পল সেন্ডার রাস্তার দিকে তাকিয়ে বলে, চারদিকে যুদ্ধের নিদর্শন হিসেবে জমি এবড়ো খেবড়ো হয়ে গেছে। তাদের বাড়ি থেকে সীমানার দূরত্ব দেড়শ গজ। সেই জন্যই ২৭২-এর এই জায়গাটা পছন্দ।
যদিও দিনের বেলা ৩০ গজ রাস্তা পার হওয়া খুবই কষ্টকর। রাত্রেও সাবধান না হলে সহজে রাস্তা পেরোন খুবই বিপজ্জনক।
সে জন্যই রাশিয়ান ঘাতকেরা এখানে ওৎ পেতে থাকবে। যাতে ২৭২ জিনারস্ত্রাসের রাস্তা পার হবার সময় ওদের গুলিতে নিহত হয়। কারণ রাশিয়ানরা চায় না যে এই হত্যাকাণ্ড লোকদের মধ্যে জানাজানি হোক।
বন্ড মাথা নেড়ে ক্যাপ্টেন সেন্ডারকে সায় দেয়। বন্ডের সম্মতিতে উৎসাহিত হয়ে তাকে রাস্তার ওপারে দশ তলা বাড়িটার দিকে তাকাতে বলে। ঐ বাড়িটাকে পূর্ব জার্মানির মগজ বলা যায়। ওখানে ২৪ ঘণ্টা কাজ হয়। আলো দেখা যাওয়া জানালা গুলো নয়, অন্ধকার জানালা গুলোই লক্ষ্য বস্তু। ঐ সব ঘরগুলো থেকেই, জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার সময় শত্রুদের হত্যা করা যাবে। কেউ জানতেও পারবে না, আবার কাজও হাসিল হবে।
ক্যাপ্টেন পল একটু সময় দশ তলার বাড়িটার দিকে তাকিয়ে হিসেব করে বলে এখান থেকে দশ তলা বাড়ির জানালাগুলোর দূরত্ব হবে তিনশ থেকে তিনশ দশ গজ।
রাত্রে রাস্তাটা জনমানব শূন্য হয়ে যায়। মাঝে মধ্যে দু-একটা টহলদার সাজোয়া গাড়ি যাতায়াত করে।
কিন্তু গতকাল অবশ্য সন্ধ্যের মধ্যেই কিছু লোক বাড়িতে ঢোকে এবং বেরিয়েও যায়। তবে ঐ বাড়িটায় সরকারী সাংস্কৃতিক মন্ত্রকের মেয়েদের অর্কেস্ট্রা পার্টি আছে। তাদের গানের শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার উপক্রম হয়।
কিন্তু আশ্চর্য এখান থেকে KGB-র কোন ঝানু গোয়েন্দাকে দেখতে পাচ্ছি না। এ বিষয়ে কারুরই ব্যস্ততা দেখা যাচ্ছে না।
পল সেন্ডার চুপ করলে বন্ড মনে মনে সব জিনিসটা ছক করে নেয়। বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে পানির ঝাঁপটা দেয়। তাকে রাখা ঔষুধের মধ্যে থেকে টুইনাল -এর দুটো বড়ি খায়। নরম বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।
দুপুর বেলা ঘুম থেকে উঠে বন্ডের শরীরটা বেশ ঝরঝরে হয়ে যায়। জানালার পর্দা সরিয়ে দেয়, কারণ বন্ড আলো আসাটাকে ভালবাসে।
পল কালকের যে সব কথাগুলো বলেছে সেগুলো বন্ড একবার ভাল করে ঝালিয়ে নেয়। তারপর বন্ড রান্না ঘরে গিয়ে দেখে একটা পাউরুটির প্যাকেটের গায়ে লেখা, ইচ্ছা করলে বাড়ির বাইরে যেতে পারে তবে বিকেল পাঁচটার মধ্যে অবশ্যই ফিরতে হবে। যন্ত্র ঠিক সময় পাঠিয়ে দেওয়া হবে। সেটা আর্দালি দিয়ে আসবে।
