দশদিন পরে। ঘরে তিল ধারণের জায়গা নেই। বালিশে ঠেস দিয়ে বসে আছে বন্ড। তার বাঁ দিকে পুলিশ কমিশনার কালো ইউনিফর্মে রূপালি ব্যাজ লাগিয়ে। ডানদিকে সুপ্রিম কোর্টের মহামান্য বিচারপতি। ফেলিক্স এখন ক্রাচে ভর দিয়ে হাঁটছে। মেরী গুডনাইট লক্ষ্মী মেয়ের মত বিছানার পাশে কাগজ পেন্সিল নিয়ে হাজির। বন্ড মনে মনে চাইছিল ফেলিক্স লিটারের সাথে একটা গোপনে কথা বলবে। পুলিশ কমিশনার বলতে শুরু করলেন, কম্যান্ডার বন্ড আজ আমরা এখানে মিলিত হয়েছি মামুলি নিয়ম রক্ষা খাতিরে। তিনি বললেন, ওয়েস্ট মোরল্যান্ড প্যারিসের থান্ডারবার্ড হোটেলে সম্প্রতি কয়েকটি আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন কুখ্যাত গুণ্ডা জমায়েত হয়। এদের উদ্দেশ্য ছিল অন্তর্ঘাতমূলক কার্যকলাপের দ্বারা জ্যামাইকার চিনি-শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত করা। আমি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘটনাগুলি উপস্থিত করি। কমিশনার বলে চললেন, নির্দেশ অনুযায়ী জ্যামাইকা সে আই ডির সাথে যোগাযোগ রেখে বন্ড, নিকলসন ও লিটার তাদের কর্তব্য যে ভাবে পালন করেছেন তার কোন তুলনা নেই। তিনি একটি সীল করা প্যাকেট বন্ডকে, একটি লিটারকে আর একটি কর্নেল ব্যারিস্টারকে দিলেন। আমরা গ্রেট ব্রিটেনের কম্যান্ডার বন্ড, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ফেলিক্স লিটার ও মিঃ নিকোলাস নিকলসনকে তাদের সাহস ও বীরত্বব্যঞ্জক কাজ জ্যামাইকা রাজ্যের সেবার জন্য জ্যামাইকার পুলিশ মেডেলস প্রদান করলাম। সকলেই হর্ষধ্বনি করলেন। সকলে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। লিটার রহস্যময় হাসি হেসে বন্ডকে বলল, কি একখানা ছাড়ল মাইরি। এ রকম মিথ্যের ওপর মিথ্যে চাপিয়ে কর্ম সারা কখনো দেখিনি, তার ওপর আমরা একখানা করে পুরস্কারও বাগালাম। লিটার বলল, চলি এবার। ফেলিক্স দেখল বন্ডের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। খোঁড়াতে খোঁড়াতে সে দরজা খুলে ধরল, একটু হাত উঁচু করল। এই দুজনে জীবনে কখনো পরস্পর পরস্পরের করমর্দন করেনি। আচ্ছা চললাম মিস গুডনাইট। মেট্রনকে বলে দেবেন আর ভয় নেই। আর ওকে বলবেন কয়েক সপ্তাহ যেন আমার কাছ থেকে দূরে দূরে থাকে। ওকে দেখলে আমার কি রকম যেন হয়। আর একবার হাত তুলে বন্ডের দিকে তাকিয়ে খোঁড়াতে খোঁড়াতে বেরিয়ে গেল।
.
ইতি
সপ্তাহখানেক পরের কথা। জেমস বন্ড কোমরে একখানা তোয়ালে জড়িয়ে একটা চেয়ারে বসে গুপ্তচরবৃত্তি-সংক্রান্ত বই পড়ছিল। ঘড়ির দিকে তাকাল, চারটে বাজে। এই গরমে টাটকা গোলাপের মত চেহারা নিয়ে গুডনাইট এসে ঢুকল। একটি চিঠি বন্ডকে দিল। একান্তই ব্যক্তিগত, M পাঠিয়েছেন। M লিখেছেন, তোমার ও বন্ধুদের চিঠি পেয়েছি। তুমি বিপদজনক কাজটি করতে পেরেছ বলে আমি সন্তুষ্ট। আশা করি আমার স্বাস্থ্য ভাল আছে। পরের কাজের জন্য রিপোর্ট কবে করছ?
