দরজায় কে যেন টোকা মারছে, বন্ডের ঘুম ভেঙে গেল। সে বালিশের তলা থেকে পিস্তলটা টেনে নিয়ে দেওয়াল ঘেঁষে চলল, ধা করে পর্দায় টান মারতেই দেখা গেল সোনালি চুল চাঁদের আলোয় চক করছে। মেরি গুডনাইট। জেমস্ কার্পেটের ওপর পিস্তলটা ফেলে টেনে তুলল ওকে। মেরির জুতার হিল লেগে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ হয়ে গেল। মেরিকে টানতে টানতে নিয়ে ঢোকাল বাথরুমে, আলো জ্বেলে শাওয়ারটা চালিয়ে দিল, যাতে কারো সন্দেহ না হয়। মেরি বলল, আমি সেই জায়গায় গিয়ে মেয়েটার কাছ থেকে খবর পেলাম তুমি এখানে আছ। গাড়িটা গাছের তলায় রেখে আমি খুঁজে বেড়াচ্ছি। একটা জানালা খোলা দেখে ভাবলাম তুমি ছাড়া কে আর জানালা খুলে ঘুমোবে। যাই হোক একটা জরুরী খবর আছে। হেড কোয়ার্টার মনে করছে তুমি হাভানায় আছ। ওরা বলছে কেজিবি র একজন। বড়কর্তা, ছদ্মনাম হেনড্রিকস নাকি এদিকে আছে আর আপাতত এই হোটেলে আছে। ওর কাজ হচ্ছে তোমাকে খুঁজে বের করা আর খতম করা। তাই ভাবলাম তুমি হয়ত ফাঁদে পড়েছ।
বন্ড অন্যমনস্ক হয়ে গেল। আবার এক নতুন ঝামেলা পাকাল। লোকটা এখানেই আছে সেই সাথে এক বন্দুকবাজ খুনে স্কারামাজা বলে। তোমাকে বলে দেওয়া ভাল যে স্কারামাঙ্গা বসকে খুন করেছে। তুমি রিপোর্ট করতে পার, যদি অবশ্য এখান থেকে বেরোনো সম্ভব হয়। আর হেনড্রিকসের কথা বলছ ও এখানে আছে তবে আমাকে এখনো চিনতে পারিনি। বন্ড মেরিকে লিটার আর নিকলসনের কথাও বলল। তারপর মেরিকে জানালা দিয়ে নামিয়ে দেবে বলে ঠিক করে কল বন্ধ করে দরজা খুলল। ঘরের অন্যদিক থেকে একটা গলা ভেসে এল দুজনে ঘাড়ের পেছনে হাত দিয়ে এগোও বাছাধনেরা।
.
নানান গণ্ডগোল
স্কারামাঙ্গা এগিয়ে এসে আলোটা জ্বাললেন। বগলে পিস্তলের খাপ। পিস্তলের নল বন্ডের দিকে উঁচিয়ে রাখা। বন্ড তাকিয়ে দেখল কাপড়ের দেওয়াল আলমারি হাঁ হয়ে আছে। ওপাশ দিয়ে অন্য ঘরের আলো আসছে। তার মানে আলমারির পেছনের পুরো দেওয়ালটাই একটা দরজা।
ঘরের মাঝখানে চলে এলেন স্কারামাঙ্গা। তারপর নাক সিঁটকে বললেন, মালটিকে কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছিল?
