বন্ড অন্যমনস্কভাবে বার্তার কথা সাজাচ্ছিল, আর উদ্বিগ্নভাবে চিন্তা করছিল কমিশনারের চিঠির তাৎপর্য এবং ডোমিনোর সম্বন্ধে। জটিল পরিস্থিতি। লার্গো হয়ত তার গুপ্তধন অভিযানে চলেছেন অথবা চলেছেন বোমা বসাবার জন্য টাইম ফিউজ ঠিকমত লাগাবার জন্য, যাতে প্রেতাত্মা সংঘের দেওয়া সময়রেখা পার হবার কয়েক ঘণ্টা পরে বিস্ফোরণ হয়। কারণ, ইংল্যান্ড ও আমেরিকা শেষ মুহূর্তে টাকা দিতে রাজী হলেও বোমাটাকে উদ্ধার করতে হবে।
নাসাউ থেকে পশ্চিম দিকে, বেরী আইল্যান্ড চ্যানেল হয়ে নর্থ-ওয়েস্ট লাইটের পথটা এই সম্ভাবনার সঙ্গেই মিলে যাচ্ছে। বিমিনির দক্ষিণে ডোবা প্লেনটা, মিয়ামী এবং আমেরিকার উপকূলের অন্যান্য সমস্ত সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ঐ পশ্চিম দিকে তারপর নর্থ-ওয়েস্ট প্রভিডেন্স চ্যানেলে ফিরে এসে সোজা গ্রান্ড বাহামার মিসাইল স্টেশনের দিকে গেলেই হল।
একটা ভীষণ অস্বস্তি আর ভয় বন্ডকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সে মনে মনে মানতে বাধ্য হল যে–সে, লিটার এবং মান্টা এক অদ্ভুত জুয়াখেলায় জড়িয়ে পড়েছে। যদি বোমা দুটো জাহাজে থাকা আর যদি ডিস্কো সত্যিই গ্র্যান্ড বাহামার মিসাইল স্টেশনের দিকে চলে, তবে নর্থ-ওয়েস্ট চ্যানেল দিয়ে মান্টা সম্ভবত তাকে ধরে ফেলতে পারবে।
কিন্তু এই জুয়াখেলায় সবরকম বিরূপ সম্ভাবনা সত্ত্বেও তারা জিততে পারে, তবু…ডোমিনো কেন সংকেত জানাল? কি হয়েছে তার?
.
খুব নরম হাতে, খুব আস্তে…
ঘন নীল আয়নার মত সমুদ্রের বুকে তরঙ্গ তুলে একটা কালো টর্পোেের মত ছুটে চলেছে ডিস্কো। যদিও প্রত্যেকটি পটোহোলের ওপর শাটার টানা আছে সমস্ত ঘরে একমাত্র আলো হচ্ছে ছাদ থেকে ঝুলন্ত একটি জাহাজী লণ্ঠন। লাগো বসেছিলেন টেবিলের মাথায়। কেবিনে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত হওয়া সত্ত্বেও তাঁর সমস্ত মুখ ঘামে চকচক করছে। তিনি বলতে শুরু করলেন, আপনাদের জানাতে চাই যে আমরা একটু জরুরী অবস্থার মধ্যে পড়েছি। আধ ঘণ্টা আগে ১৭ নং, ডেকের এক কোণে মিস্ ভিতালিকে একটা ক্যামেরা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে দেখেন। ১৭ নং সন্ধিগ্ধ হয়ে আমাকে ঘটনাটা জানান। আমি নিচে নেমে মেয়েটিকে তার কেবিনে নিয়ে যাই। সে আমার সঙ্গে খুব ধ্বস্তাধ্বস্তি করল। তারপর ক্যামেরাটা আদায় করতে আমি বল প্রয়োগ করতে বাধ্য হই। ক্যামেরা নিয়ে আমি সেটাকে পরীক্ষা করে দেখেছি।
একটু থেমে লার্গো শান্তকণ্ঠে বললেন, ক্যামেরাটা ভুয়া। তার ভেতরে লুকানো ছিল একটা গাইগার কাউন্টার। কাউন্টারের কাঁটা স্বভাবতঃই ৫০০ মিলি রন্টজেন-এ উঠে গিয়েছিল। মেয়েটির জ্ঞান ফিরিয়ে এনে তাকে প্রশ্ন করেছি আমি। সে কোন কথা বলতে অস্বীকার করেছে। যথাসময়ে আমি তাকে কথা বলতে বাধ্য করব আর তারপর তাকে শেষ করে ফেলা হবে।
