খানিক দূর যাওয়ার পর একটা রূপালী ডিমের মত আকারের জিনিস তার বাঁ দিকে পানির ওপর এসে পড়ল আর ডিগবাজি খেতে খেতে ডুবে গেল। আরো কিছুটা এগোতে কয়েকটা জলবোমা ফাটার ঢেউ এসে তার গায়ে লাগল। বোমাগুলো ফেলা হচ্ছিল জাহাজের চারপাশের রক্তের দাগ লক্ষ্য করে।
সামুদ্রিক ঘাসের ওপর দিয়ে বন্ড ভেসে চলল। তার মাথা ভীষণ ব্যথা করছে। হঠাৎ সামনের এক আলোড়ন তাকে সজাগ করে দিল। একটা দানবাকৃতি মাছ, ব্যারাকুড়া, সামনের দিকে বেরিয়ে যাচ্ছে। মাছটা যেন পাগল হয়ে গেছে।
সমুদ্রের তলায় পড়ে থাকা গাড়ির টায়ার, বোতল, টিন পেরিয়ে জেটি দেখা দিল। বালির সিঁড়ি পেরিয়ে অল্প পানিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল বন্ড। তার মাথা ঝুঁকে পড়ল।
.
রক্তচক্ষু সুড়ঙ্গ
জামা-কাপড় পরতে পরতে বন্ড কস্টে স্যান্টোসের মন্তব্যগুলো এড়িয়ে গেল। সে বলেছিল যে, একটু আগে পানির নিচে কয়েকটা বিস্ফোরণ হয়ে গেল। সমুদ্রের পানি লাফিয়ে লাফিয়ে উঠছিল। ইয়টের ডেকে অনেক জন লোক বেরিয়ে এসে হৈ-চৈ করছিল।
বন্ড সাবধানে হেঁটে গিয়ে পাশের রাস্তায় পার্ক করে রাখা লিটারের ফোর্ড গাড়িতে উঠল। হোটেলে পৌঁছে সে ফোন করল লিটারকে, তার অভিজ্ঞতা ও আবিষ্কারের কথা বর্ণনা করল লিটারের কাছে। লিটার বলল, তোর রিপোর্টের একটা কপি আমি CIA-কে পাঠিয়ে দিচ্ছি। তারপর মান্টাকে ডেকে বলছি সোজা এখানে চলে আসতে। লিটার বলল, সে আজ ঘুরে ঘুরে ক্যাসিনোতে ঐ অংশীদার আর গুপ্তধন শিকারীদের পর্যবেক্ষণ করছিল। জীবনে কখনো এতগুলো অপরাধীকে এক জায়গায় দেখেনি। কাউকেই চিনতে পারছিল না, যতক্ষণ-না এক টাক মাথা ঘন ভুরু, পুরু কাঁচের চশমা পরা বেঁটেখাটো লোক চোখে পড়ল। লোকটাকে দেখেই মনে হল কোথায় যেন দেখেছে। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বলল, এ হচ্ছে সেই লোকটা যার নাম কোৎসে। পাঁচ বছর আগে পশ্চিম জার্মানীতে চলে এসে পূর্ব জার্মানীর অনেক তথ্য ফাঁস করে দেয়। বদলে মোটা বকশিশ পেয়ে সুইজারল্যান্ডে গা ঢাকা দেয়।
তাদের গাড়ি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে এসে পড়েছিল। বাড়িটার শুধু একতলায় আলো জ্বলছিল। ঘরে ঢুকে লিটারের দিকে তাকিয়ে বলল, ব্যাস ফেলিক্স, এইটাই হল মোক্ষম প্রমাণ। এবার কি করা যায়?
