.
মানুষ না কাঁকড়া
প্রায় বিশ গজ দূরে নদীর দিকে কে যেন কাশলো। উৎকর্ণ হয়ে বসে পড়ল বন্ড। দাঁতে পিস্তলটা কামড়ে হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে লাগল সে।
কিছুটা গিয়ে দেখল একটা ছড়ানো শেকড়ের ওপর পড়ে আছে কারামাঙ্গা। ডান দিকের স্যুট রক্তে কালো। তার ওপর দিয়ে পোকা-মাকড় হাঁটছে। নির্বিকার মুখ, চোখ দুটো অত্যধিক জীবন্ত। থেকে থেকে চারদিকে নজর বুলিয়ে নিচ্ছে। স্কারামাঙ্গার দুটো হাতই শেকড়ের ওপর রাখা। পিস্তল আছে বলে মনে হল না। হঠাৎ বন্ড দেখল একটা সাপ, গায়ে হালকা বাদামী বরফি আঁকা এঁকেবেঁকে স্কারামাঙ্গার দিকে চলেছে। মন্ত্রমুগ্ধের মত দেখতে লাগল বন্ড। সাপটা বোধহয় অজগর হবে, লম্বায় পাঁচ ফুটের মত। ফনা উঁচু করে এগিয়ে চলেছে।
স্কারামাঙ্গার মুখের একটি পেশিও নড়ল না। প্যান্টের ছায়ায় এসে পড়ল সাপটা। ভিজে শার্টের দিকে ক্রমশ উঠতে লাগল। হঠাৎ স্কারামাঙ্গার গায়ের উপর পড়ে থাকা ইস্পাতের ফলাটা লাফিয়ে উঠে সাপটার মাথা ফুটো করে সোজা মাটিতে বিধে গেল। কিছুক্ষণ মৃত্যুযন্ত্রণায় ছটফট করে থেমে গেল সাপটা। স্কারামাঙ্গা ছুরিটা ছাড়িয়ে নিয়ে এক কোপে সাপটার মাথা কেটে ফেলল। বন্ড ঝোঁপের মধ্যে থেকে লক্ষ্য করল–স্কারামাঙ্গার শরীরে যতই রক্তপাত হোক, তার হাতের অব্যর্থ টিপ দেখে এটুকু বোঝা যায়, স্কারামাঙ্গা এখনো মারাত্মক হয়ে আছেন। এবারে স্কারামাঙ্গা চারদিকে চোখ বুলিয়ে ছুরি দিয়ে সাপটাকে কেটে তার মাংস খেতে লাগলেন। বন্ড এবার পিস্তল হাতে নিয়ে একেবারে স্কারামাঙ্গার সামনে এসে দাঁড়াল।
কবজি ঘোরাবার একটা দ্রুতভঙ্গি, সাথে সাথে শাঁ করে ছুরিটা উঠে গেল আকাশে। ইস্পাতের চাকার মত রোদে ঝিলিক দিয়ে এসে পড়ল, বন্ড যেখান থেকে সময়মত সরে দাঁড়িয়েছিল। এসে সোজা গেঁথে গেল কাদার মধ্যে। হেসে উঠল স্কারামাঙ্গা। বন্ড বলল, তোমার সময় ফুরিয়ে এসেছে, স্কারামাঙ্গা। আমার বন্ধুদের খুন করেছ তুমি। তোমাকে খুন করার লাইসেন্স আমার আছে। খুন তুমি আমার হাতেই হচ্ছ, তবে বেশিক্ষণ লাগবে না। ভাল কথা, জীবনে তুমি ক টা লোক খুন করেছ? তোমার হোটেলের পেছনের নদীটায় শুয়ে আছেন মিঃ রটকফ। মাথার খুলির মধ্যে তোমার সেই বিখ্যাত বড় ভুল হয়ে যাচ্ছে স্কারামাঙ্গা। যে সব পাহারাদার জুটিয়েছিলে, সব কটা অন্য দলের। তোমার দুই ম্যানেজার সি আই এর চর। ইতিমধ্যে তোমাদের সব কথাবার্তার টেপটি ওয়াশিংটন চলে গেছে। রসকে তুমি খুন। করেছ, এই স্বীকারোক্তিও ওর মধ্যেই আছে। এবার বুঝেছ, কোন দিক থেকে তোমার নিস্তার নেই।