লার্গো চুপ করলেন। টেবিলের চারদিক থেকে ক্রুদ্ধ বিরক্ত সব আওয়াজ শোনা যেতে লাগল। ২ নম্বর এ বিষয়ে বললেন, কাজ চালিয়ে যেতে। বললেন, সারা পৃথিবী জুড়ে অসংখ্য গাইগার কাউন্টার খুঁজে বেড়াচ্ছে আমাদের। পৃথিবীর প্রতিটি গুপ্তচর বিভাগ আমাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে। নাসাউ-এর কোন ভারপ্রাপ্ত বিভাগ হয়ত পুলিশ বন্দরের সব জাহাজের তেজস্ক্রিয়তা মাপবার আদেশ দিয়েছেন। রেডিও অপারেটরকে আমি নাসাউ ও উপকূলের মধ্যে কোন অস্বাভাবিক বেতারবার্তা বিনিময় হচ্ছে কিনা দেখবার জন্য কান খাড়া রাখতে বলেছি। ৫নং মাথা নেড়ে বললেন, চিন্তার কোন কারণ নেই। বিদ্যুতের কয়েকটা ব্যবহার আমি জানি। মানবদেহ তা সহ্য করতে পারে না। মেয়েটির কাছ থেকে সমস্ত কথাই আমাদের আদায় করতে হবে। কার্গো টেবিলের চারপাশে ছায়াময় রক্তিম মুখগুলোর দিকে তাকালেন তারপর বললেন, এখন মধ্যরাত্রি। রাত তিনটের সময় আমরা নোঙর করব। তারপর সাঁতার-দল রওনা হবে আধমাইল দূরে বোমা বসানোর জায়গাটার দিকে। আমাদের যে পনেরো জন এই দলে থাকবেন তাঁরা যথারীতি তারের মত ছড়িয়ে সাঁতার কাটবেন, আর দলের মাঝখানে থাকবে বোমাবাহী রথ এবং স্নেড়। পথপ্রদর্শকের প্রধান কর্তব্য হবে হাঙ্গর ও ব্যারাকুড়া সম্পর্কে সাবধান থাকা। কেউ যদি বন্দুক চালান, তিনি আগে পার্শ্ববর্তীকে তা জানিয়ে দেবেন, যদি সাহায্যের প্রয়োজন হয়।
ষড়যন্ত্রের গোড়ার দিকে, কয়েক মাস আগে প্যারিসে, ব্রোফেন্ড লাগোকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, দলের কোন সদস্যের কাছ থেকে যদি বিপদ আসে তাহলে তা ঐ দুজন রাশিয়ানের কাছ থেকে আসার সম্ভাবনা বেশি। এরা হলেন ১০ এবং ১১ নং। SMERSH-এর প্রাক্তন সদস্য। ব্লোফেন্ড বলেছিলেন, এই দুজনের রক্তের মধ্যে ষড়যন্ত্রের বীজ রয়েছে। আর ষড়যন্ত্রের চিরসঙ্গী হল সন্দেহপ্রবণতা। এরা দুজনে সবসময় ভাববে, তাদের বিরুদ্ধে আলাদা কোন মতলব আঁটা হচ্ছে কি না। ওরা সঙ্গীদের বিরুদ্ধে নালিশ করবার চেস্টা করবে। কিন্তু মনে রাখবেন যদি ওরা দলের মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ বপন করতে চেষ্টা করে, তবে আপনাকে দ্রুত ও নির্দয়ভাবে দমন করতেই হবে।
সমস্ত অধিবেশন নিস্তব্ধ। উপস্থিত সকলেই গুপ্তচর অথবা ষড়যন্ত্রকারী। তারা বিদ্রোহের গন্ধ পেলেন, আঁচ করলেন অবিশ্বস্ততার কালো ছায়া এগিয়ে আসছে। ১০নং বলে গেলেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই একটা সময় আসবে যখন আমরা পনেরো জন থাকব ঐ ওখানে তিনি কেবিনের দেওয়ালের দিকে হাত দেখালেন, অন্ধকারের জেতর জাহাজ থেকে আধঘণ্টা সাঁতারের রাস্তা। আর পাঁচজন সদস্য ও ছ জন সাব এজেন্ট থাকবেন এই জাহাজেই। আমার মতে প্রত্যেকটি জাতীয় দলের একজন করে জাহাজে থেকে দলের বাকি সদস্যের স্বার্থরক্ষা করা উচিত। এর ফলে সাঁতারুর সংখ্যা দশ এ নেমে আসবে কিন্তু যারা এই বিপজ্জনক অভিযানে অংশগ্রহণ করেছেন তারা অনেক বেশি উৎসাহ নিয়ে কাজ করতে পারবেন।
