.
জলেকাদায়
অ্যাকসিলেটারের ডাণ্ডার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে বন্ড সেটা প্রাণপনে টানতে লাগল। মাত্র একশ গজ বাকি। বাঁচাবার একমাত্র উপায় ব্রেক ভ্যানে গিয়ে ব্রেক কষা, কিন্তু সেখানে স্কারামাঙ্গা। ড্রাইভারের হাত কাটারি। জেমসের হাতে পিস্তল দেখে ঘাবড়ে গিয়ে পিছনে দাঁড়িয়েছে সে। মেরিকে বাঁচাবার আর কোন উপায় নেই, বন্ড বাঁ দিকে এক লাফ মারল। হেনড্রিকস পিস্তল বের করল কিন্তু ঘোরাবার আগেই তার দু চোখের মধ্যে বন্ডের গুলি গিয়ে ঢুকে গেল। এক ঝাঁকানিতে মাথা থেকে টুপিটা খসে গেল, পিছন দিকে গড়িয়ে পড়ল মাথাটা। সোনার পিস্তল গর্জে উঠল একবার। ড্রাইভারটা বিকট আর্তনাদ করে গলা চেপে লুটিয়ে পড়ল। আর পঞ্চাশ গজ, মেয়েটির কব্জিতে আর হাঁটুতে দড়ি বাঁধা। ট্রেন ছুটে চলেছে মেয়েটির অনাবৃত বুক লক্ষ্য করে। বন্ড দাঁতে দাঁত চেপে সেই দৃশ্য না ভাববার ভান করল। বাঁ দিকে ঝাঁপ দিয়ে ও পরপর তিনটে গুলি ছুঁড়ল, মনে হল দুটো ঠিক জায়গায় লেগেছে। হঠাৎ তার বাঁ কাঁধে তীব্র আঘাত। ছিটকে পড়ল বন্ড, কেবিনে লোহার মেঝের ওপর। মাথাটা পাদানির কাছে। সেখান থেকেই দেখতে পেল সে মেয়েটির মাথা ধড় থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে কাঁধের যন্ত্রণার কথা ভুলে কয়লার গাড়ির ডানদিক ঘেঁষে এগোতে লাগল। একসাথে চারটে পিস্তল গর্জে উঠল। মাথাটা চট করে আড়াল করে নিল সে। কিন্তু এক অপূর্ব দৃশ্য সে দেখতে পেল। দেখল স্কারামাঙ্গা সিংহাসন থেকে পড়ে হাঁটু গেড়ে বসে আহত জন্তুর মত ছটফট করছে।
এমন সময় ট্রেনের পেছন থেকে একটা পরিচিত গলা শোনা গেল। লিটারের গলা, শোনো চারজন তোমরা। পিস্তল ফেলে দাও, দাও বলছি। গুলির শব্দ, মিঃ গ্যাংগেরেলা ইহলীলা শেষ করলেন। হাত তোেল মাথার পেছনে। জেমস। লড়াই শেষ ঠিক আছে ঠিক থাকলে সামনে এস। এখনো শেষটা বাকি। তাড়াতাড়ি করতে হবে।
সাবধানে দাঁড়াল জেমস্ বন্ড। এতটা তো বিশ্বাস করা যায় না। লিটার নিশ্চয় ব্রেকভ্যানের পেছনে বাফারে ঝুলতে ঝুলতে এসেছে। বন্ডের গুলিবৃষ্টির জন্যই সে আগে বেরোতে পারেনি। ঐ তো লিটার। স্কারামাঙ্গার দেহের ওপর পা ফাঁক করে দাঁড়িয়ে, হুকের মধ্যে পিস্তল আটকানো। এতক্ষণে বন্ডের কাঁধের যন্ত্রণা শুরু হল। লিটার বলল, চটপট লাফ দাও আর দেরি করো না। আমি থাকছি এই লোকগুলোকে পুলিশের হাতে তুলে দেব গ্রীন হারবারে, মাথা ঝাঁকিয়ে সে ইঙ্গিত করল যে আসলে এটা মিছে কথা।
