বন্ড ছ ফিট দূর থেকে বর্শা ছুঁড়ল। ঠিক বন্দুক হুঁড়বার আগে বর্শাটা তীরবেগে আততায়ীর হাতে বিধে গেল। কিন্তু সে ঘুরে দাঁড়িয়ে বভকে বন্দুকের এক বাড়ি মারল। চোখের কোণে বন্ড দেখতে পেল তার বর্শাটা ভেসে উঠে যাচ্ছে অপরদিকে। বন্ড কোনরকমে শত্রুর মুখের কাঁচের মুখোশটা টেনে খুলে দিল।
এবার সে প্রবালের অরণ্যের ভেতর দিয়ে আবার লার্গোর খোঁজে চলল। মাঝে মাঝে কয়েকটা দ্বৈত সংগ্রাম চোখে পড়ল তার। সমুদ্রের তলায় প্রবালের ঢিবির মধ্যে যুদ্ধের নানান নিদর্শন ছড়িয়ে পড়ে আছে। লার্গোর চিহ্নমাত্রও নেই। রক্তমেশা পানির ভিতর দিয়ে খুবই কম চাঁদের আলো এসে পড়ছে বালির বুকে। যুদ্ধ প্রায় বারোটা বিভিন্ন লড়াইয়ে বিভক্ত। বন্ড যুদ্ধের গতি মোটেই আন্দাজ করতে পারল না।
কিন্তু পরমুহূর্তেই যা দেখল তাতে সিদ্ধান্ত স্থির করে ফেলতে দেরি হল না। কুয়াশার আড়াল থেকে চকচকে টর্পোেের মত বৈদ্যুতিক রথটা বন্ডের ডানদিকে যুদ্ধক্ষেত্রের কাছে এসে পড়ল। তার ওপর চেপে বসেছিলেন লার্গো, মোটরবাইক আরোহীর মত সামনের পার্সপেক্স কাঁচের শীন্ডের পেছনে অল্প একটু ঝুঁকে। তার বাঁ হাতে দুটো মান্টার তৈরি বর্শা। ডান হাতে জয়স্টিক ধরে রথ পরিচালনা করছেন। লার্গো গতি কমিয়ে আস্তে ভেসে তাদের সামনে এসে থামলেন। একজন প্রহরী রথের হাল ধরে সেটাকে ব্লেডের কাছে টেনে আনতে লাগল।
এবার বন্ড বুঝতে পারল যে, এরা পালাবার চেষ্টা করছে। লার্গো এই বোমাটাকে রথের সাহায্যে টেনে নিয়ে গিয়ে প্রবাল প্রাচীরের ওধারে অতলস্পর্শী গহ্বরে ফেলে দেবেন। এভাবে প্রমাণ লোপাট করার চেষ্টা করবেন। বন্ড প্রবালের ঢিবির ওপরে সজোরে পায়ের ধাক্কা মেরে ঝাঁপিয়ে পড়ল সামনের দিকে। লার্গো শেষ মুহূর্তে ঘুরে গিয়ে তার ডান হাতের বর্শা দিয়ে বন্ডের বর্শার আঘাত ঠেকালেন। বন্ড আবার ঝাঁপ দিল লার্গোর মুখ থেকে হাওয়ার নলটা খুলে নেবার চেষ্টায়। লার্গো দুহাত দিয়ে ঠেকালেন। তারা অন্ধের মত উভয়ে উভয়কে আঁচড়াতে লাগল, দুজনেই প্রাণপণে কামড়ে রয়েছে তাদের মুখের মাউথ পীসটাকে–যার ওপর নির্ভর করছে তাদের জীবন-মরণ। লার্গো রথের সিটটাকে দুহাটুর মধ্যে খুব ভাল করে চেপে ধরে আছেন।আর বন্ড ঝুলছে এক হাতে লার্গোর সাঁতারের সরঞ্জামগুলো চেপে ধরে। বারবার লাগোর কনুইটা এসে তার মুখে আঘাত হানতে লাগল। একই সঙ্গে বন্ড তার অন্য হাতটা দিয়ে লাগোর কিডনী লক্ষ্য করে ঘুসি চালাতে লাগল। লাগোর শরীরের অন্য সব অংশ তার নাগালের বাইরে।
