আমি ঐ লেবানন কন্যাটির জন্যই বেঁচে গিয়েছিলাম। সে ছিল প্রচণ্ড খিটখিটে বদমেজাজী প্রকৃতির। নিজের টাকার ব্যাপারে এমনি সে ছিল মত্ত, যে স্কুলের প্রায়ই সবাই সহানুভূতি দেখিয়ে যেত, আবার অনেকে দেখাতোও না। বিশেষ করে কানাডার মেয়ে হবার জন্য, তাছাড়া ভুল উচ্চারণের জন্য, ভুল শিষ্টাচারের জন্য আমার চালচলন আদবকায়দার অভাবের জন্য আমাকে যন্ত্রণায় ভুগতে হত।
পরিবেশ মানুষকে বিভিন্নভাবে শিক্ষা দেয়। আমার স্বভাব ছিল যা কিছু করব তা চট করে করব। কাজেই বেশি মাত্রায় অনুভূতিশীল হবার জন্য কিছুতেই পেছনে লাগা ব্যাপারটাকে বরদাস্ত করতে পারতাম না। প্রথম প্রথম কয়েকজনকে এমন শিক্ষা দিয়েছি যে ওরা কেউ আর একা আসতে সাহস পেল না। তখন কয়েকজন মিলে দল পাকিয়ে রোজ রাত্রে এসে আমাকে চেপে ধরে ঘুষি খামচি, পানি ছিটিয়ে ভিজিয়ে দেওয়া ইত্যাদি নানাভাবে আমাকে বিব্রত করতে লাগল। আমি তখন ঠিক করলাম আর একা লড়াকু হরিণের মত লড়ব জনা। তাই একজন সম্ভ্রান্ত মহিলা হবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে থাকতে শিখলাম। ছুটির দিনগুলি সবকিছুর ক্ষতিপূরণ করে দিত। ঠিক আমারই মত খোলা আকাশের নিচে পায়চারি করে অবসর যাপন করত স্কটল্যান্ডের একটি মেয়ে সুমান ডাফ। ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলাম। সে ছিল বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান। আমি ওর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার জন্য ওর বাবা মা আমার উপর বেশ খুশিই হয়েছিলেন। শেষে স্কুল থেকে বেরোবার পর অ্যান্টি ফোরেন্স পার্ক হোটেলে যুগল নৃত্য পাঁচশ পাউন্ড দিয়ে প্রযোজনা করলাম, সেই সময় আমি ওর সঙ্গে ছিলাম তখন কতগুলি অর্থহীন নৃত্য দেখেছিলাম। কানাডার যেসব। যুবকদের দেখেছিলাম, তারা ছিল রুক্ষ্ম ও অপুরুষোচিত।
এই সময়েই ডেরেকের সঙ্গে আমার আলাপ হয়।
আমার বয়স সাড়ে সতের বছর। আমি তখন সুমানের সঙ্গে কিংস রোডের ওল্ডচার্চ স্ট্রিটে একটা তিন ঘরের ফ্ল্যাটে বাস করছিলাম। সময়টা জুনের শেষ, কাজেই নাচ গানের পক্ষে সময়টা অনুকূল নয়, তাই আমরা ঠিক করেছিলাম যে পরিচিতদের মধ্যে যাদের অনুষ্ঠানটা ভাল লেগেছিল তাদের নিয়ে সত্যি একটা পার্টি করব। আমাদের ফ্ল্যাটের উল্টোদিকের লোকজন সেই সময় ছুটি কাটাতে বিদেশে যাচ্ছিল। তাদের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছিল ফ্ল্যাটটা ব্যবহারের জন্য পাব, যদি ফ্ল্যাটটার উপর খেয়াল রাখি তাহলে।