তুই আজকে যা দেখেছিস, তার ওপর আমরা পুরো দলটাকে সন্দেহের অজুহাতে গ্রেফতার করতে পারি। কোন অসুবিধা নেই।
কিসের সন্দেহ লার্গো তার উকিলকে ডেকে এনে পাঁচ মিনিটে ছাড়া পেয়ে যাবে। আমাদের হাতে এখন কোন। প্রমাণ নেই যা লার্গো উড়িয়ে দিতে পারে না। আমাদের রিপোর্ট পাঠাতে হবে সাবধানে, মাপা কথায়। লার্গোর সমস্ত প্ল্যান ঠিক ঠিক চলছে। এখন লাগোর যা কাজ বাকি তা হল, একটা বোমা গুপ্তস্থান থেকে তুলে এনে এক নম্বর লক্ষ্যস্থলের দিকে রওনা হওয়া–আগামী ত্রিশ ঘণ্টার মধ্যে। যতক্ষণ না সে তার ইয়টে বোমা তুলছে ততক্ষণ কিছু করার নেই। সুতরাং কাল আমরা আমাদের সী প্লেনটা নিয়ে একশ মাইলের মধ্যে চারদিকে সমস্ত জায়গা পর্যবেক্ষণ করে আসব।
***
ছ ঘণ্টা পরে, ভোরের স্বচ্ছ আলোয় তারা দুজনে দাঁড়িয়ে ছিল উইন্ডসর ফিল্ড বিমান ঘাঁটিতে। আর গ্রাউন্ড ক্রুরা তাদের ছোট গ্রুম্যান অ্যাম্ ফিবিয়ান প্লেনটাকে জীপের সাহায্যে হাজার থেকে আনছিল। তারা দুজন প্লেনে চাপবার পর লিটার ইঞ্জিন চালু করেছে, এমন সময় দেখা গেল মোটর সাইকেলে চেপে এক ডেস্প্যাচ রাইডার অনির্দিষ্টভাবে তাদের দিকেই ছুটে আসছে। লিটার ব্রেক ছেড়ে দিয়ে দ্রুতবেগে রানওয়ের ওপর প্লেন চালিয়ে দিল। তার যন্ত্রে ক্রুদ্ধ চেঁচামেচি শোনা গেল। তারা সমুদ্রের এক হাজার ফিট ওপর দিয়ে উড়ছিল। তারা পঞ্চাশ মাইল লম্বা চমৎকার সমুদ্রতট বেয়ে পূর্বদিকে এগোতে লাগল। লিটার বলল, ঐ যে লাল-সাদা ডোরাকাটা দেখা যাচ্ছে, ওটা একটা অ্যাটলাস বা টাইটান আন্তমহাদেশিক ক্ষেপণাস্ত্র (ICMB)। অন্য দুটো নল নিশ্চয়ই মাতাদোর, মার্ক বা থান্ডার বার্ড-এর জন্য। ঐ কামানের মত জিনিসটা হল ক্যামেরাট্রাকার। ওই চাকীর মত রিফ্লেক্টার দুটো হচ্ছে রাডার স্ক্রীন।
তাদের মাথার ওপর রেডিওটা ঘড়ঘড় করে উঠল। ধাতব স্বর শোনা গেল NIAKOI, NIAKOI আপনারা নিষিদ্ধ এলাকায় এসে পড়েছেন। অবিলম্বে দক্ষিণ দিকে ঘুরে যান। এটা গ্র্যান্ড বাহামা রকেট ঘাঁটি।
লীটার প্লেনটাকে দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে নিল। এই জায়গাটা নাসাউ থেকে মাত্র শ খানেক মাইল। ডিস্কোর পক্ষে এখানে বোমা বসিয়ে যাওয়া কিছুই নয়। বহু দূরবীন দিয়ে দেখল রকেটের তলা থেকে ধোয়ার কুন্ডলী বেরোচ্ছে। তারপর বেরিয়ে এল মেঘের মত বাম্প, ধোঁয়া আর তীব্র একঝলক সাদা আলো, সেটা ক্রমশ রক্তবর্ণ হয়ে গেল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। মিনিট