স্কারামাঙ্গার গলা আবার শোনা গেল, আমার ওপরওয়ালার মতে, মাফিয়ারা নিজেদের ছাড়া অন্য কারো কথা ভাবে না। আমার মিঃ সি মনে করেন আমেরিকার খুব-একটা সুবিধা হবে না। ওখানে কিউবা বিরোধী মনোভাব খুব জোরাল। তবে ওঁর মতে, ক্যারিবিয়ান এলাকায় নানা ছোটখাট কাজ ওদের দ্বারা হতে পারে। চলুন, সাড়ে এগারটা বাজে। এবার যাবার চেষ্টা করা যাক। বারোটায় ট্রেন। আজ দিনটা ভালই কাটবে মনে হচ্ছে। ইংরেজ ব্যাটাকে কেমন ধোলাই দেওয়া হয় ওপরওয়ালা দেখলে বেশ হত।
দরজা থেকে সরে গেল জেমস্ বন্ড। স্কারামাঙ্গার চাবি খোলার শব্দ হল। স্কারামাঙ্গা আর হেনড্রিকস দুজনেই গম্ভীরমুখে বন্ডের দিকে তাকিয়ে দেখল।
.
ট্রেন দুর্ঘটনা
বারোটার সময় সকলে হলে জড়ো হল। নিখুঁত স্যুটের ওপর চওড়া হ্যাট পরে স্কারামাঙ্গাকে দেখাচ্ছে যেন বিরাট জমি জমার মালিক। যে ধরনের লোক দক্ষিণে প্রায়ই দেখা যায়। হেনড্রিকসের পোশাক শীতের দেশের মত। বাকি চারটা শয়তান প্যান্টের ওপর ঝুলিয়ে চকরা-বকরা শার্ট পরেছিল। দেখে বন্ড খুশিই হল। কারণ ঝোলান শার্টের তলা থেকে পিস্তল বের করতে একটু সময় লাগে।
স্কারামাঙ্গা অন্যদের দিকে ফিরল। শোন সবাই। আমরা প্রথমে গাড়িতে স্টেশন যাচ্ছি। এক মাইল, তারপর একটা ছোট রেলগাড়িতে উঠছি। তারপর আখ খেতের মধ্যে দিয়ে মাইল কুড়ি গিয়ে গ্রীন আইল্যান্ড বন্দরে পৌঁছাচ্ছি। তারপর আমরা চড়ব একটা বড় স্টিমারে। স্টিমারটার নাম থান্ডারগার্ল। সমুদ্রের ধারে লুসিয়া বলে একটা ছোট্ট শহর আছে সেই পর্যন্ত আমরা যাব। বেশ, তাহলে যাওয়া যাক্।
বন্ডকে বলা হল গাড়ির পেছনের সিটে বসতে। যাত্রা শুরু হল। পিছন থেকে স্কারামাঙ্গার ঘাড় দেখে বন্ডের হাত নিশপিশ করতে লাগল। কিন্তু খোলা মাঠ, পালাবার উপায় নেই। পিছনে চারটা গুণ্ডা পিস্তল নিয়ে। বন্ড হাসল। কি জানি কেন তার মেজাজ খুব খুশি খুশি লাগছিল। এই লোকটার পেছনে দেড় মাস ধরে ঘুরছে সে। বন্ড ঠিক করল অপর পক্ষকে আরো অসতর্ক হবার সুযোগ দিতে হবে। এমন ভান করতে হবে যে, সে নেহাতই একজন ভদ্রলোক ইংরেজ। বন্ডের রক্ত দ্রুত বইতে লাগল, নাড়ি চঞ্চল হয়ে উঠল।
কলোরাডোতে যে সময় ছোট লাইনে রেলগাড়ি চলত সেই যুগের আদলে তৈরি অপূর্ব একটি স্টেশন। স্টেশনের নাম থান্ডারবার্ড হল্ট, কারুকার্য খোদিত অক্ষরে লেখা। বিরাট পেতলের হেড লাইটের পিছনে চোঙা থেকে সরু ধোয়া উঠছে। উৎসাহে টগবগ করতে করতে কারামাঙ্গা সকলকে উদ্দেশ্য করে বললেন, বন্ধুগণ, ট্রেন হুইসল দিচ্ছে, উঠে পড় ন সবাই। তারপর একটা কাণ্ড হল। সোনার পিস্তল বের করে বন্ডের হতভম্ব দৃষ্টির সামনে আকাশে তাক করে