আতঙ্কিতা
পালিয়ে যাচ্ছিলাম আমি আমার অক্ষমতা থেকে, যদিও পৃথিবীর নাট্যমঞ্চে মাথা তুলে দাঁড়াবার সামর্থ্য থেকে আমার ভাগ্য আমাকে বঞ্চিত করেনি। ইংল্যান্ডেই আমার শৈশব, এই শীত, অপরিচ্ছন্ন আকর্ষণহীন আসবাবপত্র অপরিচ্ছন্ন আকর্ষণহীন প্রণয় ঘটনার এক অনুক্রম থেকে পালিয়ে যাচ্ছিলাম। আসলে আইনের চোখ ছাড়া আমার চারদিকের সবকিছুর কাছ থেকেই আমি পালিয়ে যাচ্ছিলাম।
পালিয়ে অনেক দূরেই গিয়েছিলাম। একটু বাড়িয়ে বলতে গেলে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করার আধাআধি পথ। এখন সারাটা লন্ডন পেরিয়ে এসেছি দ্যা ড্রিমি পাই মোটর কোর্টে–যা অজস্র পাহাড়, হ্রদ আর নিউইয়র্ক রাজ্যের উত্তরাঞ্চল জুড়ে প্রসারিত, সেই বিশাল বন ঘেরা আমেরিকার বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র-আডিরোন ডাকসের লেক জর্জ থেকে দশ মাইল পশ্চিমে।
আজ শুক্রবার, ১৩ই অক্টোবর। রওনা হয়েছিলাম ১লা সেপ্টেম্বর। আমার আসার আগে বাগানের মেপল গাছের। সারিগুলি ছিল সবুজ, এখন কানাডার সীমানার কাতারে এগিয়ে যাওয়া লক্ষ লক্ষ পাইন গাছের মধ্যে একেবারে আদিম বন্য মেপল গাছের শাখায় শাখায় যেন জলন্ত বিস্ফোরণের মত ফুলের আগুন ছড়িয়ে পড়েছে এখানে ওখানে। আমি অনুভব করলাম যে আমার রং বিরম নাড়ুর বর্ণ, যা লন্ডন বাসের ফলে পাওয়া, যা ফেলে বর্তমানে অঙ্গে তুলে নিয়েছে। এই মন মাতানো রং ও নিসর্গের ঝলমলে উজ্জ্বল্য আমার কাছে এটা যেন ধার করা একটা চামড়ার খোলস ছেড়ে নিজের আসল চামড়াটা ফিরে পাওয়ার মত। আয়নার মধ্যে নিজেকে দেখামাত্রই খুব একটা আত্মতৃপ্তি আছে এমন বলব না। আসলে গত পাঁচ বছরের অস্তিত্বটা থেকে পালাচ্ছিলাম। এখনকার ব্যক্তিত্ব নিয়ে আমি বিশেষ সন্তুষ্ট এমন কথা বলা আমার উদ্দেশ্য নয়, বরং বলব, আমার আগের ব্যক্তিত্বটাকে আমি ঘৃণা করতাম, ঘৃণার চোখে দেখতাম, পশ্চাতের ঐ মুখখানা থেকে অব্যাহতি পেয়েই আমি আনন্দিত।
আমি যেখানে আছি সেখান থেকে ঠিক পঞ্চাশ মাইল দক্ষিণে নিউইয়র্কের রাজধানী আলবেনীর উয়োকো। বেতারে এইমাত্র ঘোষণা করা হল ঠিক ছ টা বেজেছে, তার পরেই আবহাওয়ার সংবাদ–তাতে প্রবল বাতাসসহ আসন্ন ঝড়ের সম্ভাবনার কথা জানাল। আলবেনীতে এই ঝড়ের প্রবাহ এসে পৌঁছাবে রাত আটটা নাগাদ, চলবে বারোটা পর্যন্ত। তার মানে সারাটা রাতই আমাকে এই ঝড়ের পাশাপাশি শুয়ে কাটাতে হবে। যতদূর জানি কাছাকাছি কোন জীবিত প্রাণী। বলতে আছে লেক জর্জে, খাবার মোটামুটি দ্বিতীয় উত্রাই পথ বেয়ে দশ মাইল গেলে পরে, তবু বাইরে বিদ্যুৎ বৃষ্টির মধ্যে পাইন গাছের আছাড়ি পিছাড়ি করার দৃশ্যটা ভেবে আমি ভেতরে ভেতরে ঋজু ও সুরক্ষিত অনুভব করছিলাম। আর অনুভব করছিলাম নিঃসঙ্গতা।