বন্ড মনে মনে ভাবল বুড়োটা তাহলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। আসলে ওর মতলব ঐ হতচ্ছাড়া অফিসে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। এবার বন্ড গুডনাইটকে ভাল করে লক্ষ্য করতে লাগল, ধোপদুরস্ত পোশাকে ছিমছাম বসে, একটা পা আর একটার মধ্যে জড়ানো। ছোট চুল ঘেরা ফর্সা মুখটি আনন্দে উদ্দীপ্ত। এই মেয়েটি সবসময় কাছাকাছি থাকলে মন্দ হয় না। সেক্রেটারি করে রাখা যায় না কি অন্য কিছু করে। অনেক দিন ধরেই এ কথা ভাবছে সে।
আর একটি খবর পড়া হয়নি প্রধানমন্ত্রী রাণী এলিজাবেথের কাছে প্রস্তাব করেছেন বন্ডকে নাইট উপাধি দেওয়ার জন্য। নিচে M স্বাক্ষর না করে দুটি বড় বড় শব্দ ব্যবহার করেছেন।
গুডনাইট চোখ নিচু করল। সে জানত আসলে বন্ড খুশি হয়েছে। রুমাল দিয়ে কপালের ঘাম মুছে ফেলল জেমস্। গুডনাইট ভাবল, জেমস বন্ড এই নামটিই তাকে শুধু মানায়। এর আগে পরে মাঝখানে অন্য কিছু নয়। কম্যান্ডার হলেও এই পদবীটা সে কদাচিৎ ব্যবহার করে।
বন্ড মেরীকে বলল, লিখে নাও যা বলছি। কেবলের নম্বর দাও। পেয়ে বাধিত হলাম। একমাসের মধ্যে লন্ডনে। ফিরব। অনুগ্রহ করে মহামান্যা মহারাণীকে জানাবেন আমি সম্মানের জন্য অতীব অনুগৃহীত কিন্তু যথাবিহিত সম্মান। সহকারে জানাচ্ছি এই সম্মান গ্রহণে আমি অক্ষম। আসল কারণ হল আমি হোটেলে আর রেস্টুরেন্টে বেশি টাকা গুনতে রাজি নই। আশা করি আপনি বুঝবেন। ইতি।
খাতাটা বন্ধ করল মেরী। সে চোখ নিচু করে বন্ডকে বলল, মেট্রন বলছিলেন, তুমি এই সপ্তাহের শেষে ছাড়া পাবে। কিন্তু তারপরেও আর তিন সপ্তাহ…কোথাও যাবে ঠিক করেছ কিছু
কিছু ভাবিনি। তুমি কি বল?
আমার বাড়িটা আছে মোনাগ্রামের পাশে। একটা বাড়তি ঘরও আছে। কিংসটন বন্দরের দৃশ্যও দেখা যায়। ঠাণ্ডা জায়গাটা। বাথরুম অবশ্য–একটু লাল হয়ে উঠল সে। আর কেউ থাকছে না। তবে জ্যামাইকাতে এ ব্যাপারে নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না।
কি সব ব্যাপার নিয়ে দুষ্টুমি করে বলল বন্ড। এই অবিবাহিত ছেলে আর মেয়ের এক সাথে থাকা!
মেরী আরও বলল, আমার বাড়ির খুব কাছেই লিগুয়ানিয়া ক্লাব। সেরে গেলে সেখানে আড্ডা মারতে পার। আর আমি রান্না করব, তোমার বোম সেলাই করে দেব।
মেয়েরা যে কত ধূর্ত তার একটি প্রমাণ হল এই ধরনের কথা। বন্ড বলেই ফেলল, গুডনাইট তুমি কি ভাল!
বলল বটে কিন্তু তার মনের গভীরে তখনই সে জানে মেরীর চেয়ে অন্য কোন মেয়ের ভালবাসা তার কাছে যথেষ্ট নয়। একটা ঘরে সারাক্ষণ কাটানো, একই দৃশ্য প্রতিদিন দেখা বন্ডের কাছে শেষ পর্যন্ত এক ঘেয়ে হয়ে যেতে বাধ্য।
দি লিভিং ডেলাইটস 007
দি লিভিং ডেলাইটস 007 — জেমস বন্ড
