প্রায় পাঁচ মিনিট শূন্যদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন M। তারপর লিখলেন : কাজ শুরু করে দেওয়া হোক। তারপর বসে বসে ভাবতে লাগলেন, তাহলে কি আমি জেমস্ বন্ডের মৃত্যুর পরোয়ানা সই করলাম?
.
দিনটা কেমন যাবে?
গরমের বিকেল কাটানোর পক্ষে জ্যামাইকার কিংস্টন ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের চেয়ে খারাপ জায়গা কমই আছে। কঘণ্টা আগে ত্রিনিদাদ থেকে পৌঁছেছে বন্ড। হাভানা যাবার কিউবান এয়ারওয়েজের প্লেন আসতে তখনো ঘণ্টা দুই বাকি। বন্ড উঠে গিয়ে দোকান থেকে একটা কাগজ কিনল। অপরিসীম বিরক্ত বশে বন্ড খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব কিছু পড়ে ফেলল। হাভানা পৌঁছে প্রথম দিনেই সে স্কারামাঙ্গার খোঁজ পাবে–সে আশা দুরাশা। কারামাঙ্গা সেখানে নাও থাকতে পারে। তবুও একবার শেষ চেষ্টা করে দেখা যাক। গত দেড় মাস যাবত বন্ড এই লোকটার খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
একান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বন্ডকে এখানে আসতে হয়েছে ওর সন্ধানে। এই প্রতিকূল পরিবেশের সাথে সে একেবারেই পরিচিত নয়। কাগজের একটি বিজ্ঞাপনের দিকে বন্ডের চোখ পড়ল। এই না হলে জ্যামাইকা! বিজ্ঞাপনটি এ রকম :
নিলামে বিক্রি হবে
২৮শে, বুধবার সকাল সাড়ে দশটায় ৭৭নং হারবার স্ট্রিট, কিংসটনে একটি মর্টগেজ করা সম্পত্তি সাড়ে তিন লাভে লেন।
এর পরের জমি ও বাড়ির বর্ণনায় পুরানো সাবেকী আমলের ব্রিটিশ-রাজের গন্ধ বন্ড বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিল। জ্যামাইকা ছিল ব্রিটেনের সর্বপ্রথম উপনিবেশগুলোর একটি। বন্ডের দৃঢ় বিশ্বাস কিংসটনের কেন্দ্রস্থলে রাণী ভিক্টোরিয়ার মূর্তি নিশ্চয়ই এখনো আছে। ঘড়ি দেখল বন্ড। কোট আর ব্রিফকেসটা তুলে নিয়ে সে ভাবল আর বেশিক্ষণ নেই।
বিভিন্ন এয়ার লাইনের খোপগুলো জনশূন্য, কেবল ফ্ল্যাগ আর ফোল্ডারগুলোর ওপর ধুলো জমছে। বন্ড উঠে বেড়াতে বেড়াতে সেদিকে গেল। যাত্রীদের চিঠিপত্র মাঝখানের একটি স্ট্যান্ডে রাখা। ওর জন্যে যদি কিছু থাকে ভেবে বন্ড একবার সেদিকে গেল। খামগুলোর উপর অলস দৃষ্টিপাত করতে গিয়ে থমকে গেল সে। সর্বাঙ্গ ঠাণ্ডা হয়ে গেল। চট করে রুমালে হাত মুড়ে খামটা টেনে পকেটে পুরলো। খামে লেখা ছিল–স্কারামাঙ্গা। কিংসটন থেকে বারোটা। পনেরোয় খবর পৌঁছেছে। আগামীকাল দুপুরের পর থেকে নমুনা পাওয়া যাবে সাড়ে তিন নং এস.এল.এম.-এ। নিচে কোন সই নেই। বন্ড আনন্দের হাসি রোধ করতে পারল না। চট করে চিঠিটা খুঁজে নিয়ে বন্ড এবার কিউবান এয়ার লাইনস বুথে গিয়ে নিজের রিজার্ভেশনটা ক্যানসেল করাল। তারপর বি.ও.এ.সি. র কাউন্টারে গিয়ে খুঁজে বের করল লিসা থেকে আসছে যে প্লেনটা তার বৃত্তান্ত। লিসা থেকে কিংসটন, নিউইয়র্ক হয়ে লন্ডন। পরের দিন একটা পনেরোতে এসে পৌঁছাচ্ছে। এবার তো কারো শরণাপন্ন হতে হয়। মনে পড়ে গেল স্টেশন জে.-তে আছে তার নাম। সে হাই কমিশনারের অফিসে ফোন করল। একটি মেয়ের গলা শোনা গেল, আমি কমান্ডার রস-এর সহকারী বলছি। বলুন, কি করতে পারি। গলার আওয়াজ যেন চেনা চেনা। বন্ড হাসল, আরে তুমি, গুডনাইট, সত্যি কি কাণ্ড! তা তুমি এখানে কি করছ?
