গাড়িতে গিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, চলি তাহলে মিষ্টি সোনা। রোজ চিঠি লিখ–এই কথা ওর স্ত্রী আমাকে বলে একটা বিশ্রী কুটিল হাসি হাসল। আমার সামনে ওদের মুখটা শেষবারের মত ভেসে উঠল। উফ! কি একখানা দম্পতি! ঠিক যেন কোন বইয়ের দুটি চরিত্র নেমে এসেছে ধরাধামে–কিন্তু কোন বই। কিন্তু তারাও এত খারাপ হতে পারে না। যাকগে এখন চলে গেছে ওরা এখান থেকে। মানবজাতিকে নিশ্চয়ই উন্নত বলে মনে হবে, যেখানেই যাই না কেন।
ফ্যান্সীদের চলে যাবার পর আমি ওদের পথের দিকেই তাকিয়েছিলাম। আকাশটা বেশ পরিষ্কার তনকেটাবরের মাঝামাঝির দিক হবে।
একটু পরেই ঠাণ্ডা বাতাসের ঝাঁপটা আমার গায়ে এসে লাগল। দূরে একটা ধাতব বাতির কাঁচক্যাচ শব্দে একটা ফিসফিসানি কানে এল, এবং শোনামাত্রই আমার কানে শিরশিরানি খেলে গেল। হ্রদের পানির উপরিভাগ যা পেতলের মত দেখাত, হঠাৎ মৃদুমন্দ বাতাসে তা যেন মাঝে মধ্যে সাদা সাদা রেখা ফুটিয়ে তুলল। আক্রোশে ফুলে ওঠা লম্বা লম্বা গুলি ছাড়া বাতাস ছিল নিশ্চল এবং রাস্তার ওপারে আর হোটেলের পেছনে প্রহরী বৃক্ষের দল এলোমেলোভাবে ঘেষাঘেষি করে আমার পেছনের আলোকজ্জ্বল বাড়িটার আলোকোৎসবকে ঘিরে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
বেশ মজা লাগছিল কিন্তু নিজেকে আঁকড়ে রাখলাম। একটু পরেই ঝড়ের তাণ্ডব লীলা যখন শুরু হয়ে যাবে তখন আমি আরামদায়ক আলোকিত ঘরের গহ্বরে ঢুকে যাব আমি। আরও মিষ্টি আরামের জন্য তৈরি করব একটা পানীয়, আর রেডিওটা চালু করে দেব।
রাত ঘনিয়ে আসে। পাখিদের কলকাকলি শোনা যায় না, কারণ ঝড়ের পূর্বাভাস তারা আগেই পেয়েছে। তারা যে যার বাসায় চলে যায়, বনে প্রাণীরাও চলে যায়। যেমন কাঠবেড়ালি আর হায়নের এই বিরাট বন্যভূমিতে একমাত্র আমিই আছি আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে। ফিরে যাবার আগে কয়েকটা বড় বড় নিঃশ্বাস নিলাম। বাতাসের গন্ধটা ছিল শ্যাওলার আর মাটির ভেতরের সোদা গন্ধ। এতে আমি অসম্ভব আনন্দ পেয়েছি। একটা পেঁচা এই নিস্তব্ধতার মধ্যে ডেকে উঠল হু, তারপরেই চুপ। আমি এই ধূলিধূসর পথটার মাঝামাঝি এসে দাঁড়াতেই হাওয়ার ঝাঁপটা আমার গায়ে এসে লাগল। আমার চুল উড়িয়ে নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই রাতের পাহারাদার কুকুর জেগে উঠে যেমন করে ডাকে, ঠিক তেমন ভাবে মেঘ ডেকে উঠল।
তারপরই এল ঝড়।
বৃক্ষরাজির দল যেন নৃত্যরত হয়ে আছড়াতে লাগল, গ্যাস স্টেশনের ওপরের বাতিটা ঝাঁকুনি খেয়ে দুলছিল। আমার মনে হচ্ছিল ও আমাকে চোখ টিপে টিপে সতর্ক করে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পরে বাতিটার দৃষ্টি ঝাপসা হল। কারণ আলোর পুঞ্জ এগিয়ে আসা বৃষ্টিধারার ধূসর আঁচলে যেন কুহেলী বিলীন হয়ে গেল। বড় কয়েকটি ফোঁটা আমার গায়ে পড়ামাত্র অমনি এক ছুট।
ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলাম, কি প্রচণ্ড বৃষ্টি, খুব ভাল সময়েই পৌঁছাতে পেরেছি। এত প্রচণ্ড বৃষ্টি, যেন মনে হচ্ছে মেঘের ধারাপাত ভেঙে পড়ছে। বৃষ্টির শব্দ মাদলের গম্ভীর ধ্বনির মত, এক লহমায় ছাদের জলনিকাশী পাইপ দিয়ে মাত্রাতিরিক্ত পানি নামার তীব্র শব্দ একসঙ্গে যোগ করে দিল। আর এভাবেই ঝড়ের মুখর পটভূমিকা রচিত হয়ে গেল।
আমি তখনও ওখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ বোমা ফাটার মত কড়কড়ে শব্দে বিদ্যুৎ ঝলসে উঠল, বাড়িটাকে কাঁপিয়ে দিল। বাতাসে তার অনুরণন উঠেছিল, কয়েক গজ দূরে বিরাট একটা বিস্ফোরণে যে রকম শব্দ হয় অনেকটা সেইরকম। একটা কাঁচের জানালা ভেঙে পড়ল মেঝের উপর, ঝরঝর করে বৃষ্টির ছিটা আসতে লাগল।
আমার নড়বার শক্তি ছিল না। দু হাতে কান চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছি, ব্যাপারটা এরকম হবে তা বুঝতে পারিনি। একটা অস্বাভাবিক নৈঃশব্দ যা কানে অস্বস্তি ধরিয়ে দিচ্ছিল, তা এখন আকাশ বন্যার কল্লোলের সঙ্গে মিশে গেল। এই কল্লোল নিয়ে আসে স্বস্তিকে, এতটা খারাপ হবে তা ভাবতেই পারিনি। এই পরিস্থিতিতে একা থাকা যে কি ভয়ঙ্কর ব্যাপার তা তো বোঝাই যায়। একা থাকতে চাও তো ভাল, আর না চাইলে এই প্রচণ্ড বৃষ্টির মধ্যে জোরেছোটা অর্থাৎ দশ মাইল দূরে লেক জর্জের দিকে পালানো।
আবার ঘরের মধ্যে নীলাভ শ্বেত বিজলীর বিচ্ছুরণ ঝলসে উঠল। এবার আরো জোরে শব্দ, একেবারে ফাটল ধরা বিস্ফোরণের শব্দ। সবকিছু ছিটকে পড়ল হিংস্র গোলাবর্ষণের প্রক্রিয়ার মত, পাশের ঘরে মদের গ্লাস ও বোতলগুলি ঝনঝন করে শব্দ করে উঠল, আর কাঠের তৈরি বাড়িগুলি ক্যাচক্যাচ শব্দ করে উঠল।
আমার হাত পা অবশ হয়ে আসছিল। কোন রকমে টালমাটাল হয়ে গিয়ে হাতের উপর মাথা রেখে বসে পড়লাম, ভাবলাম কি করে এতটা নির্বোধ হলাম। যত দৌরাত্ম্য সব কি আমাকে কেন্দ্র করেই। এই সময় একটা কিছু করতে হবে এটা ভাবলাম। ভাবলাম কি করা যায়। ফ্যালীরা চলে যেতেই ফোনের লাইনটাও কেটে দিয়েছে। এখন একটাই আশা আছে যে বাড়ির সামনের গেটে ঘর ভাড়া দেওয়া হবে এই নিয়ন সাইনের তৈরি গ্যাসটা জ্বালিয়ে দিতে হবে। যদি কোন পথচারী এই দুর্বিপাকে পথে থাকে, সে বেচারীও এটা দেখে খুশি হবে আর আমারও ভাল হবে। কিন্তু যেই সুইচে হাত দিয়েছি, অদৃশ্য বিদ্যুতের নজর নিশ্চয়ই আমার উপর কুটিল দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল, তার দৈতের মত বিশাল এক হাত যেন আমাকে ছুঁড়ে দিল ঘরের মেঝেতে।
