.
নানারঙের দিনগুলি
মেঝেতে এসে অমন জোরে ছিটকে পড়ার পর বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ পড়েছিলাম। মনে মনে ভাবছিলাম কোথায় আছি, কি ঘটে গেছে। আর একবার আহত হবার ভয় থাকার জন্য নিচের মেঝের সঙ্গেই মিশে থাকলাম। প্রায় মিনিট দশেক শুয়েছিলাম, আর শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম এইরকম ইলেকট্রিক শক খাবার ফলে জন্মের মত আমার কোন ক্ষতি হয়েছে কিনা, কি জানি। যদি এই ইলেকট্রিক শক খাবার জন্য গুঁড়িয়ে দেয় আমার শরীরের কোন অঙ্গ, কিংবা আমার সমস্ত কালো কেশগুচ্ছ একেবারে সাদা করে দেয় বা সব চুল যদি পুড়েই নিঃশেষ হয়ে যায়–আমি হাতটাকে আলতো করে মাথার পেছনে নিলাম, না, দেখলাম চুল ঠিকই আছে কিন্তু মাথার পেছনে একটা ঢিবির মত হয়েছে। যা প্রচণ্ড চোট তাতে মাথার আর কি দোষ, ভয় হয় আমার মা হবার সম্ভাবনাকে না নষ্ট করে দেয়। অবসন্ন মন্থরতায় একটু নড়লাম– না কোন ক্ষতিই হয়নি।
আমার ঘরের কোণের জি.ই.সি ফ্রিজটা ঠিক সেই মুহূর্তেই চালু হল। আমার মনে হল তার খুশিভরা গার্হস্থ কলরব শুরু করে সে আমাকে জানিয়ে দিল যে জগৎ সংসার ঠিকমতই চলছে। দূরে চলে গিয়েছে বিদ্যুত্বাহিনী।
খুব সামান্য শক্তি নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। দাঁড়িয়েই আগে ঘরের চারদিকে ভাল করে লক্ষ্য করলাম। ভয় হচ্ছিল কি জানি কি ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখতে হবে। না, সবকিছুই প্রায় ঠিকঠাক রয়েছে। ঘরের মধ্যে গুরুগম্ভীর চেহারার সেই রিসেপশন ডেস্ক, পেপারব্যাক, পত্রপত্রিকা রাখার ম্যাগাজিন র্যাক, ক্যাফেটেরিয়ার লম্বা কাউন্টার, রামধনু রঙের প্লাস্টিক পাটাতন ওয়ালা গোটা বারো পরিচ্ছন্ন টেবিল, কিছু চেয়ার, বিশালাকার বরফ পানির জালা আর চকচকে কফি পার্কো লেটারটা–সবকিছুই নিজস্ব স্থানে অবস্থান করছে। শুধুমাত্র জানালায় তৈরি হয়েছে একটা বড় ফোকর। আর সেই ফোকরের মধ্য দিয়ে অগাধ জলরাশি ঘরের মধ্যে অবাধে ঢুকে বয়ে চলেছে। মনে হচ্ছিল যেন ঘরের মধ্যে একটা প্রলয় তাণ্ডব চলছে।
ওহ! কি যেন বলছিলাম প্রলয়? আসলে আমার মাথায় প্রলয় কথাটাই বনবন করে ঘুরছে! বন্ধু বিদ্যুৎ সহ ঝড় ছিল, তাতেই ছোট বাচ্চাদের মত ভয় পেয়েছিলাম। আর বাচ্চাদের মতই কাজটা করেছিলাম। বিদ্যুৎ চমকের বিরতি পর্যন্ত ধৈর্য না ধরে কি যে একটা আহাম্মকের মত কাজ করেছিলাম ঐ ইলেকট্রিক সুইচটা টিপে। শাস্তিও পেয়েছি। মাথাটা ফুলে হয়েছে একটা ঢিবির মত। না সত্যি বড় বেয়াক্কেলে আমি। হঠাৎ মনে হল সত্যি আমার মাথার চুলগুলো সাদা হতে পারে? চট করে ঘরটা পেরিয়ে ব্যাগ থেকে আয়নাটা নিয়ে বিস্ফারিত নেত্রে নিজের