ট্রিগার টিপল সে। স্টেশনের দেওয়াল থেকে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল দুম শব্দ। স্কারামাঙ্গা পিস্তলটা ভাল করে দেখল। তারপর চিন্তিতমুখে বন্ডের দিকে ফিরে বলল, ঠিক আছে। ওহে, তুমি সামনে ড্রাইভারের সাথে বসবে। সবাই যে-যার জায়গায় বসে পড়ল। স্টেশন মাস্টার নিশান আর ঘড়ি নিয়ে নাড়ানাড়ি করল। স্পীড গেজে উঠেছে কুড়ি। বন্ড এবার ড্রাইভারটার দিকে তাকাল। কেবিনের চারপাশে সন্তর্পণে চোখ বোলাল সে। এই তো লম্বা জ্যামাইকান কাটারি, চুঁচালো মুখে সাক্ষাৎ মৃত্যু। লোকটার হাতের কাছেই রাখা। কিন্তু তাকে কি এভাবে শেষ করা হবে? বন্ডের সন্দেহ হল। স্কারামাঙ্গা নাটকীয়ভাবে ব্যাপারটা সমাধা করতে চাইবে, যাতে ওর ঘাড়ে দোষটা না চাপে। কিংবা হয়ত হেনড্রিকসই জল্লাদের কাজটা করবে। সে দেখল পাঁচ জোড়া কুটিল দৃষ্টি যেন পাঁচ জোড়া পিস্তলের নলের মত তার দিকে উঁচিয়ে রাখা। বন্ড সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে পড়ল।
বন্ডকে মেরি যে ম্যাপটা দিয়েছিল সেটা ১/৫০,০০০ অনুপাতের সার্ভে ম্যাপ। সে সেই ম্যাপটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিল। সুতরাং আজকের এ পথ তার ভালভাবেই জানা। পাঁচ মাইল জুড়ে কেবল লম্বা লম্বা আখ গাছ। গাড়ি তার মধ্যে দিয়েই চলেছে। একশ গজ দূর থেকে একটা শকুন আকাশে উড়ল। স্কারামাঙ্গার পিস্তল হঠাৎ গর্জে উঠল। পাখিটা ঝাঁকুনি খেয়ে পড়তে লাগল নিচে।
বন্ড গলা বের করে বলে উঠল, পাঁচ পাউন্ড জরিমানা দিতে হবে। রাস্তার ফারিটাকে যদি হাত করে না থাকেন। এ পাখি মরার কথা নয়। বন্ডের মাথা ঘেঁষে গুলি চলে গেল শ করে। হো-হো করে হেসে উঠলেন কারামাঙ্গা। ওরে ব্যাটা ইংরেজ, যতবড় মুখ নয় তত বড় কথা। সাবধান, নইলে মুখটাই উড়ে যাবে। সঙ্গীরা আর একবার অট্টহাস্য করে উঠল।
বন্ড দেখল লাইনের ওপর গোলাপী মত কি যেন পড়ে আছে। ড্রাইভার গাড়ির গতি কমাবার চেষ্টা করল। শব্দ করে দুটি গুলি এসে লাগল গাড়ির মাথায়। স্কারামাঙ্গা বলে উঠলেন, গাড়ির স্টিম বাড়িয়ে দে হতভাগা।
ড্রাইবার অগত্যা গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। ট্রেন আবার ঘণ্টায় কুড়ি মাইল বেগ নিল। হাওয়ার শব্দ ভেদ করে স্কারামাঙ্গার গলা ভেসে এল। বন্ধুগণ, একটা অবাক করে দেবার মত ব্যাপার। ঐ যে লাইনের ওপর পড়ে আছে যে মেয়েটি সে হল জেমস্ বন্ডের বান্ধবী মেরি গুডনাইট। ওকে বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে। আহা যদি বন্ড বলে সেই ব্যাটা ট্রেনে থাকত তাহলে নিশ্চয়ই সে কান্নাকাটি শুরু করে দিত।
