বারান্দার শেষ প্রান্তে দুটি দরজা। একটিতে লেখা A, অন্যটিতে B। প্রহরী B লেখা ঘরে টোকা দিয়ে সরে দাঁড়াল; বন্ড ভেতরে ঢুকল। ঘরের দেওয়ালে যুদ্ধের ছবি। ম্যান্টলপীসের উপরে গোটাকতক রূপার ট্রফি আর দুটি ছবি–একটি সুন্দরী তার তিনটি সুন্দর ছেলেমেয়ে। নিচে আগুন জ্বালা। আগুনের দু পাশে দুটো চেয়ার। হাসিখুশি মেজাজের একটি লোক চেয়ারে বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। বন্ডকে দেখে হাসিমুখে এগিয়ে গেলেন। ইনিই সেই ঠাণ্ডা মাস্টার নামে পরিচিত লোকটি। মুখোমুখি বসলেন দুজনে। মেজর টাউনসেন্ড বললেন, এবার বলুন, আমার দ্বারা আপনার কি উপকার হতে পারে?
বারান্দার ওদিকে A মার্কা ঘরটিতে ঢুকলে কিন্তু বন্ডের ঠিক এ ধরনের সমাদর হত না। কারণ ঐ ঘরটিতে কড়া মাস্টার নামে এক ব্যক্তি অধিষ্ঠিত। তিনি বন্ডকে সহজে রেহাই দিতেন না। সুতরাং এই হল সিক্রেট সার্ভিসের মধ্যে দেখাশোনার নমুনা। কর্নেল বরিস আগে থেকে বেশ ভালভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলেন বন্ডকে যে, এভাবে পরীক্ষায় পাশ করে তবে সে তার আগেকার মনিবের দর্শন লাভের অনুমোদন পাবে।
মেজর টাউনসেন্ড অনেকক্ষণ ধরে বন্ডের সাথে কথা বলে বুঝতে পারলেন যে, এই লোকটি জেমস বন্ড না হয়েই যায় না। এখন শুধু এটা জানলেই চলবে যে, সে কোথা থেকে আসছে এবং এত মাস সে কোথায় ছিল। কিন্তু বন্ড জানাল, এ প্রশ্নের উত্তর সে একমাত্র M-কেই দিতে পারবে। মেজর টাউনসেন্ডকে চিন্তিত দেখাল। দরজা ভেজিয়ে তিনি A মার্কা ঘরটিতে ঢুকে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বললেন, M জানিয়েছেন আপনি ফিরে আসায় উনি পরম নিশ্চিন্ত। আধ ঘণ্টার মধ্যেই ওঁর সময় হবে। দশ মিনিটের মধ্যেই গাড়ি এসে যাচ্ছে।
.
সাবধান
চিফ অফ স্টাফ M-এর ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে তাঁকে নিরস্ত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করছিলেন। ওর সাথে দেখা করাটা ঠিক হবে না স্যার, আমি হলে করতাম না। M হাত তুলে বললেন, আমি 007-কে ভাল করেই চিনি। আমি যা বলছি শুনে যাও। ইন্টারকমের আলো জ্বলল। এসেছে। সোজা ওখানে পাঠিয়ে দেবে। মিস মানিপেনির সামনে দাঁড়িয়ে বন্ড আবছাভাবে হাসল। M-এর গলা। এস জেমস, খুব খুশি হলাম। এবার সব খবর-টবর বল, শুনি।
ডেস্কের অন্যদিকে একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বসল বন্ড। তার স্মৃতির মধ্যে ঝড় উঠল। পরপর অনেকগুলো হিজিবিজি ছবি, খারাপ হয়ে যাওয়া প্রজেক্টারের মত। নিজেকে গুটিয়ে নিল। ডানদিকের রগে আঙুল ঠেকিয়ে বলল, আসলে এখানে একটা গুলি লেগেছিল, স্যার। তারপর অনেক কিছু মনে করতে পারছি না। ব্লাডিভস্টকে পানি থেকে পুলিশ আমাকে তোলে। কি করে সেখানে পৌঁছলাম কিছুই জানি না। ওদের ধাতানির চোটে অবশ্য আমি কে, কি বৃত্তান্ত মনে পড়ে যায়। তারপর পুলিশ আমাকে স্থানীয় কেজিবি র হাতে চালান করে দেয়। ঐ যে লেনিন গ্রাডের কি যেন ইনস্টিটিউট নাকি, ওখানে রাজার হালে রেখেছিল আমাকে। বন্ড সামনের লোকটির দিকে অবাধ্য ভঙ্গিতে তাকাল, দেখল তার নীল চোখ রাগে জ্বলছে।
