ভার্জিনিয়া জেন্টলম্যান ব্র্যান্ডের বুবদ মদের দু পাইটের ঠিক একটা বোতলে দু সপ্তাহ চলার পর আর কিছুটা বাকি ছিল। একটা পলককাটা সেরা কাঁচের গ্লাসে কয়েক টুকরো বরফ পুরে দিলাম তার মধ্যে বোতলটার শেষ ফোঁটা অবধি নিলাম। সবচেয়ে আয়েসী আরামকেদারাটা রিসেপশন লবির দিক থেকে, রেডিওটা কাছে টেনে এনে, পার্লামেন্ট সিগারেটের প্যাকেটের শেষ পাঁচটা থেকে একটা ধরিয়ে নিলাম। গ্লাসে একটা লম্বা চুমুক দিয়ে, রেডিওটা চালিয়ে দিয়ে নিজেকে আরাম কেদারায় মেলে দিলাম।
বাইরে একটানা বৃষ্টির মধ্যেও রেডিওতে তার বেতার কার্যক্রম ঠিকমতই চলছিল। মার্জার সংবাদ, পোষা বেড়াল মাত্রেই গুসিফুড প্রাইম লিভার মিল খেতে কি ভালবাসে সেই সব তথ্য। মাঝে মাঝে তীব্র ছাট এসে ছররা গুলির মত শার্সির কাঁচে লাগছিল এবং বাড়িটা কেঁপে উঠেছিল। তখনই বৃষ্টির একটানা সুরের মধ্যে পরিবর্তন হচ্ছিল। আরামে বসে বসে ভাবছিলাম বাড়ির ভিতরে আমি রয়েছি আরামে, দুর্যোগের তাণ্ডব এড়িয়ে। মনের মত গান একটা আসরের অনুষ্ঠানের কথা ঘোষণা করল উয়োকো বেতার কেন্দ্র থেকে। হঠাৎ ইষ্ক স্পটস সম্প্রদায়ের গলায় শোনা গেল আমার স্বপ্ন তরীটি দোলায় কে? গানটা শোনা মাত্রই পাঁচ বছর আগের একটা স্মৃতি আমার কাছে ভেসে উঠল। টেমস নদীর বুকে ছোট্ট একটা শালতিতে কিংস ইয়ট পেরিয়ে দূরে–উইন্ডসর ক্যাসেলকে বায়ে রেখে বেয়ে যাবার কথা মনে পড়ল। ডেরেক প্যাডল করে শালতিটা চালাচ্ছিল, আর আমি চালাচ্ছিলাম ছোট রেকর্ড প্লেয়ারটা। মোট দশটা রেকর্ড প্লেয়ার ছিল। কিন্তু যখনই ইস্পটের লং প্লেয়িংটা চালাছিলাম, তখনই স্বপ্ন তরীর গানটা শেষ হতেই ডেরেক বলেছিল গানটার এই জায়গাটা আবার চালাও না ভিভ। আর আমাকে হাঁটুমুড়ে বসে, রেকর্ডে যেখানে গানটা আছে সেখানটা আন্দাজ করে গ্রামোফোনে একটা পিন বসিয়ে দিতে হচ্ছিল।
আমার দুটো চোখ পানিতে ভরে গিয়েছিল, তা ডেরেকের জন্য নয়। তা দুটি যুবক যুবতীর প্রেমের মূর্ত স্মৃতিগুলির জন্য। প্রথম প্রেমের সেই মধুর সঙ্গীতগুলি ক্যামেরায় তোলা অদৃশ্য মুহূর্তের ছবি, প্রণয় চুম্বনের ওষ্ঠাধর চিহ্নে সীলমোহর করা প্রেমপত্রগুলির জন্য।
হারানো শৈশবের অনুভূতি তার যবনিকা থেকে আমাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল। আর তারই জন্য আমার চোখ থেকে পানি গাল বেয়ে পড়ছিল। ঠিক করলাম পানি না মুছে কিছুক্ষণ স্মৃতির মধ্যে ডুবে থাকব।
আমার নাম ভিভিয়েন মিশেল। এখন সুদূর অতীতের স্মৃতি রোমন্থন করছি ড্রিম পাইলস হোটেলে বসে।