এখুনি যা ঘটতে যাচ্ছে তার নিষ্ঠুরতার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল বন্ড। লোকটা পরম নিশ্চিন্তে শেকড়ে হেলান দিয়ে শুয়ে আছে, সমান তালে নিঃশ্বাসের সাথে ওঠানামা করছে বুক। পাথরের মত মুখ, সেখানে পরাজয়ের ছায়ামাত্র নেই। বন্ডের মনে হল তার হত্যার ইচ্ছাটা কেমন ফিকে হয়ে আসছে। দু হাত দিয়ে পিস্তলটা ধরে তাক ঠিক করল সে।
স্কারামাঙ্গা একটা হাত তুলল। এই প্রথম তার মুখের ভাব বদলাল, এক মিনিট ভাই, আমার প্রার্থনাটা বলে নিতে দাও। তারপর প্রাণ ভরে গুলি চালিয়ো।
পিস্তল নামাল বন্ড, ঠিক আছে কয়েক মিনিট সময় দেওয়া গেল, কিন্তু তার বেশি নয়।
ধন্যবাদ। স্কারামাঙ্গা চোখটা ঢেকে নিয়ে বিড়বিড় করে ল্যাটিন মন্ত্র জপতে শুরু করল। পিস্তল নামিয়ে বন্ড রোদ মাথায় করে দাঁড়িয়ে রইল, চোখ স্কারামাঙ্গার দিকে।
স্কারামাঙ্গার ডান হাত ধীরে ধীরে কানের দিকে এগোতে লাগল, কান পর্যন্ত গিয়ে থামল। ল্যাটিন মন্ত্রপাঠ চলছে। হঠাৎ মাথার পেছন থেকে লাফিয়ে উঠল সোনালি ডেরিংগার। তীব্র গর্জন, বন্ড চমকে উঠে ঘুরে আছাড় খেয়ে পড়ল মাটিতে। বেড়ালের মত ক্ষিপ্রগতিতে স্কারামাঙ্গা হাতের ছোরাটা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। বন্ড ততক্ষণে আহত জন্তুর মত মাটিতে পড়ে ওলোটপালট খাচ্ছে। তার হাতের যন্ত্রটি একবার, দু বার, পাঁচবার গর্জে উঠল। স্কারামাঙ্গার হাত থেকে ছোরাটা মাটিতে পড়ে গেল। হৃদপিণ্ড ধক্ করে একেবারে চিরদিনের জন্য বন্ধ হয়ে গেল। চিৎপাত হয়ে পড়ে গেল সে। কেউ যেন তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। দু হাত দুদিকে ছড়ান।
.
ধামাচাপা কারবার
নদীর ধারে ধারে গদাইলস্করি চালে হেঁটে আসছিল একজন রেল পুলিশের লোক। ফেলিক্স লিটার বলেছিল, জলার মধ্যে একটা পাজি লোক একটা ভাল লোককে তাড়া করেছে, হয়ত গুলিও ছুঁড়তে পারে। আপাতত ফেলিক্সকে মর্ফিয়া দিয়ে রাখা হয়েছে।
গুলির শব্দ, সেই সাথে জলার পাখিগুলোর বিকট চিৎকার অনুসরণ করে সে অকুস্থলের খানিকটা আন্দাজ পেল। কিছুটা যাবার পর দেখল দুটি দেহ মাটিতে পড়ে আছে। তাদের পিস্তল দুটি মাটিতে পড়ে আছে। তাদের পিস্তল দুটি দেখল তারপর হুইসিল বার করে তিনবার জোরে ফুঁ দিল।
এক সপ্তাহ পরে জ্ঞান ফিরল বন্ডের। ঘরে সবুজ আভা। তার মনে হল, সে পানির তলায়। নার্সের কানে এল অদ্ভুত গোঙানি। নার্স নাড়ি দেখল। বন্ড তাকাল কিন্তু কিছু ঠাহর করতে পারল না। এই বুঝি মৎস্যকন্যা। ডক্টর ম্যাকডোনাল্ড এসে ব্যান্ডেজ বদলে দিলেন আর কিছু ফলের রস দিতে বললেন। বললেন, বুলেট প্রচণ্ড বিষাক্ত ছিল। ভাগ্যিস সাভলা মারের লোকটি সাপের বিষ বুঝতে পেরে সেইমত ওষুধ দিয়েছিল। ও-ই প্রাণ বাঁচিয়েছে বলতে গেলে। আর এক সপ্তাহের মধ্যে কাউকে যেন দেখা করতে না দেওয়া হয়।