ট্রেন গমগম আওয়াজ তুলে কালভার্টের ওপর দিয়ে চলেছে। সামনে দেখা যাচ্ছে অরেঞ্জ নদীর ব্রিজ। কেবিন থেকে সিঁড়িতে নামল বন্ড। তারপর সাবধানে সময় বুঝে ঝাঁপ দিল নরম তলতলে কাদা ভর্তি পুকুরে। সাথে সাথে পানি থেকে বিকট গন্ধ বেরিয়ে ছড়িয়ে পড়ল। কাদার মধ্যে দিয়ে ছপছপ করতে করতে বন্ড উঠে এল কঠিন পাড়ে। হাঁটু গেড়ে বসে বমি করে ফেলল সে। যখন মাথা তুলল দেখল ফেলিক্স লিটার ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিচ্ছে, প্রায় দু শ গজ দূরে। কিন্তু একটু বেকায়দায় পড়ল কারণ পড়ে আর উঠল না। এমন সময় আর একটি লোক ট্রেন থেকে ঝাঁপ দিল, স্কারামাঙ্গা ছাড়া আর কেউ হতে পারে না। তার মানে খেলা এখনো বাকি রয়ে গেল। একঝাক প্রজাপতি রোদে নেচে বেড়াচ্ছে।
বন্ড আস্তে আস্তে উঠে লাইন ধরে ব্রিজের দিকে হাঁটতে লাগল। দুর্গন্ধ কাদার মধ্যে পড়ে আছে লিটার। যন্ত্রণায় মুখ দিয়ে শব্দ বেরিয়ে এল। কিন্তু সেই মুহূর্তে নিজের ওপর রাগ হচ্ছিল আরো বেশি। দেখলাম রক্তে মাখামাখি জামা ভিজে গেছে, চোখ বন্ধ, ভাবলাম না মরলেও ব্রিজের সাথে উড়ে যাবে। ক্ষীণ হেসে জিজ্ঞেস করল সে, কি রকম হল কায়দাটা। ব্রিজ অন দি রিভার কোয়াই-এর মত? ঠিক ফেটেছিল তো।
বন্ড বললে, দারুণ বাজি পুড়ল। এবার কুমিরদের ভোজ হচ্ছে। কিন্তু ঐ প্লাসটিকের মূর্তিটা। এটাও তোমার কর্ম?
দুঃখিত। মিঃ এস-এর হুকুম। ভাবলাম সেই ফাঁকে ব্রিজ ওড়াবার ব্যবস্থাটাও হয়ে যাবে। আমি কি জানি যে তোমার বান্ধবীর সোনালি চুল, আর তুমিও ঐ দেখে ভুলে যাবে। লিটারের বগলে হাত দিয়ে যতটা সম্ভব আস্তে বন্ড ওকে টানতে টানতে একটু শুকনো জায়গায় নিয়ে গেল। মস্ত ঝোঁপের তলায় ছায়া। যন্ত্রণায় দরদর করে ঘামতে লাগল লিটার। কাতর শব্দ করে অজ্ঞান হয়ে গেল। বন্ড ওর বেল্ট থেকে পিস্তলটা বের করে বাঁ হাতের পাশে রেখে দিল। যদি সে কোন পিবদে পড়ে তাহলে স্কারামাঙ্গা নির্ঘাৎ ফেলিক্সের ওপর গায়ের ঝাল ঝাড়তে আসবে।
ঝোঁপের গা ঘেঁষে বন্ড এগোতে লাগল ব্রিজের দিকে। কিছুক্ষণ খোলা জায়গা দিয়ে যেতে হবে। লোকটার পায়ের দাগ নজরে পড়তে পারে।
তখন দেড়টা বাজে। সূর্য মাথার ওপর। একটা গাছের শেকড়ে হোঁচট খেয়ে প্রায় পড় পড় হল বন্ড। হাত বাড়িয়ে ঝোঁপটা ধরতে গেল, পারল না। সশব্দে আছাড় খেল একখানা, সমুদ্র থেকে ভেসে আসা বাতাস জলার ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। হামাগুড়ি দিয়ে উঠে দাঁড়াল বন্ড। জোর করে মনের শক্তি ফিরিয়ে আনল কারণ তার এখন কাজ পড়ে আছে অনেক। ব্রিজে পৌঁছাতে আর একশ গজ। যতটা সম্ভব নদীর সাথে সমান্তরাল যাবার চেষ্টা করছিল সে। কান খাড়া করে চলেছে সে। কোথাও এতটুকু শব্দ হলেই যাতে সে শুনতে পায়। যখন বন্ড আন্দাজ করছে জলার মধ্যে প্রায় দুশো গজ হেঁটে এসেছে, সেই সময় হঠাৎ কাশির শব্দ শোনা গেল।