সেই সময় আমার বয়স তেইশ। লম্বায় সাড়ে পাঁচ ফুট; অ্যাস্টর হাইসের ইংরেজিনীদের মুখের ভাষায় আমার পাছা নাকি বেশ বড়, আর আমার নাকি আরো টাইট ব্রা পরা উচিৎ। এগুলিতো শুনতাম, তাছাড়া আমার নিজের ধারণাও যে আমার ফিগার বেশ ভাল।
আমি একটু আগেই বলেছি যে আমার চোখ নীল বর্ণের, মাথার চুল ঢেউখেলানো গাঢ় বাদামী বর্ণের।
গালের হাড় একটু উঁচু, তবে সেটা আমার পছন্দ। যদিও সেই ইংরেজিনীরাই আমাকে পরদেশী পরদেশী বলেছিল–আমার নাক ছোট্ট কিন্তু মুখ বেশ বড়। তাই আমাকে নাকি খুব সেক্সি দেখায়। এমন কি যে সময় আমি কোন যৌন চেতনা অনুভব করি না তখনও। আমার স্বভাব কিছুটা দুরন্ত প্রকৃতির, সেই জন্য কনভেন্টের মিস্টারদের চিন্তিত করে তুলেছিল। তারা আমাকে বলতেন মেয়েরা হবে উইলো গাছের মতন নরম ভিভিয়েন, ছেলেদেরই মানায় অ্যাস গাছের মত শক্তপোক্ত হওয়া।
ফরাসি ক্যানাডীয় রক্ত আমার। কুইবেকের বাইরের চর ইল দর্লিয়ানের উত্তর উপকূলে সঁাৎ ফাঁসিয়ে নামে একটি ছোট্ট চরে আমার জন্ম হয়েছিল। সেন্ট লরেন্স নদী যেখানে কুইবেক প্রণালীর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে সেখানের নদীর মাঝ বরাবর এই লম্বা চরটা জেগে উঠেছে বিশাল একটা নিমজ্জিত জাহাজের মত।
এই নদীর পাড়েই বড় হয়েছি আমি। কাজেই আমার শখ সাঁতার কাটা, মাঝধরার তাঁবু নিয়ে বেড়ানো আরো অনেক বহিরঙ্গ।
মা বাবাকে আমার ঠিক মনে পড়ে না। খুব ছোটবেলাতেই তারা দুজন মারা যান। খুব সামান্য মনে পড়ে আমি বাবাকে খুব ভালবাসতাম, মার সঙ্গে ঠিক বনিবনা হত না। আমার যখন আট বছর বয়েস তখন একটি বিয়ে বাড়ির নেমন্তনে যাবার পথে প্লেনক্র্যাশে তারা মারা যান। কোর্ট থেকে আমার বিধবা ফুফু আমার অভিভাবিকা নিযুক্ত হয়ে আমাকে মানুষ করার দায়িত্ব নেন। খুব ভালভাবেই আমরা পরস্পরকে চিনেছিলাম। আমার ফুফু প্রোটেস্ট্যান্ট ধর্মাবলম্বী হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাকে ক্যাথলিক মতেই মানুষ করেন। পাকা পনেরো বছর পর্যন্ত আমি উরুসুলিন কনভেন্টে পড়াশুনা করি। এরপর ঠিক করলাম যে, আমি ষোল বছর বয়সেই ইংল্যান্ড যাব। আমার এই মতটি আমাদের অঞ্চলে বেশ সোরগোল তুলেছিল।
ভিক্টোরীয় যুগের শেয়ার বাজারের মত দেখতে মানিংডেন এলাকার মিড ফ্রেডগোন্ডের অ্যাস্টর হাউসটা। বাড়িটার ওপরের তলাগুলি পঁচিশ জোড়া মেয়ের শোবার ঘর বানাবার জন্য আস্টার বোর্ড দিয়ে ভাগ করা হয়েছে। পরদেশী হবার জন্য বাহমূলে প্রচুর চুলের গুচ্ছ জনৈকা লেবানন দেশীয়া পরদেশীকে আমার রুমমেট হিসাবে চিহ্নিত করা হল। তার দুটি বিষয়ের প্রতি উৎকট আকর্ষণ ছিল একটি চকলেট ভক্ষণ আর অন্যটি একজন মিশরীয় চিত্রতারকা বেন সৈয়দের প্রতি।
