গোটাকতক রাসতফারী ধরেছি। তবে মহা চেঁচামেচি লাগিয়েছে ব্যাটারা। আমরা নাকি ধর্ম নিয়ে বাছবিচার করছি। ছেড়ে দিতে হবে মনে হচ্ছে। সুতরাং শিগগিরি আগুন লাগা শুরু হবে আবার। তাই বলছিলাম আপনার মত একজন জবরদস্ত লোক পেলে হত। গায়ের জোরে আদায় তাই তো করেন আপনি?
স্কারামাঙ্গা বন্ডকে জিজ্ঞেস করলেন, তা এরপর কি করা হচ্ছে? ঠিক নেই। লন্ডনে খবর নিয়ে দেখতে হবে এদিকে ওদের আর কোন কাজ আছে কিনা। তবে তাড়া নেই। আমি ঠিক বেতনভুক্ত লোক নই, কাজ হিসেবে টাকা। কেন, আপনার হাতে কিছু আছে নাকি?
টিফি ট্রেতে করে বোতল আর গ্লাস নিয়ে এসে বন্ডের সামনে রাখল। সে স্কারামাঙ্গার দিকে তাকাল না দেখে স্কারামাঙ্গা কর্কশভাবে হেসে উঠল। কোটের ভেতর থেকে কুমিরের চামড়ার মানিব্যাগ বের করে তার থেকে একটা একশ ডলারের নোট টেনে ছুঁড়ে দিল টেবিলে, বেশি মাথা গরম করবি না, বুঝলি!
টিফি নোটটা তুলে নিয়ে চলে গেলে স্কারামাঙ্গা কাঁধ ঝাঁকাল। বোতল থেকে বিয়ার ঢালল গ্লাসে। দু জনে নীরবে বিয়ার পান করতে লাগল। স্কারামাঙ্গা কিছুক্ষণ বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, এক হাজার ডলার রোজগার করার বাসনা আছে?
বন্ড বলল, থাকতে পারে।
বাইরে গাড়ি থামার শব্দ। দুটি লোক হাসাহাসি করতে করতে উপরে উঠে এল। দুজনেই শ্রমিক শ্রেণীর জ্যামাইকান। কাউন্টারে গিয়ে টিফির সাথে কি-সব ফিসফাস করে দুজনেই এক পাউন্ডের একটা করে নোট দিয়ে সরে। পড়ল। স্কারামাঙ্গা বলল, এ ব্যবসাতে আমার কিছু শেয়ার আছে। থান্ডাবার্ড হচ্ছে হোটেলের নাম আর জনা ছয়েক স্টকহোল্ডার আসছেন। ওখানে মিটিং হবে। মানে জায়গাটা ঘুরে-টুরে দেখা আর সবাই মিলে মাথা খাঁটিয়ে একটা উপায় বের করা। এদের জন্য আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে। কিংসটন থেকে ব্যান্ড আনাচ্ছি, ক্যালিপেসো, মেয়েছেলে বুঝলে কিনা। তাছাড়া সাঁতারের আয়োজন। এভাবে ওদের ফুর্তিতে রাখা, বুঝলে না?
বুঝেছি। যাতে ফুর্তির চোটে ওরা আপনার শেয়ারগুলো কিনে নেয়।
স্কারামাঙ্গা চটে গিয়ে বলল, উল্টোপাল্টা কথা বল না। এর জন্য তোমাকে এক হাজার ডলার দেওয়া হচ্ছে না। তুমি নিরাপত্তার ব্যাপারে কাজ করেছ শুনে আমার মনে হল যে তুমি এসব মিটিং-এ একটু দেখাশোনা করতে পারবে, মানে কোথাও লুকানো মাইক্রোফোন আছে কি-না আগে থাকতে দেখে নেবে। তারপর দরজার কাছে হাজির থাকবে।
বন্ড না হেসে পারল না। মানে আপনার দেহরক্ষী। বন্ড যা ভাবেনি তাই পেয়ে গেল অর্থাৎ স্কারামাঙ্গার কাছে। পাহারা এড়িয়ে পৌঁছান। হয়ত এটা ফাঁদও হতে পারে। তবে ফাঁদটা যে কি বন্ডের মাথায় এল না। বন্ড একটা। সিগারেট ধরাল। স্কারামাঙ্গা হাতটা উল্টে কব্জিতে সোনার ঘড়ি দেখে নিল তারপর বন্ডকে বলল, চল হে যাওয়া যাক। এতক্ষণে আমার গাড়ি এসে গেছে। তবে খেয়াল রেখো, একটুকুতে আমার মেজাজ বিগড়ে যায় কিন্তু
বেশ। স্কারামাঙ্গা ঘরের ওদিকে গিয়ে সুটকেসটা তুলে নিল।
বন্ড চট করে কাউন্টারে ফিরে গেল। চললাম টিফি। আবার কোন-একদিন ফিরব। যদি কেউ আমার খোঁজ করতে আসে বলে দিয়ে আমি থান্ডারবার্ড হোটেলে আছি।
টিফি ওর হাতটা ছুঁয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, সাবধানে থেকো। ওটা গুণ্ডার আড়া। সামনে থেকো। বাইরের দিকে ইশারা করে বলল, ওরকম পাজি লোক আমি আর দেখিনি।
পিছনে উঠে বন্ড ভাবতে লাগল এই বেলা ব্যাটার মাথার মধ্যে গুলি চালিয়ে দিলে কেমন হয়–কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল এরকম ঠাণ্ডা মাথায় খুন করা তার আদৌ পছন্দ নয়। এসব ভেবে তার মন থেকে হত্যার ইচ্ছে উবে গেল। তার। মনে হল এখনো বোধহয় সেই মুহূর্ত আসেনি।
গাড়ি সমুদ্রের চর্চকে পানির দিকে মোড় ঘুরেছে। বন্ড মনে মনে বুঝল সে শুধু আদেশ অমান্য নয়, একটা বোকার মত কাজও করে ফেলেছে।
.