চওড়া প্রণালীটা যেখানে খোলা সাগরের সঙ্গে মিশেছে, সেখান থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে পানির বুকে মাথা তুলল রথটা, আর পাগলের মত এঁকেবেঁকে ছুটল। বন্ডের অর্ধেক শরীর পানির ভেতর। এক্ষুনি লার্গো ঘুরে বসে দুহাতে তাকে চেপে ধরবেন। বন্ড লার্গোর অ্যাকোয়ালং ছেড়ে দিয়ে রথের পেছন দিকটা দুপায়ের মধ্যে ধরে পেছনে সরতে লাগল, যতক্ষণ না রথের হালটা তার পিঠে এসে লাগে। এবার সে দু পায়ের মধ্যে হাত গলিয়ে সজোরে রথের হালটাকে চেপে ধরল, এবং নিজেকে রথের ওপর থেকে পেছন দিকে ছুঁড়ে দিল। বন্ড হালের ব্লেডটাকে এক হ্যাঁচকা টান মেরে ডানদিকে অনেকটা বেঁকিয়ে দিয়ে ছেড়ে দিল। লার্গো ভারসাম্য হারিয়ে রথের ওপর থেকে ছিটকে পড়লেন। তার চোখ দুটো এখন বন্ডকেই খুঁজছে। বউ তার সমস্ত শক্তি এক করে নিচে ডুব দিল। সে প্রবালের অরণ্যে লুকিয়ে পড়ল। অলস গতিতে লার্গো তার পিছু নিলেন। গায়ে রবারের স্যুটের আবরণ থাকায় বন্ড সরু গলিটা দিয়েই চলতে লাগল। মাথার ওপর একটা কালো ছায়া তাকে অনুসরণ করে চলেছে। বন্ড ওপর দিকে তাকিয়ে দেখল মাউথপীসের চারদিকে একসারি দাঁত ঝকঝক করে উঠল। লার্গো বুঝতে পেরেছেন যে বন্ড তার হাতের মুঠোয়, বন্ড তার আড়ষ্ট আঙুলগুলো খেলিয়ে সাড় আনতে চেষ্টা করল।
বন্ডের পেছনে তাকাবার উপায় নেই। সে থেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। এছাড়া কিছুই করবার নেই। লার্গো তাঁর বিশাল হাত দুটো সামনে প্রসারিত করে এগিয়ে এসে বন্ডের থেকে দশ পা দূরে থামলেন। তার চোখের দৃষ্টি পাশের এক প্রবাল তূপের দিকে ঘুরে গেল। ডান হাত বাড়িয়ে এক হ্যাঁচকা টানে কি যেন খুলে নিলেন। হাতটা বেরিয়ে আসতে দেখা গেল সে হাতে আরো আটটা কিলবিলে কালো আঙুল। লার্গো বাচ্চা অক্টোপাসটাকে তার সামনে ধরে রাখলেন। বন্ড ঝুঁকে পড়ে একটা শ্যাওলা ঢাকা পাথরের টুকরো হাতে তুলে নিল।
বন্ড এক পা এগোলেন, তারপর আরেক পা। বন্ড একটু ঝুঁকে পায়ে পায়ে পিছু হটল। হঠাৎ বন্ড দেখতে পেল লার্গোর পেছনে স্বচ্ছ পানির মধ্যে কি যেন নড়ছে। লার্গো বন্ডের দিকে ঝাঁপ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে বন্ডও পাথরের টুকরোটা হাতে ধরে ঝাঁপ দিল লার্গোর তল পেট লক্ষ্য করে। কিন্তু লার্গো প্রস্তুত ছিলেন। তাঁর হাঁটু সজোরে আঘাত করল বন্ডের মাথায় আর একই সঙ্গে ডানহাত নামিয়ে চট করে বন্ডের মুখোশের ওপর অক্টোপাসটাকে ছেড়ে দিলেন। তারপর দুই হাত দিয়ে বন্ডের গলা চেপে ধরে একটা বাচ্চা ছেলের মত তাকে টেনে শূন্যে তুললেন। বন্ড আর কিছু দেখতে পাচ্ছিল না। সে বুঝতে পারল যে সে শেষ হয়ে এসেছে। বন্ড আস্তে আস্তে হাঁটু ভেঙে বসে পড়ল। কিন্তু তার গলা চেপে ধরা হাত দুটো কোথায় গেল? কেন ডুবছে সে? তার চোখ দুটো এতক্ষণ তীব্র যন্ত্রণায় বুজে ছিল। চোখ। খুলল বন্ড। অক্টোপাসটা নেমে এসেছিল তার বুকের ওপর। এবার সেটা তাকে ছেড়ে দিয়ে ছুটে গিয়ে প্রবালের মধ্যে লুকিয়ে পড়ল। লাগো…লাগো পড়ে আছেন তার সামনে বালির ওপর। আর তার গলা থেকে বীভৎসভাবে বেরিয়ে আছে একটা বল্লমের অর্ধেক অংশ। তার পেছনে দাঁড়িয়ে একটা সাদা দেহ তার দিকেই তাকিয়ে ছিল, আর হাতের গ্যাস বন্দুকে আর একটা বল্লম ভরছিল। উজ্জ্বল সমুদ্রের মধ্যে তার দীর্ঘ কেশ উড়ছিল চারপাশে। ডোমিনো!