প্লেন ফলসের উত্তরে লেক জর্জ-এর মধ্যে মনোরম বিকল্প যোগাযোগ হিসাবে অরণ্যের বুক চিরে আনমনে চলে গেছে এই দু নম্বর রাস্তাটা। ড্রিমি ওয়াটারটা ঠিক এর মাঝামাঝি একটা হ্রদ, পিকনিক করার আদর্শ স্থান বলে জায়গাটা বরাবর বিখ্যাত। এই হ্রদের দক্ষিণ পাড়েই হোটেলটা বানানো হয়েছিল, রাস্তার দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে অর্ধ। বৃত্তাকারভাবে। রান্নাঘর, গোসল খানা, খাবার ঘর, শোবার ঘর, প্রায় প্রত্যেকটি ঘরের পিছন থেকে হ্রদের কোন না কোন অংশ দেখা যায়। অতি আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি এই বাড়িটা। চকচকে পালিশ করা পিচ, পাইনের তক্তা দিয়ে বানানো সম্মুখভাগের বীমের উপর সুন্দর কাঠের ছাদ, তাছাড়া প্রত্যেকটি ঘরে টেলিভিশনও রয়েছে। ছোটদের জন্য। সুইমিং পুল, খেলার মাঠ, খেলার জায়গা আছে হ্রদের ওপারে। মানে ভাল বন্দোবস্তই আছে। দশ ডলার ভাড়ার একক শয্যার কোন ঘর, বা ষোল ডলার ভাড়ার মোড়া খাটের কোন ঘর ভাড়া করলেই দিনে দু বার মুদি আসে লেকজর্জ থেকে মদ সরবরাহ করতে, আর লবিতে আছে কাফেটেরিয়া। চৌদ্দই জুলাই থেকে মে ডে পর্যন্ত সময়টা মালিকদের ব্যবসাটা চালাতে অসুবিধা হয়। এই সময় তাই বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয় ঘর খালি নেই। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ তিরিশ ডলার মাসিক মাইনেতে রিসেপসনিস্ট হিসাবে আমাকে নিয়োগ করার সময় অন্তত তাই বলেছিল।
মিষ্টি একটা পরশ পেলাম মনের মধ্যে। প্লেন ফল্স থেকে ফিরে যাবার জন্য যে আপদ গুলি এসেছিল সেখানেই প্লেন ফল্স হয়ে ফিরে যাবার জন্য এখানে থেকে বিদেয় হল, সেদিন সকাল থেকে বুকে যেন স্বর্গের সব কটা সুর একসঙ্গে বেজে উঠেছিল, শেষবারের মত মিস্টার ফ্যান্সী আমাকে কবজা করতে চেয়েছিল আমিও তাড়াতাড়ি তৈরি হলাম। আমার পায়ের হিল জুতাটা দিয়ে ওর পায়ের পাতাটা মাড়িয়ে দিলাম। আর ও মাড়িয়ে দেবার আগেই তার অবাধ্য হাত ছুটন্ত গিরগিটির মত আমার গায়ে বুলিয়ে নিতে পেরেছিল। তক্ষুণি আমাকে ছেড়ে দিল বাছাধন। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে ওঠা মুখখানা নরম গলায় আমাকে জানাল ঠিক আছে মোহিনী। আগামীকাল দুপুরবেলা পর্যন্ত যতক্ষণ না মালিক আসেন ততক্ষণ শুধু খেয়াল রেখ এই কুঠীর দেখাশুনা যেন ভালভাবে হয়। আজ রাতে তোমার জন্য মিষ্টি স্বপ্নের কামনা করছি। তারপর আপদটা একটা হাসি হাসল, যেটা আমার কাছে দুর্বোধ্য। ওদিনের ওর বৌ ঘটনাটা দেখে ওকে তীক্ষ্ণ গলায় ডাকতেই ও চলে গেল।
