওর ট্যাক্সি চলে যাবার পরও মনে হচ্ছিল ও আমাকে ঐরকমভাবে আবেগে নাড়িয়ে ধরে রয়েছে।
কিছুক্ষণ বিছানায় গুঁড়ি মেরে পড়ে থাকার পর বেসিনের আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখলাম। আমার মুখ চোখ যেন ভীষণভাবে কোন জ্যোতিতে জ্বলজ্বল করছে। খুব সম্ভব জনের প্রভাবটাই এরজন্য দায়ী। তবুও সৃষ্টিকর্তাকে বললাম, আমি সত্যিই প্রেমে পড়েছি। এ আমার প্রেম।
.
আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে
এসব স্মৃতি মনে করতে সময় লাগে মাত্র তিন মিনিট কিন্তু লিখতে অনেক সময়ই লাগে। উয়োকো বেতার কেন্দ্রে তখনও মনের মতন গানের আসরটি শেষ হয়নি।
বরফগুলি শেষ হয়নি, বরফগুলি গলে গিয়েছিল, উঠে পড়ে বরফের বাক্স থেকে কিছু চৌখুপী নিয়ে গ্লাসের মধ্যে। নিলাম। অনেকক্ষণ বসে থাকব বলে খুব সাবধানে একমুখ ভর্তি করে বুরব নিলাম গ্লাসে চুমুক দিয়ে। আর একটা সিগারেট ধরালাম।
ডেরেকের শেষ বছরটা অতিক্রান্ত হল। আমরা দুজনে দু জনকে চারটে করে চিঠি লিখেছিলাম।
ওর চিঠিগুলো প্রথমে থাকত প্রিয়তমাসু আর শেষে থাকত ভালবাসা অনেক চুমু দিয়ে। ওর প্রত্যেকটা চিঠির বিষয় ছিল খেলার কথা, খেলায় কত রান করেছে। এবার কত রান করবে এইসব। আর আমি লিখতাম কোন নাচ দেখেছি কিনা, কোন সিনেমা দেখেছি কিনা। বাড়িতেই কাটাবে ও গরমের ছুটিটা। ওর বাবা ওকে একটা এম. জি. গাড়ি কিনে দেবে। সেই নিয়ে ও খুব উত্তেজিত। আমার কাছে জানতে চেয়েছে গাড়ি করে কবে ওর সঙ্গে বেড়াতে যাব।
আমি ওর সঙ্গে স্কটল্যান্ডে না গিয়ে কয়েকদিনের জন্য হলেও আমি ওর সঙ্গে এক ফ্ল্যাটে থাকতে চাই। কথাটা শুনে অবাক হল সুমান। সুমানকে ডেরেকের কথা আমি জানাইনি। আমাদের মধ্যে আমিই আগে ঘুম থেকে উঠি। সেইজন্য ও জানে না চিঠির কথা, কোন জিনিস গোপন করা আমার স্বভাব নয় তবু এইটাকে আমি গোপন করেছিলাম। ডেরেকের বান্ধবীদের সারিতে আমার স্থান জনৈকার। ডেরেকের প্রতি আকর্ষণের জন্য আমি স্কুলের ছাত্রী হয়েও লন্ডনের সম্ভ্রান্ত ও অভিজাত মেফেয়ার এলাকায় মেয়েদের মত মেয়েরা অর্গান্ডির পোশাক পরে লম্বা একটা সারি দিয়ে ওর হুকুম তামিল করার জন্য একপায়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সুমানকে শুধু বললাম একটা চাকরির খোঁজে বেরোব। নির্দিষ্ট সময়ে সুমান উত্তরাঞ্চলে চলে গেলেই ডেরেকের চিঠি এল। তাতে লেখা ছিল পরের শনিবার আমি উইন্ডসর স্টেশনে যেতে পারব কিনা? আর সেই সময় থেকেই শুরু হয়। একটা মিষ্টি সাপ্তাহিক সাক্ষাতের পালা।
প্রথমদিন ও এসে আমাকে অভ্যর্থনা করল। আমিও লাজুক লাজুক হয়ে উঠলাম। পরে ও গাড়িটার কাছে নিয়ে যায়। গাড়িটা সত্যি খুব সুন্দর। গাড়ির ভেতরে লালকালো চামড়ার গদি আঁটা। এ ছাড়া প্রায় সবকিছুই অত্যাধুনিক উন্নত মানের। গাড়িতে আমাকে নিয়ে ডেরেক মনের আনন্দে গাড়ি চালাতে শুরু করল। ছোটখাট গলি থেকে বেরোবার মুখে এমন ভাবে বাঁক নিচ্ছিল যেন মনে হচ্ছিল কোন রেসের মাঠে নেমেছে। ঘণ্টায় প্রায় পঞ্চাশ মাইল জোরে ও ছুটে চলেছে, আমি ভাবছিলাম ভালোয় ভালোয় যাত্রাটা শেষ হোক, তবে সারথিতে ভালো পেয়ে ভরসা হচ্ছিল।