আরে জেমস্! কি দারুণ ব্যাপার! এখন কোথা থেকে কথা বলছ?
কিংসটন এয়ারপোের্ট। এখন শোন, আমাকে একটু সাহায্য করতে হবে। লিখে নাও। এক নম্বর, আমার একটা গাড়ি চাই। যে কোন রকম হলেই চলবে। দু নম্বর, সাভানা লা মারের ওদিকটার সব থেকে শাসালো মক্কেলের নাম। আর জ্যামাইকার মুদ্রায় একশো পাউন্ড। আর লক্ষ্মী মেয়ের মত নিলাম ব্যবসায়ী আলেকজান্দারদের ফোন করে আজকের গ্লীমারে যে সম্পত্তিটার সম্বন্ধে বিজ্ঞাপন দিয়েছে তার সম্বন্ধে যা কিছু জ্ঞাতব্য জেনে নাও। বল, তুমি ওটা কিনতে উৎসুক। সাড়ে তিন লাভ লেন। তুমি ওখানে চলে এসো। রাতটা আছি। রাতে আমার সাথে খাবে।
মেয়েটি হেসে বলল, দেখি তোমার জন্য কি করতে পারি। টেলিফোন বুথের মধ্যে ঘেমে অস্থির হচ্ছিল বন্ড। এবার বাইরে হাওয়ায় এসে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। মনে মনে ভাবল মেরি গুডনাইট, তার বহুদিনের পুরানো, অতি প্রিয় সেক্রেটারি তাহলে এখানে। এখন অন্তত একজন দলের লোক পাওয়া গেল।
হোটেলটি পালিসাডোর ডগায় বড় মনোরম। মালিক এক ইংরেজ। বন্ডকে দেখে খুব খুশি হয়ে তাকে একটি বড় ঘর দিলেন। এয়ার কন্ডিশন করা।
ছ টার সময় ঘুম ভাঙল বন্ডের। চুপ করে শুয়ে রইল, আস্তে আস্তে মনে পড়ল সব। সে ভাবতে লাগল, পৃথিবীর মধ্যে সম্ভবত দ্রুততম বন্দুকবাজ বলে যে লোকটি কুখ্যাত তার সাথে গুলির লড়াইয়ে নামা তো স্রেফ আত্মহত্যা। ভাগ্যে কি আছে দেখা যাক। কূটনৈতিক পাসপোর্ট মেরি গুডনাইটের কাছে রেখে যেতে হবে। এখন থেকে জেমস্ বন্ড মার্ক হ্যাঁজার্ড বলে পরিচিত হবে।
পশ্চিমে কিছুক্ষণ সূর্যাস্তের শেষ আলো আগুনের মত জ্বলল, তারপর গলা আগুনের মত সমুদ্রের পানিতে চাঁদের আলো পড়ে বন্দুকের ইস্পাতের মত চকচক করতে লাগল।
পরিচিত সেন্টের গন্ধ। একটি নিরাবরণ হাত বন্ডের গলা জড়িয়ে ধরল। পরক্ষণেই ঠোঁটের কোনায় চুম্বন। হাত বাড়িয়ে তাকে ধরবার চেষ্টা করতেই মেয়েটি বলল, কিছু মনে করো না জেমস্, পারলাম না। কতদিন পরে।
চিবুকের নিচে হাত দিয়ে মুখ তুলে বন্ড প্রতিদানে তার অল্প খোলা ঠোঁটের উপর সোজা চুম্বন করল। মেয়েটির দৃষ্টির সামনে অনেকবার বন্ড অন্যমনস্ক হয়েছে। সুগঠিত দেহে স্বাস্থ্যের দীপ্তি, পুরন্ত ঠোঁটে সরল হাসি যা বরাবরই বন্ডকে আকৃষ্ট করেছে। বন্ড ড্রিঙ্ক-এর অর্ডার দিয়ে সিগারেট ধরাল। মেরি গুডনাইট সোনালি চেন দেওয়া হ্যান্ডব্যাগ থেকে মোটা খাম বের করে বন্ডকে দিল। বেশিটা পুরোনো এক পাউন্ড নোটে, কিছুটা পাঁচ পাউন্ডের আছে।