এই ভদ্রমহিলার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হয়ে আছে। আমার মা লন্ডনে পড়ে গিয়ে খুব অসুস্থ তাই আমাকে বলার জন্য ইনি এসেছেন। আপনার সাথে আমার দেখা হয় যেখানে, সেখান থেকে আমার খবর পেয়ে উনি আসছেন।
স্কারামাঙ্গা মেরির দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি যেতে পারেন মেমসাহেব। আর পরের বাড়িতে কখনো ভবিষ্যতে হানা দেবেন না। বন্ড কোনরকমে মেরিকে ঠেলেঠুলে জানালা দিয়ে বের করে দিল। ব্যাপারটা এত সহজে মিটে যাবে, বন্ড তা ভাবতেই পারেনি। বন্ডের দিকে চেয়ে স্কারামাঙ্গা বললেন, একটা কথা তোমাকে বলে রাখি, প্রথমে থেকেই আমি একটা পুলিশ-পুলিশ গন্ধ পাচ্ছিলাম। তোমার অন্য কোন পরিচয় যদি ফাঁস হয়ে যায় তবে তোমাকে টুকরো টুকরো করে ফেলা হবে, বুঝেছ? সকাল দশটায় হেনড্রিকসের সাথে আমার একটা মিটিং আছে। কেউ যেন আমাকে বিরক্ত করতে না আসে। তারপর ট্রেনে করে সবাই মিলে বেড়াতে যাওয়া হবে। সর ব্যবস্থা তুমি করবে। স্কারামাঙ্গা বেরিয়ে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হল।
ঠিক সাড়ে ছ টার সময় বন্ডের ঘুম ভাঙল। বন্ড বুঝতে পারল তার ছদ্মবেশ আর টিকছে না। সে লিটারের সাথে। দেখা করল। লিটার বন্ডকে জানাল, আর কোন আশা নেই। ও রাশিয়ানে কথা বলছিল কিন্তু তোমার নাম আর নম্বর বলছিল বারবার। যত শিগগির পার গাড়ি নিয়ে চম্পট দাও। বন্ড লিটারকে রাতের বেলার মেরি গুডনাইটের কথাটা বলল। সুতরাং এখন আর পালাবার মানে হয় না। সকালে বেড়াতে যাওয়ার কথা গল্প করে বলল, এই বেড়াবার প্রোগ্রামটা যদি বানচাল করা যায় তবে পরেরটা দেখা যাবে। লিটার কিছুক্ষণ ভাবল। তার মুখ থেকে মেঘ কেটে গেল। আজকের প্ল্যান হচ্ছে এই প্রথমে একটা খেলনা ট্রেনে করে আমের ক্ষেতে পিকনিক, তারপর গ্রীন আইল্যান্ড বন্দর থেকে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা। লিটারের কথা মত বন্ড উইসকো সুগার এস্টেটের ম্যানেজারকে একটা চিঠি লিখে দিল। তারপর গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
.
শলাপরামর্শ
বন্ড কনফারেন্স রুমে গিয়ে দেখল যে টেবিলে পত্রিকাগুলো যেভাবে ফেলে গিয়েছিল সেভাবেই ছড়ানো। কার্পেটে রক্তের দাগ-টাগ কিছু নেই। বন্ড চেয়ারগুলো ঠিকঠাক করতে লাগল। স্কারামাঙ্গা এ সময় ঢুকে বললেন, এতেই হবে মিঃ হ্যাঁজার্ড। কালকের মত দুটো দরজাই যেন বন্ধ থাকে।
বন্ড বাইরে গিয়ে চেয়ারটা টেনে নিয়ে শ্যাম্পেনের গ্লাস নিয়ে বসে গেল। সাথে কিছু পত্রিকা। খুব তাড়াতাড়ি কথা বলছিল হেনড্রি, সকালে আমার লোক ফোন করেছিল। এই লোকটাই হল ইংরেজ গুপ্তচর জেমস বন্ড। কোন সন্দেহ নেই। মুখের ডানদিকে কাটা দাগটা মিলে যাচ্ছে।
কারামাঙ্গার গলার স্বর শোনা গেল, আমি কনফারেন্সের প্রথম দিনেই বলেছিলাম, এসব গুপ্তচরেরা আমার কাছে সকালের নাস্তা। আপনার কথা শুনে আমি আমার প্ল্যানটা কিছুটা বদলাতে বাধ্য হচ্ছি। আগামীকাল ওকে খতম করা হত, সে জায়গায় আজই করা হবে। কি করে বলছি। বন্ড টুকরো টুকরো কথা ছাড়া কিছুই শুনতে পেল না। সে রুমাল দিয়ে কানটা মুছে নিল। নিজের মৃত্যুদণ্ড ছাড়াও সে যে কতরকম গোপন পরামর্শ শুনে ফেলেছে তার ঠিক নেই। কেজিবি র সাথে স্কারামাঙ্গার সম্পর্ক, ক্যারিবিয়ান এলাকায় এদের গতিবিধি। তাছাড়া নানা ছোটখাট ব্যাপার যেমন বক্সাইট শিল্প নষ্ট করা, আমেরিকায় চোরাই গাঁজা চালান এবং জুয়া। এত বড় শিকার জালে পড়েছে। এখন জাল গোটাবার জন্যে প্রাণটা থাকলে হয়।