প্রতিবিম্বটাকে নিখুঁতভাবে অন্বেষণ করতে লাগলাম। দেখলাম নীল, পরিচ্ছন্ন কিন্তু বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে চোখের মণি দুটি আমার দিকে তাকাল। পদ্মগুলি অটুট, একজোড়া খয়েরি জ পল্লব, ললাটের বিস্তৃতি বাদামী রঙের টিকোল নাক, আর গাঢ় বাদামী রঙের ঢেউ খেলানো চুলগুলি বুকের দুইপাশে দুই তরঙ্গের মত সুস্থ স্বাভাবিক ভাবেই অবস্থান করছে। সেই জন্য ব্যাগের ভেতর থেকে চিরুনি বের করে বার কয়েক ক্ষুব্ধ চুলগুলিকে নিজের হাতের মধ্যে এনে চুলগুলির উপর দিয়ে চিরুনি বুলিয়ে নিলাম। তারপরে চিরুনিটি ব্যাগে পুরে ব্যাগ বন্ধ করে দিলাম।
ঘড়িতে দেখি প্রায় সাতটা বাজে।
রেডিওটা চালিয়ে দিতেই কিছুক্ষণ পরেই সাতটার খবর শুরু হল। তাতে শুধু ঝড়ের খবর যা শুনলে শ্রোতাদের মনে ভয়ের উদ্রেক করবে। বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা বিপর্যস্ত, হডসন নদী বিপদসীমা অতিক্রম করেছে প্লেন ফসের কাছে। একটা এলুম গাছ পড়ে নয় নম্বর পথটাকে অবরুদ্ধ করে রেখেছে স্যাটাগোরা প্রস্রবণের কাছে। প্রবল বন্যার সংকেত দেওয়া হয়েছে মেকানিকাভিলে। আমি উঠে জানালার ভাঙা ফোকরটাকে বন্ধ করার জন্য একটা শক্ত কার্ডবোর্ড আটকে দিলাম। আর মেঝেতে পড়ে থাকা পানি একটা শুকনো কাপড় দিয়ে বালতির মধ্যে নিংড়ে ফেলতে লাগলাম। হাতের কাজটা সারামাত্রই পেছনের বারান্দার দিকে নয় নম্বর ঘরে গিয়ে জামাকাপড় ছেড়ে একটু ঝর্ণায় গোসল করে নিলাম। মাটিতে পড়ার জন্য আমার টেরিলিনের জামাটায় ময়লা লেগেছিল, সেটাকে ভাল করে ধুয়ে শুকোতে দিলাম।
ঝড় যে আমাকে শিক্ষা দিয়েছে তা এর মধ্যেই ভুলে গিয়েছিলাম।
একটা ছোট বোকা মেয়ের মত কাজ করছিলাম। এই নির্জনে আমার মন এখন এক মন্দার স্বপ্নের গীতিময়তায় উচ্ছল হয়ে উঠল, আগামীকাল ভোেরবেলায় বিভাসের জন্য আনন্দধ্বনি জেগে উঠল।
ঝোঁকের বশে আমি আমার ছোট্ট ওয়ার্ডরোবে অল্পসল্প যা জামাকাপড় ছিল, তার থেকে সবচেয়ে ভালটা নিয়ে পরে ফেললাম।
ড্রেসটা ঠিক বুকফাইটারদের মত। কালো ভেলভেটের প্যান্ট যার উপর সোনালি জীপ ফাসনারের গতি কোমর থেকে এমনভাবে নেমেছে, যেটা দৃষ্টিকটুকর ব্যাপার। সেটা বসলে পরে আরো ভালভাবে টের পাওয়া যায়। আর তাছাড়া প্যান্টটাও এমন বিশ্রীভাবে কামড়ে ধরেছে যে একটু উগ্রই হয়েছে।
তাই এর উপর আর ব্রা পরার ঝামেলা করলাম না। একেবারে গলাবন্ধ একটা সোনালি সোয়েটার পরে নিলাম।
আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখলাম। ভালই লাগছে। সোয়েটারের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে নিলাম।
এরপর একটা নশা কাটা সোনালি স্যান্ডেল গলিয়ে সোজা বেরিয়ে এলাম লবিতে।