বন্ড গ্যাসের আগুনে পাউরুটির কাগজটা পুড়িয়ে ফেলে। বেকন আর ডিম ফাটিয়ে মাখন লাগানো পাউরুটির ওপর পুরু করে লাগিয়ে দেয়। মদ মেশানো বিনা দুধের কফির সঙ্গে খেয়ে ফেলে। অল্প সময়ের মধ্যে সাধারণ জামা কাপড় পরে ফ্লাট থেকে বেরিয়ে যায়।
তারপর একটা কফির দোকানে গিয়ে এসপ্রেসো কফি পান করে। রাস্তার প্রত্যেকটি লোকই ব্যস্তভাবে চলাফেরা, করছে। কারও এদিকে ওদিকে তাকাবার সময় নেই।
পায়ে পায়ে বন্ড লেকের ধারে আসে। সেখানকার পাতাগুলো যেন সেজেগুজে বন্ডকে অভ্যর্থনা জানায়। বন্ড শুকনো পাতা মাড়িয়ে একটা রেস্টুরেন্টে ঢোকে। সেখানে পেট ভরে খায়। এবার তার বেশ ভাল লাগে। তারপর নিজের বাড়ির দিকে যায়। বাড়ির কাছে এসে দেখে একটা যুবক গাড়ি ঠিক করছিল। সে একমনে ছিল, এদিক ওদিকে কোন মন ছিল না।
বন্ড হাসে এবং মনে মনে ভাবে লোকটাকে সে চেনে। সে WB বিভাগের ট্রান্সপোর্ট শাখার কর্পোরাল। পল। সেন্ডারের কাছ থেকে ইঙ্গিত পাবার সঙ্গে সঙ্গে সে গুলির শব্দকে ঢাকার জন্য পরপর কয়েকটা ইঞ্জিনের ব্যাক ফায়ার করবে, তা না হলে গুলির শব্দ শুনে আশেপাশের লোকেরা পুলিশকে টেলিফোন করবে। তার জন্য ঝামেলাও বাড়বে। বড়কর্তা M এ ধরনের ঝামেলায় জড়ানোকে মোটেই পছন্দ করে না। রাশিয়ান গুপ্তঘাতকরাও এরকম ঝুট ঝামেলাকে এড়িয়ে চলে।
ফ্লাটে ঢুকে বন্ড দেখে তার আসার আগেই খাটের উপর দিয়ে জানালার ধারে গোবরাটের গোড়ায় কাঠ ও ধাতুর তৈরি একটা স্ট্যান্ড দাঁড় করানো হয়েছে এবং তার উপর বসানো আছে তার প্রিয় রাইফেল। যদিও রাইফেলের মুখটা পর্দা থেকে খুব সামান্যই বেরিয়ে আছে। তাছাড়া কোমর পর্যন্ত লম্বা একটা কালো জামার সঙ্গে কালো রঙের একটা মুখোশ বিছানায় আছে। সে মুখোশে শুধু দুটো চোখ ও মুখের দিকে ফুটো আছে। এগুলো শত্রুপক্ষের চোখ এড়ানোর জন্যই করা। ক্যাপ্টেন পল সেন্ডারের বিছানার উপরেও সে রকমই কালো পোশাক। এক জোড়া দুরবীণ ও ওয়াকিটকির মাইক্রোফোন। গোয়েন্দা স্টেশন থেকে পরিস্থিতি অদল বদলের কোন খবর না পাওয়ায় সেন্ডারকে বেশ গম্ভীর দেখায়।
ক্যাপ্টেন পল বন্ডকে কিছু খাবার খেতে বলে। জেমস্ বন্ড ক্যাপ্টেন পল সেন্ডারকে ধন্যবাদ জানায়। নিজের মনের উত্তেজনা কমানোর জন্য হালকা বই পড়তে থাকে। বইয়ে মনোনিবেশ করতে চেষ্টা করে।
ক্যাপ্টেন পল সেন্ডার উত্তেজনা বশে বারবার হাত ঘড়ির দিকে তাকায়, পায়চারি করে, সিগারেট খায়।
দেখতে দেখতে বিকাল পাঁচটা বাজে।
জেমস বন্ড একসাথে দুটো চুইংগাম ফেলে মুখোশ পরে নেয়। ক্যাপ্টেন পল সেন্ডারও জেমস বন্ডের মত কালো মুখোশ পরে ঘরের আলো নিভিয়ে দেয়। ঘরটা অন্ধকার হলে সে জেমস্ বন্ডের পাশে বিছানার উপর উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে।
