কিছুক্ষণের মধ্যে চকচকে কালো স্যুটগুলো দেওয়াল থেকে বিশাল সব বাদুড়ের চামড়ার মত ঝুলতে থাকল। বন্ড দলের সবাইকে ডেকে বলল, বন্ধুগণ, আমরা পানির নিচে এক ভয়ঙ্কর যুদ্ধে যোগ দিতে চলেছি। হয়ত অনেকেই মারা পড়বে। আমরা সাঁতার কাটব দশ ফিট পানির নিচে। যথেষ্ট আলো থাকবে। ত্রিভুজের শীর্ষবিন্দুতে থাকব আমি ১ নম্বর, আমার পরেই থাকবেন ২ নম্বর মিঃ পীটার এবং পেটি অফিসার ফার্লো, ৩ নং। প্রত্যেকে তার সামনের জনকে অনুসরণ করবে, ফলে কারো হারানোর সম্ভাবনা থাকবে না। সবচেয়ে বড় কথা, শান্ত থেকো। আমাদের আক্রমণটা খুব আকস্মিক হওয়া দরকার। শত্রুপক্ষের হাতে গ্যাস বন্দুক থাকবে, যার পাল্লা প্রায় বিশ ফিট। গুলি চালাবার সঙ্গে সঙ্গে বর্শা বাগিয়ে বাঘের মত ঝাঁপিয়ে পড়বে। শরীরের প্রায় যে কোন অংশে এই বর্শার চোট লাগাতে পারলেই শত্রু ঘায়েল। পেটি অফিসার ফার্লোর কাছে একটা সিগন্যাল ফ্লেয়ার আছে। আক্রমণ শুরু হলেই সেটা তিনি সমুদ্রের বুকে ফাটিয়ে দেবেন। তৎক্ষণাৎ ক্যাপ্টেন সাবমেরিন নিয়ে ভেসে উঠবেন আর একটা ডিঙ্গিতে চেপে এক দল সশস্ত্র লোক ও সাবমেরিনের চিকিৎসক আমাদের সাহায্যের জন্য রওনা হয়ে পড়বেন। এবার, তোমাদের কোন প্রশ্ন আছে।
সাবমেরিন থেকে বেরিয়ে আমরা কি করব? বন্ড বলল, চেষ্টা করবে যাতে সমুদ্রের বুকে খুব কম আলোড়ন ওঠে। চটপট দশ ফিট গভীরে নেমে গিয়ে দলে নিজের জায়গা ঠিক করে নেবে।
হঠাৎ লাউডস্পীকারে গগ করে উঠল, ডুবুরির দল পানিতে বেরোনোর দরজায় চলে এস। সরঞ্জাম সব পরে নাও। কম্যান্ডার বন্ড একবার আক্রমণ কেন্দ্রে আসবেন দয়া করে।
ইঞ্জিনের গর্জন ক্রমশ মৃদু হতে হতে হঠাৎ থেমে গেল। সান্টা বসে পড়ল সমুদ্রপৃষ্ঠের ওপর। একটা ছোট্ট ঝাঁকুনি লাগল।
.
উলঙ্গ সংগ্রাম
এক দমকা কম্প্রেসড এয়ার এসকেপ হ্যাচ পেরিয়ে ওপর দিকে ঠেলে দিল। তার অনেক ওপরে সমুদ্রের বুকটাকে দেখাচ্ছিল যেন একটা রূপার থালা হাওয়ার ঝাঁপটায় নাচছে, ফুলে উঠছে। যে হাওয়াটা তাকে ঠেলে দিয়েছিল সেটা বেলুনের মত ফেটে পড়ল। কানে তীব্র ব্যথা অনুভব করল।
এবার এসকেপ হ্যাচ থেকে এক গাদা রূপালি বুদুদের বিস্ফোরণের সঙ্গে মান্টা তার দিকে লিটারের কালো দেহটা ছুঁড়ে দিল। বন্ড রাস্তা থেকে সরে গিয়ে ভেসে উঠল পানির ওপর। নিষ্প্রদীপ ডিস্কো তার বাঁদিকে এক মাইল দূরে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জাহাজটায় কোন কাজকর্মের লক্ষণ দেখা গেল না।
বন্ডের কাঁধে টোকা পড়ল। লিটার। কাঁচের মুখোশের ভেতর থেকে হাসল সে। বন্ড মাথা নেড়ে সাঁতরাতে শুরু করল। আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগিয়ে চলল, একটা হাত পাশে আর একটা হাতে বর্শাটা বুকের ওপর ধরা। তার পেছনে সবাই ত্রিভুজের আকারে ঘন হয়ে এল। বন্ড অন্যদের হাত তুলে আস্তে চলবার নির্দেশ দিল। আস্তে আস্তে সামনে এগোল সে, তার দিক চিহ্ন, একটা পাথরের চূড়ার মাথায় রুপালি ঢেউ ভাঙার দিকে চোখ খোেলা রেখে। সে রাস্তা থেকে পুরো কুড়ি ফিট সরে এসেছে। বন্ড পাথরটার দিকে ঘুরে গেল। সে বারবার খুঁজতে লাগল–কোন অস্বাভাবিক আলোড়ন দেখা যাচ্ছে কি-না, কিছু নড়ছে কি-না? একশ গজ দূরে, প্রবালের চাঙড়ের মধ্যে কাঁচের মুখোশ পরা একটা সাদা মাথা সহসা ভেসে উঠল, চারদিক দেখে নিয়ে তক্ষুনি আবার ডুবে গেল।