আমরা যে সব পার্টিতে যেতাম সেইগুলির উপযুক্ত হতে গিয়ে আমাদের হাত প্রায় খালি হয়ে গিয়েছিল। অ্যান্টি ফ্লোরেন্সকে জানাতে উনি আমাকে একশ পাউন্ড পাঠালেন আর সুমানও সব ঝেড়েঝড়ে প্রায় পঞ্চাশ পাউন্ড জোগাড় করল, বেশ ভাল করেই পার্টিটা দেব ঠিক করলাম। জনা তিরিশ জনকে বললাম আমরা ভেবেছিলাম এর মধ্যে কুড়িজন হয়ত আসবে, তাই আঠারো বোতল শ্যাম্পেন কিনলাম–গোলাপী। কারণ, ওটাই সব থেকে উত্তেজক।
পার্টিটা দারুণ সাফল্য এনেছিল। তিরিশ জনের সবাই এসেছিলেন, এমন-কি এক ভদ্রমহিলাকে দেখলাম, তিনি একটি বাচ্চাকে কোলে নিয়ে সিঁড়িতে বসেছেন। গাদাগাদি করে অনেককেই সিঁড়িতে বসতে হয়েছিল সেদিন। কিন্তু সব থেকে বাজে ব্যাপারটা ঘটল ঠিক সেই সময়েই। উন্মাদনা যখন চলছিল পুরোমাত্রায় ঠিক সেই সময় পানীয়ের সবকটা বোতল শেষ হয়ে গেল। এর মধ্যে একজনের গলা থেকে বেরিয়ে আসল পানি পানি! না পেলে ইংল্যান্ডকে আমি আর দেখতে পাব না।
আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম, বোকার মত বলে উঠলাম তাইতো পানি যে আর একটুও নেই।
দেওয়ালের কাছে দাঁড়িয়ে থাকা যুবক তা শুনতে পেয়ে এসে বলল নিশ্চয়ই আছে, আপনি নিশ্চয়ই ভাড়ারটা দেখতে ভুলে গেছেন। এই কথা বলেই আমার কনুইটা ধরে ঘর থেকে বাইরে নিয়ে এল। বলল, চলুন এমন আসরটাকে পস্তাতে দেওয়া যায়? কাছের বার থেকে আরও দুটো কিনে আনি।
তাড়াতাড়ি গিয়ে দু বোতল জিম আর হাত ভর্তি লেমন নিয়ে ফিরলাম। আমার সঙ্গী জোর করে লেমনের দাম দিয়ে দিলেন। কাজেই বাধ্য হয়েই লেমনের দাম আমি নিলাম। আমার সঙ্গীটি বেশ আনন্দেই ছিলেন। তিনি সুমানের নর্মান বন্ধুদের সঙ্গে এসেছেন জানাল। আরও জানায় তার নাম ডেরেক ম্যালাবী।
আমি ওর কথায় কান না দিয়ে তাড়াতাড়ি ছুটছিলাম আসরে কখন পৌঁছব। বাইরে থেকেই উল্লাসের ধ্বনি শুনতে পেলাম। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই মিলন মেলা ভেঙে গেল। সেই সুন্দর নর্মান দম্পতিরাও চলে গেল, যাবার সময় ডেরেককে বলে গেল, ঘরের চাবি কোথায় আছে।
ডেরেক আমার চুলগুলোকে সরিয়ে কানের সামনে মুখটা এনে ফিসফিসে ভরাট গলায় বলল, আমি তার সঙ্গে বেরোব নাকি? সুমানটাও ঠিক সেইসময় রাস্তার ওদিকে গেপোটে আছে যেখানটা সম্পর্কে কোন কৌতূহলই আমার ছিল না। যাই হোক আমরা বেরিয়ে গেলাম।
একটা ট্যাক্সিভাড়া করে দা বায়ু নামে একটা স্পটোটি হাউজে নিয়ে গেল। সেখানে খেতে খেতে সে জানাল তার বয়স আঠার। স্কুলের এটাই তার শেষ বছর। উইন্ডসরের কাছেই সে থাকে।
ক্রিকেটে একাদশ টিমের মধ্যে ও আছে। ও জানাল ওর খালা মারা গেছেন, তিনি মারা যাবার সময় কিছু অর্থ ওর নামে রেখে গেছেন। সেগুলিকে উদ্ধার করার জন্য আজ প্রায় চব্বিশ ঘণ্টাই তাকে লন্ডনের বড় বড় উকিলদের পিছনে দৌড়ে বেড়াতে হবে। ওর বাবা মা সকালটা ওর সঙ্গে কাটিয়ে এম. সি. সি.-র খেলা দেখতে গিয়েছিলেন, সেখান থেকে নর্মানদের কাছে ওকে রেখে উইন্ডসরে ফিরে গেছেন।