পনেরো পরে একছড়া মালার মত এক দ্বীপমালা দেখা দিল। এখানকার পানি খুব। অগভীর। প্লেন লুকোবার পক্ষে আদর্শ জায়গা। তারা একশ ফিট উচ্চতায় নেমে এসে একেবেঁকে চলতে লাগল। দ্বীপগুলোর ওপর দিয়ে। প্লেনটা উড়ে গেল উত্তর বিকিনির দিকে। এখানে কয়েকটা বাড়ি আর হোটেল আছে। একটি সুগঠিত কেবিন ক্রুজারের ছাদে একটি মেয়ে নগ্ন হয়ে সূর্যস্নান করছিল। সে ঝটপট গায়ের ওপর একটা তোয়ালে টেনে নিল। যেখানে পানি আবার নীল হয়ে এল, তার ওপর দিয়ে তারা সাবধানে উড়ে গেল। নিষ্প্রাণ স্বরে বলল লিটার, ব্যাস, আর কিছু দেখার নেই। সে প্লেনের মুখ নিচের দিকে নামাল। বন্ড হেলান দিয়ে বসল। লিটারের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে বলল, এ জায়গাটাই হবে। সব ঠিক আছে, নিচে বিরাট একটা ক্যামোফ্লেজ করা তেরপল। তুই দ্যাখ একবার। ডিস্কোর অপারেটর যদি এখন নিজের কাজে থাকে, তবে সে নিশ্চয় পুলিশের ওয়েভলেংথের ওপর কড়া নজর রাখছে। সুতরাং নেমে একবার দেখা যাক, বোমাগুলো এর মধ্যেই লুকিয়ে রাখা হয়েছে কিনা। লিটারের মুখ উত্তেজনায় চক্ করছে। দড়াম করে বন্ডের পিঠ থাবড়ে বলে উঠল সে, পেয়ে গেছি! শালার প্লেনটাকে খুঁজে পেয়ে গেছি। বন্ড তার ওয়াথার PPK পিস্তলটা বের করল। চল্লিশ ফিট গভীর পানিতে তিন তিনটে হাঙর কি যেন করছিল। সে অপেক্ষা করতে লাগল পিস্তল হাতে, কতক্ষণে হাঙর দুটো আবার ঘুরে আসে। বন্ড ট্রিগার টানল। হাঙরের বিশাল বাদামী শরীর মন্থর গতিতে পাক খেতে লাগল পানির ওপর। সূর্যের আলোয় তার পেটটা সাদা দেখাল। তারপর সম্ভবতঃ তার মৃতদেহটা আপনাআপনি, এলোমেলো ভেসে চলল। বন্ড পিস্তলটা লিটারের হাতে দিল। বলল, আমি নিচে নামছি। তুই লক্ষ্য রাখিস। লিটার স্টার্টারের বোম টিপে প্লেন আগের জায়গায় ফিরিয়ে আনল। বন্ড পীটের ধারে এগিয়ে এসে ঝাঁপ দিল। পানির ভিতর দিয়ে সাঁতার কেটে সে নিচে নামতে লাগল। নিচে পৌঁছে বন্ড তেরপলের একটা কোণের দিকে এগিয়ে চলল, যে কোণটা হাঙ্গরের গুতোয় আলগা হয়ে গেছে। তারপর ওয়াটার প্রুফ টর্চটা জ্বেলে, অন্য হাতে ছুরি বাগিয়ে ঢুকে পড়ল তেরপলের ভিতর। তার টর্চ ঝলসে উঠল প্লেনটার পালিশ করা ডানার নিচের অংশে। আর তারপর একটি কংকালের অবশিষ্টাংশের ওপর, যার ভেতর কিলবিল করছে অজস্র কাঁকড়া, চিংড়ী, সামুদ্রিক মাছ এর জন্য অবশ্য বন্ড তৈরি ছিল। জঘন্য কাজটা শেষ করার জন্য সে হাঁটু গেড়ে বসল।