বন্ডের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। সে অনুভব করল, তার রোমাঞ্চিত হৃৎপিন্ড রবার স্যুটের ভেতরটাকে হাতুড়ির মত ঘা দিচ্ছে। সোজা নিচে ডুব দিল সে। পেছনের মুখোশগুলো তার দিকে ফেরা, তার সংকেতের জন্য অপেক্ষা করছে। বন্ড বারকয়েক বুড়ো আঙুলটাকে ওপর দিকে উঁচু করে দেখাল। প্রত্যুত্তর হিসাবে তার কাছাকাছি মুখোশগুলোর ভেতর হাসির ঝলক দেখতে পেল সে। বন্ড তার বর্শাটাকে আক্রমণের ভঙ্গিতে ধরে নিচু প্রবাল স্কুপের ওপর দিয়ে সামনে এগিয়ে চলল।
এখন শুধু গতি আর উঁচু-নিচু প্রবাল স্যুপের ভেতর দিয়ে সঠিক পরিচালনার দরকার। বারোটা ছুটন্ত শরীরের ঢেউ এর ধাক্কায় যেন জেগে উঠল সব প্রবাল প্রাচীরগুলো। পঞ্চাশ গজ যাবার পর বন্ড সকলকে আক্রমণের জন্য সারি বাঁধতে সংকেত করল। হঠাৎ সামনে একটা সাদা চামড়ার ঝলক দেখা গেল। বন্ড বাহুর সাহায্যে আক্রমণের সংকেত দিল। তারপর বর্শা বাগিয়ে ধরে ঝাঁপিয়ে পড়ল। বন্ড দেখল লাগোর লোকদের দৃষ্টি সামনের দিকে। এখনো তারা বুঝতে পারেনি, প্রবালের ফাঁকা দিয়ে অনেকগুলো কালো কালো দেহ তাদের দিকে ছুটে আসছে। কিন্তু বন্ড লাগোর দলের একেবারে সামনের লোকটির কাছাকাছি এসে পড়তেই চাঁদের আলো তার কালো ছায়া ফেলল নিচের সাদা রঙের বালির ওপর। সঙ্গে সঙ্গে একের পর এক লোক চমকে পাশের দিকে তাকাল। আর বন্ড একটা প্রবাল স্তূপে পায়ের ধাক্কা মেরে, তীরের মত সামনের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।
সামনের লোকটি আত্মরক্ষার কোন সুযোগই পেল না। বন্ডের বর্শা তার শরীরের একপাশে ঢুকে গেল। সে ছিটকে পড়ল পরের লোকটির ওপর। বন্ড এলোপাথাড়ি বর্শা চালাতে লাগল। এবার শত্রুদের অর্ধনগ্ন দেহগুলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে তাদের জেট-প্যাকেটের গতি বাড়িয়ে দিয়ে। বন্ড তাদের দিকে আক্রমণ চালাল। একটা বল্পম বন্ডের পেটের ওপর দিয়ে রবারের স্যুট ছিঁড়ে বেরিয়ে গেল। বন্ড একটা জ্বালা আর ভেজা ভেজা স্পর্শ অনুভব করল। বুঝতে পারল না রক্ত, না সমুদ্রের পানি। একটা ছুটে-আসা বল্লমের ফলাকে পাশ কাটাল সে। চারদিকে পানি জুড়ে সংগ্রাম শুরু হল– রক্ত আর রক্ত। বন্ড প্রবাল স্কুপের আড়ালে লুকিয়ে আস্তে আস্তে সেদিকে সাঁতার কাটতে লাগল। দেখল একটা লোক বন্দুক তুলে লিটারের দিকে লক্ষ্য স্থির করছে। লিটার প্রাণপণে লার্গোর দলের আর একটা লোকের সঙ্গে লড়াই করছে। সে লোকটা দুহাতে লিটারের গলা চেপে ধরেছিল কিন্তু লিটার হাতের হুকটা দিয়ে তার পিঠ চিরে দিল।