অস্থাবর
অন্ধকার রাতে যদি বিদেশ বিভুয়ে একটা অজানা বাড়িতে কিংবা হোটেলে কেউ এসে পৌঁছায় তাহলে তার যেমন অবাক লাগে জেমস্ বন্ডেরও তাই হল। জ্যামাইকার ম্যাপটা তার মোটামুটি জানাই ছিল। সামনের গাড়ির লাল আলো অনুসরণ করে আসতে আসতে সে অনুভব করেছে বাঁ দিকে সমুদ্র।
গোয়েন্দার প্রথম কর্তব্য হল, নতুন জায়গাটার হদিশ বুঝে নেওয়া, পালাবার রাস্তা দেখে রাখা আর বাইরের সাথে যোগাযোগের ব্যবস্থা ঠিক রাখা। তার যোগাযোগের একমাত্র সূত্র তিরিশ মাইল দূরে এক গণিকালয়ে একটি মেয়ে, সব মিলিয়ে খুব একটা আশাব্যঞ্জক পরিস্থিতি বলা যায় না। আশেপাশে কোথাও বাড়ি তৈরির চিহ্ন দেখা গেল না, কেননা বাকি সব অন্ধকারে ঢাকা। বিরাট গাড়িবারান্দা। বন্ড গাড়ি থেকে দেখতে পেল ভিতরে ঝাড়লণ্ঠন আর সাদা কালো মার্বেলের মেঝে। কালো প্যান্ট আর লাল কোট পরা জ্যামাইকান কর্মচারিরা তাড়াতাড়ি বেরিয়ে এল। ছোটখাটো শোভাযাত্রা করে ওরা প্রথমে হলে ঢুকল। খাতায় সই করা হবে। বন্ড লিখল–মার্ক হ্যাঁজার্ড, ঠিকানা দিল কেনসিংটনের। ট্রান্সওয়ার্ল্ড কন্সটিয়ম। স্কারামাঙ্গা বন্ডকে বলল, তোমার ঘর পশ্চিম দিকে ২৪নং। আমি কাছেই ১০নং এ আছি। সকাল ১০টা নাগাদ দেখা হবে। বন্ড ছোকরা চারটার পিছু পিছু পিছল মার্বেলের মেঝের ওপর দিয়ে হেঁটে চলল। চাকরটি দরজা খুলে ধরল, ঠাণ্ডা এয়ার কন্ডিশন করা হাওয়ার ঝলক। বন্ড পর্দা সরিয়ে দেখল বাইরে অদৃশ্য তটভূমিতে সমুদ্রের অস্ফুট শব্দ। টেলিফোনটি সাবধানে বিছানায় উপুড় করল। এমনভাবে যাতে রিসিভারটি না সরে যায়। তারপর ছোট ছুরি দিয়ে নিচের পাতটি খুলে ফেলল। একটি ছোট সাইক্রোফোন প্রধান তারের সাথে জোড়া। বন্ড টেলিফোন যথাস্থানে রাখল। ট্রানজিস্টর চালিত এমন যন্ত্র যাতে ঘরের ভেতর যে কোন আওয়াজ তুলে নিতে পারে। বন্ড রুমসার্ভিসকে ডেকে রাত্রি নটায় খাবারের অর্ডার দিল। তারপর জানলার ধারে বসে সমুদ্র আর গাছের গন্ধ মেশা সোঁদা বাতাস উপভোগ করতে লাগল। এবং কারামাঙ্গার কথা ভাবতে বসল। ক্যারিবিয়ানে এখন বেআইনী টাকার ছড়াছড়ি, কাছাকাছি অঞ্চলের কলার লাখপতি ব্যবসাদার থেকে শুরু করে যে কোন যৌথ সম্প্রদায়ের টাকা। হওয়া আশ্চর্য কিছু নয়। আর যে লোকটা উড়ন্ত পাখি মারতে পারে তাকে বন্ড কি করে কজা করবে? স্কারামাঙ্গার কাছে নিশ্চয়ই প্রত্যেক ঘরের চাবি আছে। কাল ও দরজাটা আটকে রাখার ব্যবস্থা করবে। আপাতত সে সুইটকেসটি বন্ধ দরজার গায়ে দাঁড় করিয়ে তার উপরে তিনটি গ্লাস পাশাপাশি রেখে দিল। সহজ ফাঁদ। রাত দুটো নাগাদ এক দুঃস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙে গেল। বাথরুমে গিয়ে ঠান্ডা পানিতে গোসল করে নিল সে। সকালে যখন ঘুম ভাঙল তখন সাড়ে সাতটা। সামান্য নাস্তাখেয়ে পিস্তলে সজ্জিত হয়ে একটু ঘুরে বেড়াতে চলল।