– বেশ তো ওরা যদি এতই ভাল তবে তুমি তো ওখানে থেকে গেলেই পারতে।
-আমরা ঠিক করলাম তার বদলে আমাকে ফিরে আসতে হবে, আর শান্তির জন্য লড়ে যেতে হবে। আপনার দালালরা আর আপনি আমাকে গোপন যুদ্ধের কিছু কায়দা শিখিয়েছিলেন। ওরা বলল শান্তির কাজে ঐ একই কায়দা প্রয়োগ করা যেতে পারে। নির্বিকারভাবে জেমস্ বন্ডের হাত চলে এল ডানদিকের পকেটে। যেন কিছুই হয়নি এমনিভাবে M তাঁর চেয়ারটা একটু পিছন দিয়ে ঠেললেন আর বাঁ হাত দিয়ে খুঁজতে লাগলেন চেয়ারের তলার বোতামটা।
কি রকমভাবে শুনি? জিজ্ঞেস করার সাথে সাথে M জানতেন মৃত্যু এসে ঘরের মধ্যে ঢুকে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে, এবং তিনি তাকে সরাসরি আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন।
ততক্ষণে জেমস্ বন্ড শক্ত হয়ে গেছে। তার ঠোঁটের দু পাশ ফ্যাকাসে। নীল চোখে শূন্য দৃষ্টি নিয়ে সে তাকাল M এর দিকে। কে যেন তাকে দিয়ে কথা বলালো, যদি যুদ্ধবাজদের এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে ফেলা যায় তাহলে সেটা এক কাজের কাজ হবে। আমাদের ফর্দে প্রথম ব্যক্তির জন্য এই ঠিক হয়েছে।
বলার সাথে সাথে বোচা কালো ধাতব জিনিসটা পকেট থেকে উঠে এসেছে। কিন্তু ততক্ষণে ছাদের লুকানো জায়গা থেকে একটি আর্মারপ্লেট কাঁচের দেওয়াল খ্যাচ করে মেঝের উপর নেমে এসেছে। নল থেকে বেরিয়ে আসা বাদামী রঙের বিষাক্ত বস্তুটি ছিটকে এসে লাগল সেই কাঁচে, টপটপ করে গড়িয়ে পড়তে লাগল। কিন্তু M ততক্ষণে সেই গণ্ডির ওপারে নিরাপদ, যদিও তিনি মুখ আড়াল করার জন্য প্রায় সাথে সাথেই হাত তুলে ফেলেছিলেন।
ততক্ষণে চিফ অফ স্টাফ ছুটে এসেছেন ঘরে। পেছন পেছন নিরাপত্তা প্রধান। দুজনেই বন্ডের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত ধরে ফেললেন। কিন্তু তার মাথা বুকের ওপর ঝুঁকে এসেছে। ওরা ধরে না ফেললে হয়ত চেয়ার থেকে মেঝেতে গড়িয়ে পড়ত। ওরা টেনে তুললেন, কিন্তু বন্ডের হুঁশ নেই। একটু এঁকে নিরাপত্তা প্রধান বললেন, সায়েনাইড। কার্পেটের ওপর পড়ে ছিল পিস্তলটা। এক লাথি মেরে সেটাকে দূরে সরালেন। কাঁচের দেওয়ালের ওপার থেকে M এদিকে এসেছেন।
এই মুহূর্তে আপনি এ ঘর ছেড়ে চলে যান স্যার। আমি লাঞ্চের সময় পরিষ্কার করাচ্ছি সব। মিস মানিপেনি ভয়ার্ত চোখে দেখলেন বন্ডের দীর্ঘ দেহ টানতে টানতে চিফ অফ স্টাফের ঘরের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
